পদ্মা বাঁধ শুধু একটি প্রকৌশল প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পানির নিরাপত্তা সংকটের প্রেক্ষাপটে একটি কৌশলগত প্রতিক্রিয়া। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ বহুমাত্রিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে। চুক্তির পরও ভারত বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করেছে।
তা ছড়া ভারত ফারাক্কা ব্যারাজের উজানে বিভিন্ন পয়েন্টে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। পানির অভাবে একদা পদ্মা শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়। পানির অভাবে মরে গেছে অনেক নদী। পদ্মার আরো অনেক শাখা নদী মৃতপ্রায়।
প্রস্তাবিত পদ্মা বাঁধকে তাই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে—যার লক্ষ্য দেশের ভেতরে পানি ধরে রাখা, মৃতপ্রায় নদী পুনরুজ্জীবিত করা, সেচব্যবস্থা উন্নত করা, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ করা, নৌ চলাচল সহজ করা এবং পরিবেশগত ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। সরকারি প্রতিবেদন অনুসারে, প্রকল্পের প্রথম ধাপের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। পরে এ ব্যয় দাঁড়াবে ৫০ হাজার কোটি টাকায়। রাজবাড়ীর পাংশায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে, যেখানে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, নৌ চলাচলের লক, মাছ চলাচলের ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নদী পুনরুদ্ধারমূলক কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
কৌশলগত যুক্তি
বাংলাদেশের মূল যুক্তি খুবই সহজ : যদি উজানের দেশ পানির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখে, তবে ভাটির দেশকেও নিজের ভূখণ্ডে পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। পদ্মা বাঁধের উদ্দেশ্য বর্ষাকালে প্রবাহিত বিপুল পরিমাণ পানির একটি অংশ ধরে রাখা এবং শুকনো মৌসুমে তা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা। প্রকল্পপত্র অনুযায়ী, এই বাঁধ প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করতে পারবে এবং প্রায় ২ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন হেক্টর নিট কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা দিতে পারে। খুলনা, রাজশাহী, ঢাকা ও বরিশাল বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এর সুফল পেতে পারে। এই অর্থে প্রকল্পটির তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, এটি বাংলাদেশের উজাননির্ভর দুর্বলতা কিছুটা কমাতে পারে। ফারাক্কা ভারতের হাতে পানি নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দিয়েছে। ভাটিতে নির্মিত পদ্মা বাঁধ বাংলাদেশের ন্যায্য পানি পাওয়ার অধিকারকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না, কিন্তু এটি বাংলাদেশকে নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনায় কিছুটা সক্ষমতা দিতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এটি প্রবাহহীনতায় ক্ষতিগ্রস্ত নদী ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করবে। বিশেষ করে, গড়াই-মধুমতি, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতির মতো নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি, পরিবেশ ও জনজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, এটি একটি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবেও বিবেচিত—যার সঙ্গে সেচ, মৎস্য, নৌ চলাচল, বিদ্যুৎ উৎপাদন, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ জড়িত। সরকারি প্রাক্কলনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি জিডিপিতে ০.৪৫ শতাংশ পর্যন্ত অবদান রাখতে পারে এবং বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ সুফল দিতে পারে।
পদ্মা বাঁধের সুফল
পদ্মা বাঁধের সবচেয়ে বড় সুফল হলো মিঠাপানি ধরে রাখার ক্ষমতা। বাংলাদেশ একটি ভাটির দেশ। শুকনো মৌসুমে দেশের বহু নদী পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ পায় না। সঠিকভাবে নকশা ও পরিচালনা করা গেলে পদ্মা বাঁধ বর্ষার পানি ধরে রেখে শুকনো মৌসুমে ধীরে ধীরে ছাড়তে পারবে।
দ্বিতীয় সুফল হলোÑলবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল—বিশেষত খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট—বঙ্গোপসাগর থেকে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশে ক্ষতিগ্রস্ত। গঙ্গা-পদ্মা ব্যবস্থায় মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেলে লবণাক্ত পানি আরো ভেতরে প্রবেশ করে। পদ্মা বাঁধ যদি ভাটিতে মিঠাপানির চাপ বজায় রাখতে পারে, তবে কৃষি, পানীয় জলের উৎস, মৎস্যসম্পদ এবং সুন্দরবন রক্ষায় তা সহায়ক হতে পারে।
তৃতীয় সুফল হলোÑকৃষি নিরাপত্তা। গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পসহ পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি নির্ভর করে নির্ভরযোগ্য পানির ওপর। পদ্মা বাঁধ যদি শুকনো মৌসুমে সেচের পানি সরবরাহ করতে পারে, তবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে, সেচ ব্যয় কমবে, ফসলের নিবিড়তা বাড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে।
চতুর্থ সুফল হলোÑনদী পুনরুজ্জীবন ও নৌ চলাচল। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু শাখা নদী পলি জমে ও পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে নাব্য হারিয়েছে। প্রকল্পের আওতায় গড়াই-মধুমতি নদীব্যবস্থার প্রায় ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার এবং হিসনাব্যবস্থার প্রায় ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার নিষ্কাশন চ্যানেল পুনঃখননের কথা বলা হয়েছে। এসব কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে স্থানীয় নৌপথ, মৎস্যসম্পদ ও নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হতে পারে।
পঞ্চম সুফলÑরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক। প্রকল্পটি একটি বার্তা দেয় যে, বাংলাদেশ অনন্তকাল ধরে উজানের একতরফা সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। এটি দেশের অভ্যন্তরে আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারে এবং গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনায় বাংলাদেশের দরকষাকষির অবস্থানকে কিছুটা শক্তিশালী করতে পারে।
পদ্মা বাঁধের অসুবিধা ও ঝুঁকি
প্রথম বড় দুর্বলতা হলো—ভাটির বাঁধ নিজে থেকে পানি সৃষ্টি করতে পারে না। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে উজান থেকে ভারত কতটুকু পানি ছাড়ে এর ওপর। যদি শুকনো মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না আসে, তবে পদ্মা বাঁধ বিপুল ব্যয়ের একটি কাঠামো হয়েই থেকে যেতে পারে, যার সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট পানি থাকবে না।
দ্বিতীয় ঝুঁকি হলো—পলি জমা। গঙ্গা-পদ্মা একটি অত্যন্ত পলিবাহী নদী। বাঁধ নদীর গতি পরিবর্তন করে এবং পলি জমার প্রবণতা বাড়াতে পারে। পদ্মা বাঁধের উজানে যদি অতিরিক্ত পলি জমে, তবে নদীর তলদেশ উঁচু হতে পারে, নিষ্কাশন ব্যবস্থা দুর্বল হতে পারে এবং বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রকল্পটি ফারাক্কার মতো কিছু সমস্যা—পলি জমা, ভাঙন, জলাবদ্ধতা ও নদীর গঠনগত অস্থিরতা—বাংলাদেশের ভেতরেই সৃষ্টি করতে পারে।
তৃতীয় ঝুঁকি হলো বন্যা ও নদীভাঙন। যদি বাঁধের উজানে নদীর তলদেশ উঁচু হয়, বর্ষাকালে পানি পার্শ্ববর্তী এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। গাইড বাঁধ কোনো নির্দিষ্ট এলাকা রক্ষা করলেও অন্য এলাকায় ভাঙন বাড়াতে পারে। বাংলাদেশের নদীগুলো স্থির খাল নয়; এগুলো জীবন্ত ও পরিবর্তনশীল বদ্বীপীয় নদী। তাই এ ধরনের নদীতে বড় কাঠামো নির্মাণে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন।
চতুর্থ ঝুঁকি পরিবেশগত। মাছের চলাচল, পলি পরিবহন, জলাভূমির নবায়ন এবং প্রাকৃতিক বন্যা-সমভূমির প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মাছ চলাচলের পথ ও নৌলক ক্ষতি কিছুটা কমাতে পারে, কিন্তু একটি প্রাকৃতিক মুক্ত নদীর পূর্ণ বিকল্প হতে পারে না। সুন্দরবনের জন্য মিঠাপানি প্রয়োজন, কিন্তু একই সঙ্গে প্রয়োজন পলি, জোয়ার-ভাটা ও নদীর স্বাভাবিক পরিবেশগত সম্পর্ক।
বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে যেন ভারত এই যুক্তি দেখাতে না পারে যে, পদ্মা বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজেই গঙ্গার সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে, তাই আর শক্তিশালী পানিবণ্টন চুক্তির প্রয়োজন নেই। পদ্মা বাঁধ কখনোই পানি কূটনীতির বিকল্প হতে পারে না; বরং এটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পরিপূরক হওয়া উচিত। বাংলাদেশের নতুন পানি সংরক্ষণ ক্ষমতাকে ভবিষ্যৎ শুকনো মৌসুমের পানিবণ্টন নির্ধারণের সময় ভারত বিবেচনায় নেওয়ার দাবি করতে পারে। বাংলাদেশকে দৃঢ়ভাবে এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করতে হবে—কারণ কোনো ভাটির সংরক্ষণ কাঠামো বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা কমানোর অজুহাত হতে পারে না। পদ্মা বাঁধের পদ্মা ব্যারাজের অজুহাতে শুকনো মৌসুমে ভারত যেন পানিপ্রবাহ কমাতে না পারে, সেজন্য শক্তিশালী পানি চুক্তির কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, কিন্তু সতর্কভাবে এগোতে হবে। প্রকল্পটি কোনোভাবেই ন্যায্য গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। ১৯৭৭ সালের ভারত-বাংলাদেশ চুক্তিতে ফারাক্কায় গঙ্গার পানি ভাগাভাগি এবং কিছু ক্ষেত্রে ন্যূনতম প্রবাহের ধারণা ছিল।
পূর্ণ বাস্তবায়নের আগে বাংলাদেশকে প্রকল্পটির স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যালোচনা করতে হবে। এতে হাইড্রোলজি, পলি ব্যবস্থাপনা, বন্যার ঝুঁকি, পরিবেশগত প্রভাব, মাছের চলাচল, দীর্ঘমেয়াদি খনন ব্যয় এবং নদীর গঠনগত পরিবর্তন বিবেচনায় নিতে হবে। এই পর্যালোচনায় বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নদী প্রকৌশলী, বদ্বীপ বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশবিজ্ঞানীদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। বাংলাদেশকে একটি স্থায়ী জাতীয় নদী-তথ্য কর্তৃপক্ষও গড়ে তুলতে হবে, যা গঙ্গা-পদ্মার পানিপ্রবাহ, পলি, লবণাক্ততা, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, মাছের চলাচল এবং নদীভাঙন সম্পর্কে রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহ করবে। তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে দুর্বল থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বাংলাদেশকে অবকাঠামো ও কূটনীতিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। সঠিক কৌশল হওয়া উচিত ‘চুক্তির বদলে বাঁধ’ নয়; বরং ‘বাঁধের সঙ্গে শক্তিশালী পানি চুক্তি, তথ্য-উপাত্ত, খনন, শাখা নদী পুনরুজ্জীবন এবং আঞ্চলিক কূটনীতি।’ কোনোভাবেই পদ্মা বাঁধকে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি দুর্বল করার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না।
লেখক : বীর প্রতীক, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক