হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার ফল

এলাহী নেওয়াজ খান

আমরা কথায় কথায় বলে থাকি—ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিন। একই সঙ্গে আমরা এটাও বলে থাকি, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়াই ইতিহাসের শিক্ষা। শেষেরটাই বুঝি চিরসত্য। মূলত প্রখ্যাত জার্মান দার্শনিক ফ্রেডেরিক হেগেল প্রথমে এ কথাটা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমরা ইতিহাস থেকে কিছুই শিখিনি, এটাই শুধু ইতিহাস থেকে শিখি। কারণ মানব ইতিহাসজুড়ে উত্থানপতনের যে ঘটনাবলি রয়েছে, সেখানে অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার নজির খুব কমই আছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দূর অতীতের কথা না হয় বাদই দিলাম, একদম আমাদের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া গত ৫৫ বছরের ইতিহাস তো শিক্ষা না নেওয়ারই ইতিহাস।

চোখের সামনেই এসব উত্থানপতনের ঘটনা ঘটলেও কেন আমরা শিক্ষা নিই না—এই প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। বিশেষ করে, আমরা সেই শাসকশ্রেণির কথা বলছি, যারা সচরাচর ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন না। কিন্তু কেন এমনটা ঘটে। এ ব্যাপারে মার্কসবাদী তত্ত্ব ও রাজনৈতিক দর্শন অনুসারে ঔদ্ধত্য, অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা ও ক্ষমতা ধরে রাখার কাঠামোগত প্রয়োজনের সম্মিলিত প্রভাবে শাসকশ্রেণি প্রায়ই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয় কিংবা এর শিক্ষা উপেক্ষা করার পথ বেছে নেয়।

এ সম্পর্কে কার্ল মার্কস আরো বলেছেন, প্রত্যেক শাসকশ্রেণি মনে করে, তাদের শাসন চিরস্থায়ী। এই বিশ্বাস তাদের অবশ্যম্ভাবী ঐতিহাসিক পরিবর্তন ও কাঠামোগত রূপান্তর সম্পর্কে অন্ধ করে রাখে, যার ফলে তারা তাদের অস্থায়ী ক্ষমতাকে স্থায়ী অবস্থা হিসেবে গণ্য করে।

এই প্রেক্ষাপটে আমরা বলতে পারি, অস্থায়ী ক্ষমতাকে স্থায়ী গণ্য করার বিভ্রম থেকে শাসকরা পূর্বসূরির, এমনকি নিজেদের আগের ভুলগুলো পর্যন্ত ভুলে যায়। অর্থাৎ ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এর ফলে মানবজাতি একই ভুল ও ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে বারবার। তাই ইতিহাসবিদরা বলেন, যারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়, তারা তার পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য হয়। তাই দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ শাসকই ক্ষমতার মদমত্ততায় বিভোর হয়ে পূর্বসূরিদের ভুল থেকে কিংবা ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না। যেমন : মুসলিম লীগের শাসন কিংবা আইয়ুব খানের ভুল থেকে আওয়ামী লীগ কিংবা শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষাগ্রহণ করেননি।

ধরুন, পাকিস্তান আমলে বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীদের যেভাবে কণ্ঠরোধ করা হতো কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহী, দুষ্কৃতকারী, দেশবিরোধী ইত্যাদি তকমা লাগিয়ে নির্যাতন চালানো হতো; ঠিক একই পন্থা অবলম্বন করা হয়েছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর। আওয়ামী লীগ সরকার পাকিস্তান আমলের মতোই একই তকমা লাগিয়েই শুধু ক্ষান্ত হয়নি; বরং গুম-খুন, জেল-জুলুমের মাধ্যমে ভয়ংকর ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল।

সুতরাং বাংলাদেশের বিগত পঞ্চান্ন বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার ফলে বারবার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট যেমন দেখা দিচ্ছে; তেমনি পুনরাবৃত্তি ঘটছে সামরিক হস্তক্ষেপ কিংবা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ঘটনা। একই কারণে এত বছর ধরে আমরা নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক এড়াতে পারিনি। দেখা যাচ্ছে, একই নীলনকশার নির্বাচনে যে দল পরাজিত হয়েছিল, সেই একই দল পরে আরেক নীলনকশার নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে অতীত ভুলে গেছে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর নানা দেশে ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার ফলে বড় বড় বিপর্যয় সৃষ্টির নজির আছে ভূরি ভূরি। এর একটি ক্লাসিক দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ফ্রান্সের নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ও জার্মানির একনায়ক হিটলার। ১৮১২ সালে নেপোলিয়ন প্রচণ্ড শীতের সময় রাশিয়া আক্রমণ করে যে বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছিলেন, সেই ইতিহাস জানা সত্ত্বেও অ্যাডলফ হিটলার ১৯৪১ সালে সেই শীতকালেই রাশিয়া আক্রমণ করে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিলেন। মানব ইতিহাসজুড়ে এ ধরনের অসংখ্য দৃষ্টান্ত থাকা সত্ত্বেও শাসকরা বারবার একই পথে হাঁটে।

আবার বাংলাদেশের দৃষ্টান্তের দিকে ফিরে আসা যাক। যেমন : ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে আওয়ামী লীগের বিকাশ ঘটেছিল, সেই আওয়ামী লীগ নেতারা আইয়ুব খানের মুসলিম লীগ সরকারের ভুল থেকে শিক্ষা না নেওয়ায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একটা মর্মান্তিক পরিণতির মধ্য দিয়ে গদিচ্যুত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, সেই আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মুখে শুধু ক্ষমতাচ্যুত হয়নি, শেখ হাসিনাসহ দলের নেতাকর্মীরা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

এবার পাকিস্তানের তৎকালীন সেনাপ্রধান আইয়ুব খান এবং বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদের কথা ভাবুন। তারা একই কায়দায় ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতাচ্যুতির শিকার হয়েছিলেন। প্রথমে আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখল ও কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠার কথাই ধরা যাক । তিনি ১৯৫৩ থেকে শুরু করে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একাধারে বেসামরিক সরকারের প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এখানেই শেষ নয়, প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী স্যার ফিরোজ নুনকে উৎখাত করে সামরিক শাসন জারি করে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেন সেনাপ্রধান আইয়ুব খানকে। এরপরই চরম বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনাটাই ঘটে। অর্থাৎ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারির মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাকে উৎখাত করে পুরোপুরি ক্ষমতা দখল করে নেন। এই বিশ্বাসঘাতকতা ও বেঈমানির অবসান ঘটে ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। অর্থাৎ, ওই গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব শাহীর পতন ঘটে। কিন্তু পতনের এই ইতিহাস জানা সত্ত্বেও বাংলাদেশে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল এরশাদ বিশ্বাসঘাতকতা ও বেঈমানি করে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে আইয়ুব স্টাইলে স্বৈরশাসন কায়েম করেছিলেন। কিন্তু শেষমেশ ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই ৯০-এর ছাত্র-জনতার তীব্র গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খানের মতোই বিদায় নিতে হয়েছিল জেনারেল এরশাদকে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও উভয় দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রায় একই। উভয় দেশেরই শাসকরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিতে পারদর্শী। আর সে কারণেই এ দুটি দেশে গণতন্ত্র কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করতে পারেনি। ইস্কান্দার মির্জা সেনাপ্রধানকে প্রথমে প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করে যে ভুল করেছিলেন, তার থেকে শিক্ষা নিয়ে উল্টোটা করতে গিয়ে মারাত্মক ভুল করেছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টোও। তিনি ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রথম বেসামরিক প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে শপথ গ্রহণ করে সামরিক বাহিনীর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভুট্টোর ওই সিদ্ধান্তের ফলে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। অবশ্য তা পরে প্রমাণিত হয়েছে এবং ভুট্টো নিজেই জীবন দিয়ে তার খেসারত দিয়েছেন।

এদিকে ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার কারণে বাংলাদেশে তিনবার সামরিক হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে আর দুবার ঘটেছে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ঘটনা। কিন্তু কখনোই শাসকরা ভুল সংশোধনের পথ বেছে নেয়নি। এর ফলে সর্বশেষ ২৪-এর রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের ঘটনা দেশের প্রতিটি সচেতন মানুষের বিবেককে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়েছে। তাই এটা এড়িয়ে অন্যকিছু ভাবার সুযোগ নেই। কারণ এই বিপ্লবের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ এটা ভাবতে শিখেছে, একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন রাষ্ট্র নির্মাণ ছাড়া মুক্তির আর কোনো পথ নেই।

অন্যদিকে এটি এমন একটা বিপ্লব ছিল, যে বিপ্লবে ১৪০০ আদম সন্তান শহীদ হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ছিল ছাত্র, বয়সে অতি তরুণ। যাদের জীবনের স্বপ্নগুলো ডানামেলার আগেই নিঃশেষ হয়ে গেছে। নিহতের মধ্যে ৭০ জন হচ্ছে শিশু। আর আহত হয়েছে ১৪ হাজারের মতো। কোনো যুদ্ধে ও এত অল্প সময় এত হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ফলে এই ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বর্তমান সরকার এবং সংসদ। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৫ বছরের সংসদীয় রাজনীতিতে এমন একটি বিরোধীদলীয় জোট সংসদে বসেছে, যারা অতীতে কখনো বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেনি। রাজনীতির এই নতুন মেরূকরণে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকা এবং দায়িত্ব প্রায় সমান হয়ে পড়েছে। কারণ উভয় পক্ষই একই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দল যদি ব্যর্থতার পরিচয় দেয়, তাহলে ইতিহাস তাদের কখনোই ক্ষমা করবেন না।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

ন্যাটোতেও ভাঙন ধরাচ্ছে ইরান যুদ্ধ

মফস্বল সাংবাদিকতার সংকট

জেলা পরিষদ উন্নয়ন না পুনর্বাসন

হরমুজ : ভূরাজনীতির অগ্নিপথ

প্রতিরোধের রাজনীতি ও ভাষার বিবর্তন

জুলাই সনদ ও জাতীয় ঐক্য

জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় জনগণের অংশগ্রহণ

দখল ও সংঘাতপ্রিয় একটি রাষ্ট্র

এক-এগারোর দুঃসময় ভোলা যাবে না

শিক্ষা বোর্ড ও বছরভেদে পরীক্ষার ফলে তারতম্য কতটা যৌক্তিক