হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

জনগণের নৈতিক পুনর্গঠন : উত্তরণের রূপরেখা

আবদুল লতিফ মাসুম

রাষ্ট্র শুধু একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা বা রাজনৈতিক কাঠামো নয়; তার অন্তর্নিহিত পরিচয় হলো—এটি একটি বৃহত্তর নৈতিক সত্তা। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার সামরিক সক্ষমতা, আকাশচুম্বী দালানকোঠা বা নিছক জিডিপিনির্ভর অর্থনৈতিক সামর্থ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এর সত্যিকারের ভিত্তি নিহিত থাকে তার জনগণের নৈতিক চরিত্রে, মূল্যবোধে এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর। সেই অর্থে, বাংলাদেশের বর্তমান বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে এবং চলমান সংকটগুলোকে গভীরভাবে বুঝতে হলে আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে হবে সমাজের দর্পণে। ফিরে তাকাতে হবে জনগণের জনচরিত্র, তার ঐতিহাসিক বিবর্তন, সাম্প্রতিক দশকের ভয়াবহ অবক্ষয় এবং চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত সম্ভাব্য পুনর্জাগরণের দিকে।

চতুর্দশ শতাব্দীর প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও মধ্যযুগীয় মনীষী ইবনে খালদুন তার বিখ্যাত ও কালজয়ী গ্রন্থ ‘আল মুকাদ্দিমা’য় রাষ্ট্রের উত্থান-পতনের এক অসামান্য মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হাজির করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, একটি রাষ্ট্রের উত্থান ও টিকে থাকার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে জনগণের অভ্যন্তরীণ সংহতি, যাকে তিনি ‘আসাবিয়্যা’ বা সামাজিক সংহতি বলে অভিহিত করেছেন। এই আসাবিয়্যা শুধু একটি যান্ত্রিক ঐক্য নয়; এটি মূলত একটি গভীর নৈতিক ও সামাজিক শক্তি, যা একটি জনসমষ্টিকে নিঃস্বার্থভাবে ঐক্যবদ্ধ করে, সামষ্টিক কল্যাণে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত অখণ্ডতাকে টিকিয়ে রাখে। যখন শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতি, বিলাসিতা এবং অবিচারের কারণে সমাজের এই নৈতিক সংহতি দুর্বল হয়ে যায়, তখন রাষ্ট্রের বাহ্যিক কাঠামো যতই শক্তিশালী মনে হোক না কেন, তা ভেতর থেকে অসার হয়ে পড়ে এবং অনিবার্য পতনের দিকে ধাবিত হয়।

বাংলাদেশের জনচরিত্র কোনো আকস্মিক শূন্যতা থেকে তৈরি হয়নি; এটি দীর্ঘ ইতিহাসের এক ধারাবাহিক ও জটিল বিবর্তনের ফসল। বদ্বীপের বহমান নদী, পলিময় প্রকৃতি, কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতি, শতবর্ষের বঞ্চনাময় ঔপনিবেশিক শাসন, বায়ান্নর রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ—এসবের সম্মিলিত ও গভীর প্রভাব এ দেশের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক মানস গঠন করেছে। বাঙালি এক অদ্ভুত দ্বৈতসত্তার অধিকারী। একদিকে সে চরম আবেগপ্রবণ, পরোপকারী, সহানুভূতিশীল ও গভীর সংস্কৃতিমনা; অন্যদিকে সে আত্মকেন্দ্রিক, বিভাজিত, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বদলে স্বল্পমেয়াদি চিন্তায় অভ্যস্ত এবং প্রায়ই ক্ষুদ্র দলাদলি বা পরশ্রীকাতরতায় নিমগ্ন। এই পরস্পরবিরোধী দ্বৈত চরিত্রই বাংলাদেশের জনচরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য, যা আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত প্রতিফলিত হয়।

প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা তার সাড়া জাগানো ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে বাঙালির মানসিক কাঠামোর এই গভীর সংকট ও স্ববিরোধিতাকে অত্যন্ত নির্মোহভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, আত্মপরিচয়ের অস্পষ্টতা, বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনে অনাগ্রহ এবং ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠা মানসিক দাসত্ব বা দুর্বলতা বাঙালির মধ্যে একটি স্থায়ী দ্বিধা ও হীনম্মন্যতা তৈরি করেছে। একইভাবে, ক্ষুরধার চিন্তক আহমদ শরীফ বাঙালির চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আক্ষেপ করে বলেছেন, এই জাতির মধ্যে যেমন যেকোনো অসম্ভবকে সম্ভব করার অসাধারণ সৃজনশীলতা ও লড়াকু প্রবৃত্তি রয়েছে, ঠিক তেমনি এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে আছে স্বার্থপরতা, ভীরুতা এবং অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হওয়ার মতো নেতিবাচক প্রবণতা। অর্থাৎ, আমাদের জনচরিত্র প্রবল সম্ভাবনাময় এবং প্রাণবন্ত হলেও, তা ঐতিহাসিকভাবেই এক ধরনের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা ও নৈতিক স্খলনের ঝুঁকিতে আক্রান্ত।

এই ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক জনচরিত্রের দুর্বলতার ভেতর থেকেই, বিশেষ করে, স্বাধীনতা-পরবর্তী দশকগুলোতে, ধীরে ধীরে এক ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয়ের সূচনা হয়েছে। মনে রাখা প্রয়োজন, নৈতিকতা কোনো আকাশ থেকে পড়া বিমূর্ত বা তাত্ত্বিক ধারণা নয়; এটি প্রতিদিনের সাধারণ আচরণ, রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রাত্যহিক সামাজিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে বাস্তব রূপ লাভ করে। যখন কোনো সমাজের ব্যক্তি নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থকে বৃহত্তর সমাজের বা রাষ্ট্রের স্বার্থের ওপরে স্থান দেয়, যখন সত্য ও ন্যায়ের পরিবর্তে যেকোনো উপায়ে ‘সুবিধা আদায়’ জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে, তখনই সামষ্টিক স্তরে নৈতিক অবক্ষয় শুরু হয়।

বাংলাদেশে এই অবক্ষয় কোনো রাতারাতি ঘটা দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার ফল। আমাদের ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার তীব্র অভাব, জিপিএ ৫-কেন্দ্রিক যান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় শিশুদের ঠেলে দেওয়া, পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানে মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়া এবং সবচেয়ে বড় কথা—রাজনৈতিক সংস্কৃতির সীমাহীন দুর্বৃত্তায়ন—সবকিছু মিলিয়ে সমাজে এক শ্বাসরুদ্ধকর নৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে আমরা এমন এক অন্ধকার সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে ‘সততা’ অনেক ক্ষেত্রে বোকামি বা দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে, অসততা, চাতুর্য বা অনৈতিকতাকে ‘স্মার্টনেস’ বা সফলতার শর্টকাট হিসেবে মহিমান্বিত করা হয়। এই বিকৃত মানসিকতা সমাজকাঠামোকে উইপোকার মতো ভেতর থেকে একেবারে ফোঁপর করে দিচ্ছে।

এই ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান, নগ্ন ও ধ্বংসাত্মক প্রকাশ হলো সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়া সর্বব্যাপী দুর্নীতি। দুর্নীতিকে আজ আর শুধু একটি আর্থিক বা আইনি অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি একটি গভীর ও মরণঘাতী নৈতিক ব্যাধি। সরকারি প্রশাসনের শীর্ষ স্তর থেকে শুরু করে তৃণমূলের সেবা খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসালয়, এমনকি আইন ও বিচারব্যবস্থা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতি আজ একটি অলিখিত নিয়মে বা প্রাতিষ্ঠানিক রূপে পর্যবসিত হয়েছে। মেগা প্রকল্পের নামে মেগা লুটপাট, বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার, চাকরির নিয়োগ-বাণিজ্য থেকে শুরু করে জন্মনিবন্ধন সনদ—সবখানেই ঘুস, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণের নির্লজ্জ আস্ফালন। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জালিয়াতি—এসব এখন আর খবরের কাগজের বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটিই যেন বর্তমান বাংলাদেশের এক স্বাভাবিক ও অমোঘ বাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল।

এই অবাধ দুর্নীতির সংস্কৃতি সাধারণ জনগণের নৈতিক চেতনাকে প্রতিনিয়ত আরো দুর্বল ও ভোঁতা করে দিয়েছে। যখন সাধারণ মানুষ প্রতিদিন দেখে যে, দুর্নীতিবাজ, লুটেরা এবং অসৎ ব্যক্তিরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজের সর্বোচ্চ স্তরে আসীন হচ্ছে, অগাধ বিত্তবৈভবের মালিক হচ্ছে আর সৎ ও নীতিবান মানুষরা পদে পদে উপেক্ষিত, অপমানিত এবং লাঞ্ছিত হচ্ছে—তখন খোদ সৎ মানুষদের মধ্যেও বেঁচে থাকার তাগিদে নৈতিক আপসের প্রবণতা জন্ম নেয়। ফলে সমাজে একটি ভয়ংকর দুষ্টচক্র বা ‘ভিসিয়াস সার্কেল’ তৈরি হয়, যেখানে দুর্নীতি নিজেই নিজেকে বৈধতা দেয় এবং টিকিয়ে রাখে।

এর সঙ্গে গত দেড় দশকে যুক্ত হয়েছিল দীর্ঘদিনের একতরফা ও চরম স্বৈরাচারী শাসনের অমানবিক ও অনৈতিক প্রভাব। স্বৈরাচার শুধু মানুষের ভোটের অধিকার বা রাজনৈতিক স্বাধীনতাই হরণ করে না; এটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে একটি জাতির মেরুদণ্ড এবং মানুষের অভ্যন্তরীণ নৈতিক শক্তিকেও ধ্বংস করে দেয়। যখন রাষ্ট্র তার নিপীড়নমূলক যন্ত্রগুলোর (যেমন—পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, দলীয় ক্যাডার বাহিনী) কেন্দ্রীভূত ও বেআইনি ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের স্বাধীন কণ্ঠরোধ করে, তখন সমাজে সত্য কথা বলা সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ হয়ে ওঠে এবং মিথ্যার তোষামোদ করা সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ভীতিকর পরিস্থিতি সমাজের প্রতিটি স্তরে—এমনকি বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের মধ্যেও—ভয়, মেরুদণ্ডহীন আত্মসমর্পণ এবং নির্লজ্জ চাটুকারিতার এক জঘন্য সংস্কৃতি তৈরি করে।

স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থায় আইনের শাসনের কোনো অস্তিত্ব থাকে না; সেখানে আইন পরিণত হয় শাসকগোষ্ঠীর হাতিয়ারে এবং ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছাই হয়ে দাঁড়ায় অলিখিত আইন। এর ফলে সমাজে ন্যায়বিচারের শাশ্বত ধারণাটি সম্পূর্ণ মুখ থুবড়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের ন্যূনতম আস্থাও ধূলিসাৎ হয়ে যায়। নিরুপায় মানুষ তখন আদর্শ বা নৈতিকতার চেয়ে যেকোনো মূল্যে ‘টিকে থাকার কৌশল’কে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই শ্বাসরুদ্ধকর প্রক্রিয়ায় সমাজের অবশিষ্ট নৈতিক ভিত্তিটুকুও ক্রমেই ভেঙে পড়ে।

তবে, পৃথিবীর ইতিহাস আমাদের বারবার দেখায়, অন্ধকারের সবচেয়ে গভীরতম বিন্দুর মধ্যেই নতুন সূর্যোদয়ের এবং পরিবর্তনের বীজ লুকিয়ে থাকে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান সেই সুপ্ত সম্ভাবনারই এক অভাবনীয় ও শক্তিশালী প্রকাশ। এই অভ্যুত্থানকে শুধু একটি সরকার পতনের বা রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের আন্দোলন হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি ছিল মূলত একটি জাতির পুঞ্জীভূত নৈতিক প্রতিবাদের এক আগ্নেয়গিরিসম বহিঃপ্রকাশ। ১৫ বছরের অবিচার, গুম-খুন, ভয়াবহ বৈষম্য, বাকস্বাধীনতা হরণ এবং রাষ্ট্রীয় অনৈতিকতার বিরুদ্ধে দলমত-নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের অন্তর্গত যে ক্ষোভ জমেছিল, তা-ই একসময় প্রবল বিস্ফোরণে রূপ নিয়েছে।

এই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও আশাজাগানিয়া দিকটি ছিল জেনারেশন—জেড (জেন-জি) বা তরুণ প্রজন্মের ভয়ডরহীন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ। তারা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে শুধু একটি স্বৈরাচারী সরকারের পতন চায়নি; তারা বুক চিতিয়ে দাবি তুলেছে বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক, ন্যায়পরায়ণ এবং সম্পূর্ণ একটি নতুন ‘নৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা’র। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বা ‘রাষ্ট্রসংস্কার চাই’—তাদের এই স্লোগানগুলো প্রমাণ করে যে, সীমাহীন অবক্ষয়ের মধ্যেও বাংলাদেশের জনগণের ভেতরে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে, নৈতিক চেতনাসম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। বরং তা ছাইচাপা আগুনের মতো সুপ্ত অবস্থায় ছিল, যা একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী মুহূর্তে প্রবল শক্তিতে জেগে উঠেছে।

চব্বিশের এই সফল গণঅভ্যুত্থানের পর, ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আজ একটি নতুন নৈতিক পুনর্জাগরণের অপূর্ব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভয়কে জয় করে মানুষ এখন আবার উঁচু গলায় ন্যায়, সত্য, ভোটাধিকার ও জবাবদিহির কথা বলছে। সম্প্রতি গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসায় জনগণের এই গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণের পথ আরো প্রশস্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকান, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীর মধ্যে অধিকার আদায়ের এক নতুন সচেতনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক সূচনা। তবে, আবেগের এই সাময়িক উচ্ছ্বাসকে একটি টেকসই ও স্থায়ী রূপ দিতে হলে এখন প্রয়োজন সুচিন্তিত, সুদূরপ্রসারী ও সুসংগঠিত জাতীয় প্রচেষ্টা।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি জাতির নৈতিক পুনর্গঠন কোনো জাদুর কাঠি বা এক দিনের কাজ নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি, নিরবচ্ছিন্ন ও সামগ্রিক সামাজিক প্রক্রিয়া। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদনের জন্য সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হলো আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার খোলনলচে বদলে ফেলা ও এর আমূল সংস্কার। শিক্ষাক্রমে নিছক মুখস্থবিদ্যা বা কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, সততা এবং সমালোচনামূলক চিন্তার (Critical Thinking) ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ‘সার্টিফিকেট বা জিপিএ উৎপাদনের কারখানা’ না বানিয়ে, চরিত্র গঠনের প্রকৃত পরীক্ষাগারে পরিণত করাই হতে হবে মূল জাতীয় লক্ষ্য।

দ্বিতীয়ত, সমাজের সবচেয়ে ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিশালী একক ‘পরিবার’কে নৈতিক শিক্ষার প্রথম ও প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সন্তানদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই সততা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, অন্যের প্রতি সম্মান ও সহানুভূতির চর্চা পরিবার থেকেই শুরু হতে হবে। অসৎ উপায়ে অর্জিত বিত্তবৈভবকে পারিবারিকভাবেই ঘৃণা করার চর্চা শুরু করতে হবে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুণগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। রাজনীতিকে কোনোভাবেই আর ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার বা রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার লাইসেন্স হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেও গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রাজনীতি আবার মেধা, সততা ও জনসেবার সর্বোচ্চ মাধ্যম হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

চতুর্থত, রাষ্ট্রে আইনের নিরঙ্কুশ শাসন নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে কঠোর ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিটিও বুঝতে পারে যে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। বিচারব্যবস্থার পূর্ণ স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশনের স্বকীয়তা এবং প্রশাসন যন্ত্রের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনোভাবেই একটি নৈতিক রাষ্ট্র বা সমাজ গঠন সম্ভব নয়।

পঞ্চমত এবং পরিশেষে, সামাজিকভাবে সৎ, নীতিবান এবং আদর্শিক ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে মূল্যায়ন ও সম্মান জানানোর সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে। সমাজে এমন একটি নতুন মনস্তাত্ত্বিক আবহ বা ‘ন্যারেটিভ’ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ব্যাংক-লুটেরা বা দুর্নীতিবাজরা সামাজিকভাবে বয়কটের শিকার হবে আর সততা ও নৈতিক দৃঢ়তাই হবে একজন মানুষের সফলতার এবং সম্মানের প্রধান মানদণ্ড।

একটি নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এবং এর দীর্ঘস্থায়ী অস্তিত্ব পুরোপুরি নির্ভর করছে তার জনগণের এই কাঙ্ক্ষিত নৈতিক পুনর্গঠনের ওপর। আমাদের মনে রাখতে হবে, ফ্লাইওভার, মেগা প্রকল্প, বাহ্যিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি—এসবই তাসের ঘরের মতো অর্থহীন হয়ে পড়বে, যদি রাষ্ট্রের সেই কাঠামোর নিচে জনগণের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল বা দুর্নীতিগ্রস্ত থাকে। তাই এখনই সময় নির্মোহ আত্মসমালোচনার, জাতীয় আত্মশুদ্ধির এবং শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার।

পরিশেষে, নৈতিকতা শুধু কোনো ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিগত গুণ নয়; এটি একটি স্বাধীন জাতির প্রাণভোমরা বা আত্মা। ক্ষতবিক্ষত সেই আত্মাকে পুনর্জাগ্রত করে বিশ্বদরবারে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোই আজ আমাদের সামনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

দলমুক্ত শিক্ষাঙ্গন থেকে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রের পথে

গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্গঠন : কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত

ইরান যুদ্ধে ডলার-ইউয়ান প্রতিযোগিতা

সংকটে বিশ্ব আর আমাদের প্রস্তুতি

ক্ষমতা বনাম জনগণ : ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

সিফফিনের প্রশ্ন—জুলাইয়ের উত্তর : পথের দ্বন্দ্ব

বিশ্বজুড়ে স্লোগান উঠুক ‘নো কিংস’

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন : সরকারের দায় ও বাস্তবতা

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ও করণীয়

কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনভিত্তিক শিক্ষা মডেল