বর্তমানে এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) হাতে। একসময় এটি স্কুল ম্যানেজিং কমিটির হাতে ছিল। ইদানীং এটি আবার স্কুল ম্যানেজিং কমিটির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার খবর নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী অবশ্য দাবি করেছেন, এ রকম কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি, আলোচনা হয়েছে মাত্র। এদিকে এ ধরনের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা এর প্রতিবাদে মিছিল করেছেন। তারা মনে করছেন, কমিটির হাতে নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করা হলে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের ঝুঁকি বাড়বে। ফলে মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে।
বর্তমানে এনটিআরসিএর নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এটি একটি মোটামুটি স্বচ্ছ মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করে আসছে। এনটিআরসিএ দীর্ঘদিন ধরে জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, দীর্ঘসূত্রিতা, অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতার অভিযোগে অভিযুক্ত। কিন্তু তারপরও এনটিআরসিএর মাধ্যমে স্কুলগুলো যে মানের শিক্ষক পেয়েছে, কমিটির হাতে নিয়োগের দায়িত্বটি ছেড়ে দিলে এই মানের শিক্ষক পাওয়া যাবে না বলেই ধরে নেওয়া যায়।
গত ২০২৫ সালের এবং এবার ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা নকলমুক্ত পরিবেশে হয়েছে। খাতার মূল্যায়নও সঠিকভাবে করা হয়েছে, ফল কৃত্রিমভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়নি। এ অবস্থায় গত বছর গড় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ, এ বছর ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। পাসের এই হার আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অদক্ষতার দিকটিই তুলে ধরছে। কিন্তু তারপরও ২০০১ থেকে ২০০৩ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলের সঙ্গে তুলনা করলে শিক্ষা ব্যবস্থাপনার অগ্রগতির চিত্রটি চোখে পড়ে। ওই বছরগুলোয়ও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত একটি শিক্ষাব্যবস্থা থেকে নকলের অভিশাপ দূর করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছিল। পরিণামে পাসের হার নেমে এসেছিল ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের ঘরে। এবার প্রায় একই রকম পরিস্থিতিতে পাসের হার যে অতটা নিচে নামল না, তার কৃতিত্ব কিছুটা হলেও এনটিআরসিএর প্রাপ্য। তারা স্কুলগুলোতে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দিতে সক্ষম হয়েছে বলেই এই উন্নতিটি ঘটেছে।
বিসিএসের পর এনটিআরসিএ কর্তৃক পরিচালিত শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা এর মধ্যেই একটি জাতীয় পর্যায়ের সম্মানজনক নিয়োগ পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। শ্রমবাজারে চাকরি সংকটের কারণে আজকাল শিক্ষকতার প্রতি অনেক মেধাবী ছাত্রের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে অনেকেই এনটিআরসিএর শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। মেধা যাচাইয়ের জন্য এনটিআরসিএর মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণ করে যারা পাস করবে, তাদের সনদ দিয়ে সরকার দায়িত্ব শেষ করতে চাচ্ছে। এই সনদপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে শিক্ষক বাছাই করে নিয়োগের দায়িত্ব স্কুল ম্যানেজিং কমিটিকে দিলে সবচেয়ে বড় সমস্যাটি হবে আর্থিক দুর্নীতি। টাকাপয়সা লেনদেন ছাড়া কোনো নিয়োগ হবে কি নাÑসে ব্যাপারে বেশ সন্দেহ আছে।
অধিকন্তু, মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের চলমান ব্যবস্থাটির কার্যত অপমৃত্যু ঘটবে। কারণ, মেধা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশের বহু অঞ্চলে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির যথাযথ সক্ষমতা ও দক্ষতা নেই। বহু ক্ষেত্রে এই কমিটিগুলো স্থানীয় রাজনীতি, আঞ্চলিকতা, ব্যক্তিস্বার্থ ও নানা গোষ্ঠীগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হয়। অনেক স্কুলের কমিটিই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো মেরুদণ্ডসম্পন্ন নয়। ফলে তাদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিলে অযোগ্য ও কম যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের পথ তৈরি হবে। কমিটির পক্ষে স্থানীয় ক্ষুদ্র স্বার্থ উপেক্ষা করে মেধাবীদের শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য ডাকা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে কোনো কমিটি শক্তিশালী হয়ে গেলে শিক্ষকদের সঙ্গে অমর্যাদাকর প্রভুসুলভ আচরণের ঘটনাও ঘটে থাকে। কমিটির এ ধরনের ইমেজ সংকটের কারণে মেধাবীরা কোনো কোনো স্কুলে আসতে চাইবে না।
তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে ও আরো দক্ষ করে গড়ে তুলতে চাইলে এনটিআরসিএর দায়িত্ব খর্ব করা নয়, এটিকে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও স্বচ্ছ জাতীয় শিক্ষক নিয়োগ কর্তৃপক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এর বর্তমান দুর্বলতাগুলো দূর করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। শোনা যায়, রিকুইজিশন দেওয়ার পর থেকে একজন শিক্ষক নিয়োগ পেতে একটি স্কুলকে প্রায় বছরখানেক অপেক্ষা করতে হয়। তারপর নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি কোনো কারণে যোগদান না করে তাহলে রিকুইজিশন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াটি আবার সম্পন্ন করতে হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনতে হবে।
বর্তমানে কোনো একটি স্কুলে নিয়োগ প্রদানের সময় প্রার্থীর বাড়ির ঠিকানা বিবেচনায় নেওয়া হয় বলে মনে হয় না। পঞ্চগড়ের কাউকে যদি চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো স্কুলে নিয়োগ দেওয়া হয়, তবে তা সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত হবে না। কারণ তার বাড়িতে আসা-যাওয়ার সময় ও খরচ দুটিই বেশি হবে। আর পরিবার থেকে অনেক দূরে থাকার কারণে তার মানসিক প্রশান্তি থাকবে না। কাজে মনোযোগও হবে কম। এখানে আরেকটি সমস্যা হলো ভাষাগত সমস্যা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা পঞ্চগড়ের আঞ্চলিক ভাষা থেকে বেশ আলাদা। কাজেই ছাত্র-শিক্ষক যোগাযোগেও ভাষাগত সমস্যা হবে। একই রকম সমস্যা হবে সাতক্ষীরা ও সিলেটের মধ্যেও। কাজেই নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি প্রমিত বাংলায় স্বচ্ছন্দে কথা বলতে অভ্যস্ত না হন, তবে ভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে তিনি ভালো শিক্ষক হতে পারবেন না। কাজেই এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের উচিত হবে শিক্ষক নিয়োগের সময় বাড়ির ঠিকানা ও ভাষাগত বিষয়টি বিবেচনায় রাখা।
স্কুল ব্যবস্থাপনার জন্য প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষককে এলাকার জনগণ, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রেখে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হয়।
অন্যদিকে কর্মচারীরা অল্প বেতন পান। তারা যদি স্থানীয় এবং স্কুলসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা হন, তবে সার্ভিস ভালো পাওয়া যায়। তাই প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের দায়িত্বটি স্কুল ম্যানেজিং কমিটির হাতে দিলেই ভালো হয়। তবে আশা করি, সরকার স্কুল ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও পশ্চাদমুখী চিন্তা থেকে সরে আসবে। এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করবে এবং দায়িত্ব খর্ব না করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে এনটিআরসিএকে অধিকতর কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলবে।
লেখক : অধ্যাপক, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট