হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

বাংলার হারানো সনের কথা

মাহমুদুল হাসান

বাংলাদেশের ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে সময় গণনার বহু বিচিত্র পদ্ধতি; বহু সন, বহু প্রথা, বহু স্মৃতি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজা ও রাজবংশের কল্যাণে এই ভূখণ্ডে নানা ধরনের সনের প্রচলন ছিল। এগুলোর কোনোটি ছিল কোনো বিশেষ রাজার বা রাজবংশের প্রতিষ্ঠা-সন, আবার কোনোটি ইতিহাসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মারক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এ দেশের প্রাচীন সনগুলোর মধ্যে বিক্রম সম্বৎ (৫৮ খ্রী. পূ.) ও শকাব্দ (৭৮ খ্রী.)-এর প্রচলন ছিল ব্যাপক।

বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের সময় লক্ষ্মণ সম্বৎ (লসং) চালু ছিল। তারও আগে পালাব্দ, অর্থাৎ পাল রাজাদের ব্যক্তিগত রাজ্যকালের হিসাবভিত্তিক সন ব্যবহৃত হতো। পাল বংশের পতনের পর সেনবংশ বাংলার সিংহাসন দখল করে। সেন বংশের পর মুসলিম আমল শুরু হলে বাংলায় প্রধানত হিজরি সনের ব্যবহার শুরু হয়। তবে রাজকার্যের বাইরে প্রান্তিক পর্যায়ে শকাব্দ ও বিক্রম সম্বৎও প্রচলিত ছিল। এর পাশাপাশি ছোটখাটো রাজা ও জমিদারদের প্রয়োজনে আঞ্চলিক সন ব্যবহারের কথাও জানা যায়।

পালাব্দ

পালাব্দ ছিল বাংলার প্রাচীনতম সনগুলোর মধ্যে একটি, যা পাল রাজাদের শাসনামলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এই সনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কোনো নির্দিষ্ট সূচনাবর্ষ থেকে গণনা না হয়ে পাল রাজাদের ব্যক্তিগত রাজ্যকালের হিসাব অনুসারে নির্ধারিত হতো (রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, প্রাচীন যুগ)। অর্থাৎ, প্রত্যেক নতুন পাল রাজার সিংহাসনে আরোহণের সঙ্গে সঙ্গে তার রাজত্বকালকে ভিত্তি করে নতুনভাবে সময় গণনা শুরু হতো (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদিপর্ব)। ফলে পালাব্দ একটানা ধারাবাহিক কোনো সন নয়; বরং এটি রাজাভিত্তিক পৃথক পৃথক সময়-পরিমাপের একটি পদ্ধতি (দীনেশচন্দ্র সরকার, পাল ও সেন যুগের ইতিহাস)। বাংলার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে পালাব্দের ব্যবহার প্রাচীন শাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে এবং সে যুগের রাজকীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রতিফলন ঘটায় (R. C. Majumdar (ed.), The History of Bengal, Vol. I)।

লক্ষ্মণাব্দ

সেন রাজবংশের সর্বশেষ রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজত্বকাল থেকে এই সনের প্রচলন হয় (রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ)। আইন-ই-আকবরী থেকে জানা যায়, সম্রাট আকবরের নবতর সন প্রবর্তনের সময় ৪৬৫ লক্ষ্মণাব্দ প্রচলিত ছিল (আবুল ফজল, আইন-ই-আকবরী)।

প্রগনাতি বা পরগনাতি সন

যতদূর অনুমান করা যায়, এ নামে কোনো স্বতন্ত্র সন ছিল না; বরং খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বিভিন্ন পরগনায় পৃথক সন ব্যবহৃত হতো, যেগুলোকেই পরগনাতি সন বলা হতো (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদিপর্ব) । ধারণা করা হয়, বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গজয়ের পর এর প্রথার সূচনা হয়—যদিও এটি নিছক অনুমান (R. C. Majumdar (ed.), The History of Bengal, Vol. I)। আঠারো শতকের কবি হায়াত মাহমুদ তার কাব্যে পরগনাতি সনের উল্লেখ করলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি বাংলা সনই ব্যবহার করেছেন (দীনেশচন্দ্র সরকার, বাংলা সাহিত্যবিষয়ক গবেষণা গ্রন্থাবলি)।

মঘী সন

আরাকান-চট্টগ্রামের চন্দ্রবংশীয় কোনো রাজা কর্তৃক এই সনের প্রচলন হয় (সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ইতিহাস)। আরাকানের বৌদ্ধ শাসকরা ‘মঘরাজ’ নামে পরিচিত ছিলেন এবং তাদের নামানুসারেই এই সনের নামকরণ (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদিপর্ব)। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে, বিশেষত আরাকান-চট্টগ্রাম অঞ্চলের কবিদের রচনায় এই সনের ব্যবহার দেখা যায় (দীনেশচন্দ্র সরকার, বাংলা সাহিত্য ইতিহাসবিষয়ক গবেষণা)। মঘী সনের সঙ্গে ৬৩৮ যোগ করলে খ্রিষ্টাব্দ পাওয়া যায় (R. C. Majumdar (ed.), The History of Bengal, Vol. I)।

মল্লাব্দ বা বিষ্ণুপুরী সন

পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর রাজ্যে প্রচলিত এই সনকে মল্লাব্দ বা বিষ্ণুপুরী সন বলা হয় (রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ)। কথিত আছে, রাজবংশের আদি পুরুষ আদিমল্লের নামে এই সনের প্রতিষ্ঠা (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদিপর্ব)। তবে আদিমল্লের সিংহাসনে আরোহণের সময় বিবেচনায় এ মত সর্বজনগ্রাহ্য নয় (R. C. Majumdar (ed.), The History of Bengal, Vol. I)। মল্লাব্দের সঙ্গে ৬৯৬ যোগ করলে খ্রিষ্টাব্দ নির্ণীত হয় (দীনেশচন্দ্র সরকার, পাল ও সেন যুগের ইতিহাস)।

সর্বসিদ্ধ সন বা শ্রীরামসিদ্ধ সন

এই সনের উল্লেখ পাওয়া যায় বগুড়া জেলার নাথ-সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান ‘যোগীর ভবন’-এর শিলালেখায় (দীনেশচন্দ্র সরকার, শিলালিপিবিষয়ক গবেষণা)। ‘সর্বসিদ্ধ সন ১১৭৮’ এবং ‘শ্রীরামসিদ্ধ সন ১১৭৩’ প্রভৃতি উৎকীর্ণ তথ্য থেকে এই সনের অস্তিত্ব জানা যায় (রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ)। এর উৎপত্তি সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না; তবে অনুমান করা হয়, এটি বাংলা সন প্রবর্তনের পরবর্তী কালের সৃষ্টি (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদিপর্ব)।

মিলিক বা মুলুক সন ও দানিশাব্দ

‘মিলিক’ সনের সন্ধান পাওয়া যায় রাজশাহীর বাঘা অঞ্চলের প্রাচীন দলিলে (রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, মধ্যযুগ)। হযরত মুহম্মদ রফীক, ১০৩৭ হিজরি (১৬২৭ খ্রিষ্টাব্দ) ‘রফিকী ওয়াকফ স্টেট’ প্রতিষ্ঠা করেন। ধারণা করা হয়, এই সময় থেকেই মিলিক সনের প্রচলন শুরু (R. C. Majumdar (ed.), The History of Bengal, Vol. II)। এই সনের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—এর গণনা অগ্রহায়ণ মাস থেকে শুরু হয় (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদিপর্ব))। ‘বঙ্গাব্দ ১২৪৮, দানিশাব্দ ৯১’ উল্লেখ পাওয়া গেলেও এর প্রকৃত পরিচয় স্পষ্ট নয় (দীনেশচন্দ্র সরকার, ঐতিহাসিক গবেষণা নিবন্ধসমূহ)।

ত্রিপুরাব্দ

ত্রিপুরার রাজা ধীররাজ কর্তৃক এই সনের প্রতিষ্ঠা (রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, প্রাচীন যুগ)। ত্রিপুরাব্দের সঙ্গে ৫৯০ যোগ করলে খ্রিষ্টাব্দ নির্ণয় করা যায় (R. C. Majumdar (ed.), The History of Bengal, Vol. I)।

চৈতন্যাব্দ বা বৈষ্ণব সন

শ্রী চৈতন্যদেবের জন্মসাল বা তিরোভাবকাল থেকে এই সনের সূচনা ধরা হয় (নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদিপর্ব)। তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক। তার প্রভাবে বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলির বিকাশ ঘটে (সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ইতিহাস)। এই ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতেই চৈতন্যাব্দ বা বৈষ্ণব সনের প্রচলন (R. C. Majumdar (ed.), The History of Bengal, Vol. II)।

বাংলাদেশের ইতিহাসের এই সনগুলো শুধু সময় গণনার মাধ্যম নয়; এগুলো আমাদের অতীতের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বহুত্বের সাক্ষ্য বহন করে। আজ অনেক সনই বিস্মৃতির অন্তরালে। তবু তাদের স্মৃতি আমাদের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস ও উদযাপনের রীতি-নীতি

চোরতন্ত্রের দেশে নেপোকিডরা

শিক্ষক প্রশিক্ষণ : চাই শ্রেণিকক্ষে বাস্তব পরিবর্তন

পাঁচ জেনারেল ও বাংলার ট্র্যাজেডি

আমেরিকা কি আরেকটি যুদ্ধে হেরে গেল

বৈশাখী নববর্ষ, লাল ঝুঁটির মোরগ, কী আনন্দ!

ভূমধ্যসাগরের নীল জলে ডুবছে কেন জেনজিরা

৭১ সালের বিজয় ও ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের ঐকতান

সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন ও বিরোধী নেতার দুঃখ

নতুন সময়সূচি ও অর্থনীতিতে প্রভাব