হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

যুক্তরাষ্ট্রকে তাড়াতে তেহরানের কৌশল

মোহাম্মদ আয়াতুল্লাহি তাবার

ইরান কিন্তু ইসরাইল আর আমেরিকার সঙ্গে পুরোদস্তুর এক যুদ্ধে টিকে গেছে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। যুক্তরাষ্ট্র একযোগে বোমাবর্ষণ শুরু করল ইরানে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ছিল তিনটি। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করা, ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি বন্ধ করা আর সেখানকার সরকার বদলে ফেলা। এই তিনটি উদ্দেশ্যের একটিও তারা সফল করতে পারেনি। উল্টো যুদ্ধের পর তেহরান আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে।

ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দখল করে সেটি বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম হু হু করে বেড়ে গেছে। প্রচণ্ড বোমাবর্ষণের মধ্যেও ইরানের সামরিক বাহিনী মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ক্রমাগত আঘাত হেনে গেছে। দিন দিন আমেরিকার সাধারণ মানুষের মধ্যে যুদ্ধের বিরোধিতা বেড়েছে। আর ওয়াশিংটনের ওপর আন্তর্জাতিক বিশ্ব ছিল প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। অনেক বিশ্লেষকই ভাবছেন, তেহরান হয়তো সামনেও তার বর্তমান এই পথেই হাঁটবে।

ইরানের নেতারা প্রকাশ্যে নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করেছেন। তবে আড়ালে শীর্ষ কর্তারা বেশ দুশ্চিন্তায় আছেন। তারা ভালো করেই জানেন, চাপ বাড়ানোর নানা পথ ওয়াশিংটনের জানা আছে। আজ যে বিষয়গুলোর জন্য আমেরিকা হাত গুটিয়ে বসে আছে, কাল সেগুলো বদলে যেতেও পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হয়তো মনে হতে পারে, এটি ইরানকে বাগে আনার একটা সুযোগ। কিন্তু তেহরানের ভেতরের মানসিকতা তারা বুঝতে পারছে না। এই যুদ্ধ ইরানের নেতাদের মনকে পাথরের মতো শক্ত করে দিয়েছে। এই যুদ্ধে তারা নিজেদের প্রিয়জন ও বন্ধুদের হারিয়েছেন। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারিকে তারা এমন একটা দিন হিসেবে দেখেন, যেদিন তাদের শত্রু তাদের একেবারে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল। তারা বিশ্বাস করে, এই শত্রুকে চিরতরে পরাস্ত করতে হবে। মার্কিন আলোচনাকারীদের ওপর তাদের বিন্দুমাত্র ভরসা নেই।

ইরান এখন সংঘাত বাড়ানো এবং ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার কৌশল নিয়েছে। তারা আর আগের জায়গায় থামবে না, কিংবা কোনো আপসেও যাবে না। এর বদলে তারা ওই অঞ্চলে আমেরিকার যেসব সহযোগী দেশ আছে, তাদের অর্থনীতি গুঁড়িয়ে দেবে। বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বিপর্যয় তৈরি করবে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আক্রমণের পরিধি আরো বাড়াবে। আমেরিকান এবং ইসরাইলি কর্মকর্তাদের ওপর গুপ্তহত্যার চেষ্টাও তারা চালাতে পারে। এমনও হতে পারে, তারা সরাসরি স্থল অভিযান শুরু করবে। এমনকি উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো দখলের চেষ্টা করাও বিচিত্র নয়।

যদি দুই পক্ষ কোনো চুক্তিতে আসেও, সেই শান্তি স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। তেহরান মনে করে, ওয়াশিংটন শুধু সময় নিচ্ছে। নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে তারা আবার হামলা চালাবে। তাই আমেরিকার যেকোনো উসকানির কড়া জবাব দিতে ইরান এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পরিষ্কার কথাÑএ অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীকে রেখে তারা শান্তিতে বাঁচতে পারবে না। ইরানের মূল লক্ষ্য একটাই। আমেরিকাকে এমন যন্ত্রণার মধ্যে ফেলা, যাতে বাধ্য হয়ে তারা এই অঞ্চল থেকে অধিকাংশ সৈন্য তুলে নেয়, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয় এবং ইরানকে একটি স্থায়ী পরাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

ভয় এবং ঘৃণা

যুদ্ধ যখন শুরু হয়, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তখন পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তিনি ইরানের ক্ষমতা বদলে দিতে চান। শুরুর দিকের হামলাই চালানো হয়েছিল সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বাসস্থান লক্ষ্য করে। সেই হামলায় খামেনিসহ বহু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। আব্বাস আরাঘচি অলৌকিকভাবে বোমাবর্ষণ থেকে বেঁচে যান। এরপর কোনোমতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছে পরিস্থিতির রাশ হাতে নেন।

ইরানের শাসনব্যবস্থা অবশ্য এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে তারা পুরো একটা বছর সময় নিয়েছিল। রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব তৈরি ছিল। বড় কর্মকর্তাদের প্রত্যেকের উত্তরসূরি ঠিক করা ছিল আগে থেকেই। তা সত্ত্বেও এ ঘটনা তাদের গভীর ধাক্কা দেয়। নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এই হামলায় তার বাবা, স্ত্রী, বোন এবং ভাগনিকে হারিয়েছেন।

আমেরিকা যখন সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পরিবহনব্যবস্থার ওপর হামলা চালাল, তখন ইরানের নেতারা মারাত্মক ক্ষেপে গেলেন। তারা ধরে নিলেন, ইসরাইল আর আমেরিকা আসলে পুরো ইরান দেশটাকেই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে চায়। মোজতবা খামেনি আক্রমণাত্মক অভিযানের প্রস্তুতি নিতে উগ্রপন্থি নেতাদের পদে বসালেন। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মহসেন রেজাই পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, ইরান এখন আমেরিকার অর্থনৈতিক সম্পদ আর তেল কোম্পানিগুলোকে নিশানা করবে। শুধু তা-ই নয়, ইরান আগ বাড়িয়ে আক্রমণ চালানোও শুরু করল। জুলাই মাসে জর্ডানে থাকা একটি মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানে তারা। এতে তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হন।

এই নতুন কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো আমেরিকার সামরিক ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ধসিয়ে দেওয়া। বড় যুদ্ধের বিরতিতে ক্ষণে ক্ষণে ছোট ছোট হামলা চালিয়ে শত্রুকে দুর্বল করার কৌশল নিয়েছে ইরান। তারা চায়, আমেরিকা যেন তাদের বাহিনীকে রক্ষা করতে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং একসময় বাধ্য হয়ে এ অঞ্চল ছেড়ে চলে যায়।

সুযোগের সদ্ব্যবহার

ইরানের নেতাদের ধারণা, তারা দ্রুত আক্রমণ বাড়িয়ে দিয়েছিল বলেই আমেরিকা আর ইসরাইল সাধারণ নাগরিকদের ওপর বড় ধরনের হামলা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। অবশ্য তারা এখনই নিজেদের পুরোপুরি বিজয়ী ভাবছেন না। কারণ, মার্কিন কর্তারা এখনো ইরানকে দুর্বল হিসেবেই তুলে ধরছেন। সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছিলেন, ইরান নাকি ধ্বংসের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। তেহরানের দুশ্চিন্তা অন্য জায়গায়। ওয়াশিংটন যদি ভেবে নেয় তারা দুর্বল, তবে আমেরিকা চাপ বাড়াতেই থাকবে। তাই মোজতবা খামেনি সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ প্রতিরোধের নির্দেশ দিয়েছেন।

তেহরান এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে আমেরিকা মোটেও নির্ভরযোগ্য কোনো সঙ্গী নয়। ওয়াশিংটন তো ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি থেকে একতরফাভাবে বেরিয়ে গিয়েছিল। আবার ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে আলোচনার টেবিলে বসেই তারা ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে। তাছাড়া, ইরানি নেতারা ভয় পাচ্ছেন যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখে তারা আজ যে সুবিধা পাচ্ছে, কাল হয়তো তা থাকবে না। বিকল্প বাণিজ্যিক পথ তৈরি হয়ে গেলে এই অস্ত্রের ধার কমে যাবে। তাছাড়া আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ওয়াশিংটন হয়তো আরো খোলামেলা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যাবে।

কাজেই, ইরান এখনই সর্বাত্মক চাপ তৈরি করতে চায়। পারস্য উপসাগরের আঞ্চলিক তেল কারখানা আর বন্দরগুলোতে হামলা চালিয়ে তারা জ্বালানি রপ্তানি পুরোপুরি অচল করে দিতে পারে। ইয়েমেনের হুথি মিত্রদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে লোহিত সাগর বন্ধ করে দেওয়াও তাদের কাছে কঠিন কিছু নয়। মার্কিন ঘাঁটিতে আরো ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্র মারা হতে পারে। বেসামরিক অবকাঠামোতে সাইবার হামলা চালানো কিংবা সুপেয় পানি তৈরির কারখানায় আঘাত হানার বিষয়টিও তাদের বিবেচনায় আছে। এর বাইরে, মার্কিন ও ইসরাইলি কর্মকর্তাদের বেছে বেছে হত্যা করার যে পুরোনো ক্ষমতা, সেটিকে আবার সক্রিয় করার পরিকল্পনা করছে তেহরান।

কোনো ছাড় নয়

সাধারণ প্রতিশোধে যদি কাজ না হয়, তবে ইরান নতুন পথ ধরবে। বিশ্ব যোগাযোগব্যবস্থা অচল করে দিতে হরমুজ প্রণালির তলদেশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেট শুধু কেটে দেওয়া হতে পারে।

নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষার দোহাই দিয়ে ইরান প্রতিবেশীদের ভূখণ্ডও দখল করে নিতে পারে। মার্কিন হুমকি মোকাবিলায় তারা জমি দখলের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে। কিছু উগ্রপন্থি কর্মকর্তা তো বাহরাইন আর কুয়েতের কিছু অংশ দখল করে সেখানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো কবজা করার প্রস্তাব পর্যন্ত দিয়েছেন।

আজারবাইজান ইসরাইলকে তাদের জমি ব্যবহার করতে দিচ্ছেÑএই অভিযোগ তুলে ইরান আজারবাইজানের জ্বালানি অবকাঠামো তছনছ করতে পারে। কিংবা তাদের নাখচিভান এলাকাটি দখল করে নিতে পারে। ঠিক একইভাবে, মার্কিন স্থল অভিযান ঠেকাতে ইরাকের কুর্দি অঞ্চলে ঢুকে পড়ার পরিকল্পনাও ইরানের মাথায় রয়েছে।

সবশেষে আসে পারমাণবিক বোমার কথা। ইরান শেষ পর্যন্ত হয়তো অ্যাটম বোমা বানিয়েই ফেলবে। তেহরানের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব মনে করেন, শত্রুকে আটকে রাখার একমাত্র উপায় পারমাণবিক অস্ত্র। নেতারা যদি দেখেন আমেরিকা হামলা থামাবেই না, তবে তারা চূড়ান্ত এই সিদ্ধান্তটি নিয়ে ফেলতে পারেন।

ধ্বংসের নেশা

ইসরাইল আর আমেরিকা যদি আরো কঠোর হামলা চালায়, তবু তারা সফল হবে না। বিরাট বড় স্থল অভিযান না চালিয়ে ইরানকে থামানো অসম্ভব। অবকাঠামো ধ্বংস করে বা নেতাদের হত্যা করে কাজ হবে না। এতে সরকারের টিকে থাকার জেদ আরো বাড়বে।

ওয়াশিংটন যদি যুদ্ধবিরতি চায়ও, তাতে স্থায়ী শান্তি আসবে না। ইরান চায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন বাহিনীর নাম-নিশানা মুছে যাক। আমেরিকা যাতে দ্রুত পাততাড়ি গোটায়, সেজন্য ইরান হয়তো তাদের আঞ্চলিক সহযোগী আর নৌবাহিনীর ওপর হঠাৎ বড় ধরনের সমন্বিত হামলা চালিয়ে বসবে।

টানা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ইরানের মতো একনায়কতান্ত্রিক সরকারের জন্য অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি তৈরি করে। কিন্তু ইরানি নেতারা অন্য কথা ভাবছেন। বেসামরিক অবকাঠামোতে মার্কিন হামলার কারণে সাধারণ মানুষ এখন বিশ্বাস করছে, দেশ বাঁচাতে এই যুদ্ধের কোনো বিকল্প নেই।

সর্বাত্মক লড়াই

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পরও ইরান এমন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছিল। তখনকার নেতারা একটা শিক্ষা পেয়েছিলেন। টিকে থাকতে হলে কড়া পাল্টা আঘাত হানতে হয়, নিজের শক্তি দেখাতে হয়।

ইরানের বর্তমান নেতারা সেই শিক্ষা ভুলে যাননি। তারা বিশ্বাস করেন, মার্কিন ও ইসরাইলি হামলা থামাতে হলে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার বিকল্প নেই। আর তাই, আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে না যাওয়া পর্যন্ত সব ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে একদম প্রস্তুত তেহরান।

ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর জুলফিকার হায়দার

ধর্ম যার যার...

মাধ্যমিক থেকেই সেমিস্টার পদ্ধতি চালু হোক

অধিকাংশই তস্কর হলে উপায় কী

বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দাও জাপান

আওয়ামী শিক্ষানীতি আর কতকাল চলবে

ভারতে সর্বগ্রাসী নজরদারির আওতায় জনজীবন

ব্যর্থ রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র থেকে সাবধান

ক্ষমতা নয়, প্রয়োজন সুশাসন

রাষ্ট্র সংস্কারে চিন্তা ও মূল্যবোধের পুনর্গঠন জরুরি

যাত্রাটা অব্যাহত রাখতে হবে