গণঅভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরশাসকরা যে দেশে আশ্রয় নেন, সেখানে তারা সাধারণত লোকচক্ষুর আড়ালেই থাকেন। আশ্রয়দাতা দেশ শুধু নিরাপত্তার কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তা নয়, স্বৈরশাসকদের আশ্রয় দেওয়া লজ্জার বিষয়।
গণধিকৃত কোনো শাসক সেই দেশে অবাধে স্বাধীন মানুষের মতো চলাফেরা করুক, তা গণতান্ত্রিক দেশের মানুষের কাম্য হতে পারে না। নিজ দেশে ঘৃণিত এসব ব্যক্তির উপস্থিতি আশ্রয়দাতা দেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এরপরও অতীত সম্পর্ক কিংবা মানবিক কারণে জীবন রক্ষার বিষয় বিবেচনা করে অনেক স্বৈরশাসক পতনের পর বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়ে থাকেন। তবে গণতান্ত্রিক দেশগুলো সাধারণত কোনো স্বৈরশাসককে সহজে আশ্রয় দেয় না।
২০১১ সালে তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্তের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নিয়েছিলেন স্বৈরশাসক জয়নুল আবেদিন বেন আলি। এরপর তাকে আর কখনো প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ২০১৯ সালে সেখানে তার মৃত্যু হলে সৌদি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সেই খবর প্রকাশ করে। এভাবেই জয়নুল আবেদিন বেন আলীর জীবনের রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটে। একইভাবে উগান্ডার সাবেক স্বৈরশাসক ইদি আমিনও সৌদি আরবেই জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন।
বাংলাদেশের মাফিয়া শাসক ও গণহত্যার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া শেখ হাসিনা দিল্লিতে লোকচক্ষুর আড়ালে আছেন। এখন পর্যন্ত তিনি প্রকাশ্যে আসেননি। হাসিনাকে দিল্লি আশ্রয় দিয়েছে মূলত দুটি কারণেÑপ্রথমত, তার দেড় দশকের স্বৈরশাসনে দিল্লির স্বার্থপূরণে যে অবদান রেখেছিলেন এর কৃতজ্ঞতা হিসেবে। দ্বিতীয়ত, তাকে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের একটি কার্ড হিসেবে ব্যবহারের জন্য। তিব্বতের দালাইলামাকেও ভারত আশ্রয় দিয়েছিল একই উদ্দেশ্যে। যদিও তা চীনের বিরুদ্ধে খুব একটা কাজে লাগেনি। দালাইলামার চেয়েও হাসিনা বিচ্ছিন্ন ও সুরক্ষিত অবস্থায় আছেন। দালাইলামার সঙ্গে অনেকে দেখা করার সুযোগ পেলেও হাসিনার সঙ্গে কারো দেখা করার সুযোগ নেই। কারণ দালাইলামা গণহত্যাকারী নন। তার হাতে অন্তত রক্তের দাগ নেই। নিজ দেশের নাগরিকদের হত্যার জন্য পলাতক শাসকদের যে পরিণতি হয়েছে, হাসিনার পরিণতি তার চেয়ে ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
তাহলে প্রশ্ন— হাসিনাকে নিয়ে কেন এই আলোচনা? বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিকতায় পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষানীতির ক্ষেত্রে কতগুলো স্বাধীন ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, যা পলাতক হাসিনার আশ্রয়দাতা প্রতিবেশী দেশটির ভালো লাগার মতো বিষয় নয়। এরপর আমরা দেখছি, দিল্লি হাসিনা কার্ড খেলার চেষ্টা করছেন। পলাতক হাসিনা এখন পুরোপুরি দিল্লির পুতুলখেলার এক বস্তুমাত্র। সম্প্রতি ভারতের কয়েকটি পত্রিকায় হাসিনার ইমেইল সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়েছে। এসব সাক্ষাৎকারে যেসব প্রশ্ন করা হয়েছে এবং তার যে জবাব প্রকাশ করা হয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের বয়ান বা মনোভাবের প্রতিফলন হিসেবে দেখাতে হবে। এগুলো যে হাসিনার কথা, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। হয়তো ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এসব সাক্ষাৎকার প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যার মূল লক্ষ্য হলো হাসিনাকে বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দানে প্রাসঙ্গিক রাখার চেষ্টা করা। নির্বাচিত সরকারকে কিছু বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা।
আজ পর্যন্ত ভারতের কোনো সাংবাদিক বা পলাতক আওয়ামী লীগের কোনো নেতা বলতে পারেননি হাসিনার সঙ্গে তারা দেখা করেছেন কিংবা রাজনৈতিক চিন্তা করার মতো তিনি মানসিকভাবে সুস্থ আছেন। তার নামে যেসব অডিও প্রচার করা হয়, সেগুলোর বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে মানসিক বিকারগ্রস্ত, প্রতিশোধপরায়ণ এক নারীর কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়। যার কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য নেই। ৫ আগস্টে পলায়নের পর তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় স্পষ্ট করে বলেছিলেন, এই দেশ এবং দলের কী হবে, না হবে, তা নিয়ে তার মা চিন্তিত নন। এমনকি তিনি আর দলের দায়-দায়িত্ব নিতে রাজি নন। বাস্তবতা হচ্ছে, জয়ের এই বক্তব্য ছিল হাসিনার প্রকৃত অবস্থান। হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন হলো আপসকামিতা, ষড়যন্ত্র এবং পলায়নের রাজনীতি। জিয়াউর রহমানের অনুকম্পায় দেশে ফেরার পর তিনি ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে জড়িয়ে ছিলেন।
পুরো রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন আরেক স্বৈরশাসক এরশাদের সহযোগী মাত্র। আবার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর তিনি এরশাদকে সহযোগী বানিয়ে ভারতের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছেন মাত্র। ২০০৮ সালে ষড়যন্ত্রমূলক একটি নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর তিনি কার্যত বাংলাদেশকে দিল্লির সঙ্গে অধীনতামূলক মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। এরপর হাসিনার সাহসের পরিচয় এ দেশের মানুষ পেয়েছেন ওয়ান-ইলেভেনের পর। তৎকালীন সেনাসমর্থিত সরকার হাসিনা ও খালেদা জিয়া উভয়কে দেশত্যাগের জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিল। হাসিনা প্যারোলে মুক্তি নিয়ে দ্রুত দেশ ত্যাগ করেছিলেন। তিনি কানের চিকিৎসার নাটক করে দেশ ছেড়েছিলেন। অন্যদিকে খালেদা জিয়া স্পষ্টভাবে দেশত্যাগের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, এ দেশ তার শেষ ঠিকানা। খালেদা জিয়া দেশত্যাগ করেননি। এ দেশের মাটিতে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে সমাহিত হয়েছেন। অন্যদিকে হাসিনার পলাতক জীবন আবার ফিরে এসেছে।
১৯৮১ সালের মে মাসে হাসিনা দিল্লি থেকে ঢাকায় এসেছিলেন কোনো আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে নয়। জিয়াউর রহমান সত্যিকার অর্থে একটি গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিবেশ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন বলে হাসিনাকে ফেরার অনুমতি দিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান না চাইলে হাসিনা কখনো ফেরত আসতে পারতেন না। এছাড়া হাসিনার ফেরা নিয়ে জিয়াউর রহমান নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। মুজিবের দুঃশাসনের জন্য তিনি হাসিনাকে অভিযুক্ত করার মতো হীন মানসিকতা পোষণ করতেন না। তিনি আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে চেয়েছিলেন। এমনকি হাসিনাকে তিনি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনায় নেননি।
জিয়াউর রহমান যে পরিস্থিতিতে হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন, বাংলাদেশে সেই পরিস্থিতি আর কখনো ফিরবে না। এ দেশের মানুষ দিল্লির দাস হিসেবে পরিচিত রক্তপিপাসু হাসিনার চেহারা দেখে ফেলেছেন। যে হাসিনা ১২১ শিশুকেও হত্যা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষার্থীরা তার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে এসেছিল। এই শিশুরা যত দিন বেঁচে থাকবে, তত দিন তার সাথিদের হত্যার বিচার দেখে যেতে চাইবে। হাসিনাকে এ দেশে ফিরে আসতে হবে শুধু তার দণ্ড কার্যকর করার জন্য।
২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনার পতনের আন্দোলন শুধু একজন স্বৈরশাসকের পতনের আন্দোলন ছিল না । এই আন্দোলন ছিল ভারতীয় আধিপত্যবাদের অবসানের আন্দোলন। সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইনের অপচেষ্টা, অভিন্ন নদী থেকে একতরফা পানি প্রত্যাহার এবং ভারতে মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন যত বাড়বে, এ দেশের মানুষ চূড়ান্তভাবে ভারতের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তত বেশি সোচ্চার হবেন। বর্তমান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে গণমানুষের এই আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা। সরকারের ভারতমুখী যেকোনো নীতি মানুষকে যেমন বিক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে, তেমনি আত্মমর্যাদার সাহসী নীতি সরকারের প্রতি মানুষের সমর্থন আরো জোরালো করতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে হাসিনা এখন কোনো আলোচনার বিষয় নয়। সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে হাসিনা ও তার দল বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন। তার দলের সমর্থকরা বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। হাসিনার দলের সাহস হয়নি নির্বাচন বর্জনের ডাক দেওয়ার। বরং যারা পালিয়ে যাননি, তারা বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দলের মধ্যে লীন হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। গত নির্বাচনের ভোটের হিসাব প্রমাণ করে আওয়ামী সমর্থকরা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। বিএনপির প্রাপ্ত ৪৯ শতাংশ ভোটের অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ভোট এসেছে আওয়ামী সমর্থকদের কাছ থেকে। আগামী নির্বাচনের আগে এই রাজনৈতিক মেরূকরণ আরো জোরালো হবে।
দিল্লির সাজানো কথিত সাক্ষাৎকারে ‘বীর পলাতক’ হাসিনা সাহসী নানা কথা বলেছেন। তিনি নাকি দেশে ফিরে আসার জন্য প্রস্তুত। খুবই ভালো কথা। অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচিত সরকার উভয়ই বন্দিবিনিময় চুক্তি অনুযায়ী হাসিনাকে ফেরত চেয়েছে। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা খতিয়ে দেখার নামে সময়ক্ষেপণ করেছে। গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের লাখো মানুষ অধীর অপেক্ষায় আছেন হাসিনার বিচারের রায় কার্যকর করার।
আমরা লক্ষ করছি, হাসিনার কথিত এই সাক্ষাৎকারের পর ঢাকায় থাকা দিল্লির সফট পাওয়ারগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হওয়ার চেষ্টা করছে। এরা কিছুটা সাহসী হয়ে উঠেছে নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দলের ভোটের রাজনীতির কৌশলের কারণে। বিএনপি সে সময় আওয়ামী ভোটব্যাংক নিজেদের দিকে টানার জন্য ফ্যাসিবাদের দোসর এবং ভারতীয় দূতাবাসে মদিরা-আসক্ত ভোল পাল্টানো বামপন্থি সাংবাদিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের সরব হওয়ার সুযোগ দিয়েছিল।
যাতে আওয়ামী ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে বিএনপিকে ভোট দেওয়ার মতো আস্থা পান। এই সুযোগ নিয়ে তারা এখন হাসিনার পক্ষে সংঘবদ্ধ প্রচার চালাচ্ছেন। সংসদে বিএনপি যখন বিরোধী দলের সমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার আইন পাস করে, তখন তারা চুপসে গিয়েছিল। এখন আবার সরকার যখন পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে কিছু সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, তখন দিল্লি থেকে পুরোনো আওয়ামী-বাম সফট পাওয়ারকে সরব রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকার নিশ্চয়ই ফ্যাসিবাদের দোসরদের ব্যাপারে সতর্ক আছে। তবে ভারতপন্থিদের অতি আস্ফালনের সুযোগ দেওয়া হলে তা সরকারের জন্য বিপজ্জনক সমস্যা তৈরি করতে পারে।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ
alfaz@dailyamardesh.com