২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসে দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়; এটি এক গভীর মানবিক অধ্যায়ের সূচনালগ্ন। মিয়ানমারে ভয়াবহ নির্যাতন, সহিংসতা ও নিপীড়নের মুখে লাখ লাখ বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক যখন জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন, তখন বাংলাদেশ তাদের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয়। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সেই মানবিক ও দায়িত্বশীল অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু প্রায় এক দশক পর সেই মানবিক সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে বাস্তবতার চিত্র এখন অনেক বেশি কঠিন।
২০২৬ সালের ৩০ জুনের বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআরের হিসাব অনুযায়ী বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকের সংখ্যা ১২ লাখ ১৭১ জন। এর মধ্যে কক্সবাজারে বসবাস করছেন ১১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি মানুষ এবং ভাসানচরে রয়েছেন প্রায় ৩৪ হাজার। কিন্তু এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত জীবন, একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং স্বদেশে ফিরে যাওয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষা। ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া একটি শিশু জানে না তার মাতৃভূমি কেমন। একজন মা জানেন না, তার সন্তান কোনোদিন নিজের মাতৃভূমির মাটিতে নিরাপদে ফিরে যেতে পারবে কি না। একজন বাবা জানেন না, আর কত বছর তাকে ত্রাণের ওপর নির্ভর করে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
এই বাস্তবতা আমাদের স্পষ্ট বার্তা দেয়, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু একটি মানবিক সংকট নয়। এটি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের কী শেখায়
বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৭৮ সালে মিয়ানমার থেকে প্রায় দুই লাখ মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। সেই সংকটে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং জাতিসংঘের সক্রিয় সম্পৃক্ততার মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের পথ সুগম হয়।
১৯৯১-৯২ সালেও আরেক দফা বড় সংকটে বাংলাদেশকে বিপুলসংখ্যক বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিককে আশ্রয় দিতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতায় দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা এবং জাতিসংঘের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি হয়। UNHCR-এর নথি অনুযায়ী, ১৯৯২ সালের পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় আড়াই লাখ বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকের প্রত্যাবাসনের জন্য দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতার কাঠামো তৈরি হয়েছিল এবং প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার মানুষ মিয়ানমারে ফিরে যায়। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে বড় আকারে বাস্তবায়িত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াগুলোর একটি। কারণ সেখানে মানবিক আশ্রয়ের পাশাপাশি তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করেছিল; দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, জাতিসংঘের সক্রিয় সম্পৃক্ততা এবং প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ।
এই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় : শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বাস্তু সংকটের সমাধান করা যায় না; মানবিকতার সঙ্গে কার্যকর কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক চাপকে সমান্তরালে এগিয়ে নিতে হয়।
২০১৭-এর পর কোথায় বাধা তৈরি হলো
২০১৭ সালের পর বাংলাদেশ নজিরবিহীন মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। বিপুলসংখ্যক বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিকতার যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে তার সমপর্যায়ের অগ্রগতি দেখা যায়নি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে ২০১৭-এর পর আমরা কোথায় আটকে গেলাম?
নিরাপদ প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ার পেছনে মিয়ানমারের অনাগ্রহ ও অসহযোগিতা যেমন দায়ী, তেমনি পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের কূটনৈতিক কৌশলের সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় দূরদর্শিতার ঘাটতিও অনেকাংশে দায়ী।
পরে শেখ হাসিনা নিজেও স্বীকার করেছিলেন, মিয়ানমার প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় আস্থা ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয় যে, শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনা কিংবা প্রত্যাবাসনের তালিকা তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজন ছিল মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ এবং নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের উপযোগী বাস্তব পরিবেশ তৈরি করা।
মানবিক সহায়তা দেওয়া ছিল আমাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব এবং বাংলাদেশ তা করেছে। কিন্তু ত্রাণ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। ত্রাণ মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে, সাময়িকভাবে দুর্ভোগ লাঘব করতে পারে; কিন্তু একটি বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে না। মানবিকতার পাশাপাশি প্রয়োজন শক্তিশালী কূটনীতি, সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক কৌশল।
২০১৭-এর পর আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই মানবিকতা দিয়ে একটি সংকট সাময়িকভাবে সামলানো যায়, কিন্তু একটি জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে মানবিকতার পাশাপাশি প্রয়োজন শক্তিশালী কূটনীতি, সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক কৌশল।
রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অন্যতম প্রধান পথ হলো তাদের নিজভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন। আমরা চাই না তারা বাংলাদেশে চিরস্থায়ী উদ্বাস্তু হয়ে থাকুক। আবার এমন প্রত্যাবাসনও কাম্য নয়, যা তাদের দ্বিতীয়বারের মতো উদ্বাস্তুতে পরিণত করবে। একটি শিশুর ভবিষ্যৎ যেন আন্তর্জাতিক উদাসীনতার কাছে পরাজিত না হয়। একই সঙ্গে কক্সবাজারের একটি বাংলাদেশি পরিবারের ভবিষ্যৎও যেন এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে অনিরাপদ হয়ে না যায়। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় মানবিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
বাংলাদেশ প্রায় এক দশক ধরে একটি আন্তর্জাতিক সংকটের বোঝা বহন করছে। বিশ্বনেতাদের কাছে তাই আমাদের আবেদন খুব সরল। বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের ভুলে যাবেন না। বাংলাদেশ তার মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। সীমান্ত খুলেছে, আশ্রয় দিয়েছে, খাদ্য দিয়েছে, চিকিৎসা দিয়েছে, একটি বিপন্ন জনগোষ্ঠীকে বেঁচে থাকার সুযোগ দিয়েছে। এখন বিশ্বের দায়িত্ব, সমাধানের দায়িত্বটিও ভাগ করে নেওয়া।
বাংলাদেশ আর শুধু আশ্রয়দাতা দেশ হিসেবে থাকতে পারে না; তাকে এখন সমাধানের সক্রিয় কূটনৈতিক অংশীদার হতে হবে। আর সেই কূটনীতির লক্ষ্য হতে হবে একটিই, বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তারা নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরে গিয়ে আবার মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার পাবে।
বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের জন্য একটি নিরাপদ আগামী; এই দুই লক্ষ্যকে একসঙ্গে সামনে রেখেই আমাদের নতুন পথ তৈরি করতে হবে। মানবিকতার দায় বাংলাদেশ নিয়েছে। এখন প্রয়োজন কূটনীতির শক্তিতে সেই দায়কে টেকসই সমাধানে রূপ দেওয়া।
লেখক: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি