হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

প্রেমময় পদ্য বনাম জাতীয় প্রতিরক্ষার গদ্য

মিনার রশীদ

পারস্যের বিখ্যাত কবি খাজা শামসউদ্দিন মুহাম্মদ হাফিজ শিরাজী! তিনি তার এক কবিতায় লেখেন, ‘যদি সেই শিরাজের তুর্কি রমণী আমার হৃদয় করে জয়, তবে আমি সমরখন্দ ও বোখারা দান করে দেব তার গালের কালো তিলের বিনিময়।’ এই কবিতাটি শুনে সমরখন্দ বোখারার আসল মালিক তৈমুর লং নিজের কপাল চাপড়ানো শুরু করলেন! মজনুন কবিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, সমরখন্দ ও বোখারা আমার! তুমি তা বিলিয়ে দেওয়ার কে হে, বাছাধন?

বাংলাদেশের প্রশাসনে নাকি এ রকম অনেক প্রেমিক পুরুষ সৃষ্টি হয়ে গেছে, যারা তাদের গার্লফ্রেন্ডের গালের কালো তিলের জন্য আমাদের সমরখন্দ ও বোখারা (রংপুর ও চট্টগ্রাম) চাহিবামাত্র বিলিয়ে দিতে বাধ্য! গদ্য জগতের দুর্মুখেরা বলেন, গার্লফ্রেন্ডের গালে এ রকম নকল বা আসল তিল দেখেই আমাদের হাফিজরা নাকি হানিট্র্যাপে আটকে গেছেন!

সেদিন সম্রাট তৈমুর লং ভাব জগতের এই কবিকে ছেড়ে দেননি। অথচ আমরা নিজেদের সমরখন্দ ও বোখারার (রংপুর ও চট্টগ্রাম) ওপর বাস্তব হুমকি দেখেও ‘নেভার-মাইন্ড’ মুডে রয়েছি!

তৃণমূল কংগ্রেস থেকে ২০২১ সালে বিজেপিতে যোগ দেন প্রাক্তন মন্ত্রী ও সাংসদ দিনেশ ত্রিবেদী, যিনি আমাদের দেশে রাষ্ট্রদূত হয়ে এসেছেন! অর্থাৎ শুভেন্দুর মতো তিনিও একই প্রজাতির রাজনীতিবিদ! কিন্তু শুভেন্দু বলেন গদ্যে, আর ত্রিবেদী একই কথা বলেন পদ্যে! শুভেন্দু এবং ত্রিবেদী উভয়েই একটি মহাকাব্যের অনুরাগী। সেই মহাকাব্যটির নামÑঅখণ্ড ভারত!

‘একই আকাশ একই বাতাস’ আওড়াতে আওড়াতে বাংলার জমিনে পা রাখেন এবং সর্বোচ্চ আশার বাণীটি শোনান, ‘ভারতের ১৪০ কোটি এবং বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে আমরা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্রগুলোর একটি এবং অন্যতম শক্তিধর শক্তিতে পরিণত হতে পারি।’

এ রকম দুই দেশ একসঙ্গে অন্যতম শক্তিধর শক্তিতে পরিণত হয়েছেÑএ রকম নমুনা আছে কি? পূর্ব জার্মানি এবং পশ্চিম জার্মানি এক হওয়ার পর স্বতন্ত্র দেশ হিসেবে ‘শক্তিধর শক্তিতে’ রূপান্তর হয় নেইÑবরং অখণ্ড জার্মান হিসেবে এক দেশ হয়ে গেছে!

কাজেই ত্রিবেদী এটি কীসের ইঙ্গিত দিলেন? কষ্ট লাগে, এরপরও যখন দেখি কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা এই ত্রিবেদীর পক্ষ নিয়ে কথা বলতে সাহস করছেন!

ত্রিবেদীর এই প্রেমনিবেদনের ভঙ্গি দেখে মনে পড়ে বছর-কয়েক আগের বহুল আলোচিত আরেক অসম প্রেমের উপাখ্যান!

ঘটনাটি ২০১৮ সালের! গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে হঠাৎ মুখ খুলেন আফরিদা খাতুন ঝিলিক (১৯) নামের এক নারী কর্মচারী!

আফরিদা খাতুন ঝিলিকের আর্তনাদের একটা ভিডিও সে সময় ভাইরাল হয়েছিল। তাতে এই ভুক্তভোগী মেয়েটি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. খোন্দকার নাসির উদ্দিন চাকরি দেওয়ার কথা বলে তাকে বিভিন্ন সময় যৌন নির্যাতন করেছিলেন। সেই সঙ্গে ভালোবাসার ছলনা করে দিনের পর দিন ভিসির বাংলোয় রেখে দৈহিক সম্পর্ক করেছিলেন ভিসি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নির্যাতিত ঝিলিক বলেন, ‘আজ আমি সবকিছ ফাঁস করে দেব। খুলে দেব মানুষ নামের নরপশুর মুখোশ। আমার সন্তানের বাবা তুমি। আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছো। আমার কাছে তোমার সব অপকর্মের প্রমাণ আছে। সবার সামনে তোমার মুখোশ খুলে দেব।’

ত্রিবেদীর মতোই দরদমাখা কণ্ঠে ভিসি নাসির ঝিলিককে বলেছিলেন, ‘তুমি এতিম, আমিও এতিম’, ‘তুমি আমার কষ্ট বুঝবে, আমিও তোমার কষ্ট বুঝব। কথার মধ্যে অন্তঃমিলটি দেখুনÑ‘তুমিও এতিম, আমিও এতিম’—মানে তুমি আর আমি ‘একই আকাশে, একই বাতাসে!’ এমন সব আবেগী ও প্রেমময় কথা দিয়ে ভিসি নাসির তার সবকিছু কেড়ে নেয় বলেও দাবি করেন ঝিলিক। প্রেমিক ত্রিবেদীর মতো একটা হিসাবও বোধহয় এই প্রেমিক নাসির তার শিকারকে দেখিয়েছিলেন! দুজনের মিলন হলে নাসিরের ১৪০ একক এবং ঝিলিকের ২০ একক মিলে ‘অন্যতম শক্তিধর শক্তি’ সৃষ্টি হয়ে যাবেÑএ রকম স্বপ্নও দেখানো হয় ঝিলিককে!

২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের ঘটনা এটি। এরপর আমরা এ ঘটনা সম্পর্কে আর কিছুই জানি না। নির্যাতিত এতিম মেয়েটি তার সেই কন্যাসন্তানটি নিয়ে কোথায় কেমন আছে আমরা তা জানি না। আমাদের নারীবাদী সংগঠনগুলো এই ঝিলিকের জন্য কিছুই করেনি। কারণ অপরাধী এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিÑকোনো মাদরাসার প্রিন্সিপাল নন!

ঝিলিকদের এসব কান্না এবং দেশটির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব একই জটিলতায় জড়িয়ে গেছে! প্রেমিক নাসির এবং প্রেমিক ত্রিবেদীদের মিষ্টি কথায় শিকাররা (ঝিলিক এবং বাংলাদেশ) সবকিছু ভুলে যায়!

স্বাধীনতার আবেগ দিয়েই আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে যুগের পর যুগ পঙ্গু করে রাখা হচ্ছে। ফলে ত্রিবেদীর পদ্য আর শুভেন্দুর গদ্য যে একই সরোবর থেকে পয়দা হচ্ছেÑতা আমরা মালুম করতে পারছি না!

আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—আবেগ নয়, বরং প্রজ্ঞা ও বাস্তবতাবোধ দিয়েই ভূরাজনীতির জটিল খেলাকে বুঝতে হয়। যারা শুধু আবেগের বা ঝিলিকের মতো অলীক স্বপ্নের বশবর্তী হয়ে ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করেন, তারা প্রায়ই বৃহৎ শক্তিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নকে মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আবেগকে কাজে লাগিয়েছিল। আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী মুজাহিদিনদের বিভিন্নভাবে সমর্থন দেওয়া হয়েছিল। পরে এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এমন কিছু শক্তির উত্থান ঘটে, যাদের মধ্য থেকে আলকায়েদার মতো সংগঠনের জন্ম হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। যে শক্তিগুলো একসময় পশ্চিমা কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, তারাই পরবর্তীকালে পশ্চিমাদের জন্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর বিশ্ববাসী নতুন করে আলকায়েদা ও ওসামা বিন লাদেনের নাম জানতে পারে। এরপর ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’-এর নামে আফগানিস্তান, ইরাকসহ কয়েকটি মুসলিম দেশকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করা হয়। সেখানকার জনগণকেও গণতন্ত্র ও উন্নত জীবনের লোভ দেখানো হয়েছিল!

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলেও দেখা যায়, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের ইস্যুটিকে শুধু এদেশের গণতন্ত্রের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা হয়নি, দেশের সার্বভৌমত্বকেও এর মাধ্যমে জব্দ করা হয়েছে! দেশের কোন থানার ওসি কে হবেনÑসেই নির্দেশনাটিও আসত পাশের দেশটি থেকে!

জেএমবি ও বাংলাভাইয়ের উত্থান থেকে পিলখানার নারকীয় হত্যাকাণ্ড একই সূত্রে গাঁথা! সেই সূত্রটিও জাতির সামনে পরিষ্কার হয়েছে! খালেদা জিয়া যেদিন তার পুবে তাকাও বাস্তবায়নে চায়নায় পা রাখলেন, তখনই জেএমবি সারা দেশে চৌষট্টি জায়গায় পটকা ফুটাল। পটকার মতো সেই বোমাগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী না হলেও মিডিয়ার প্রচারে তা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল! সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলোÑএই পটকা ফোটানোর দোষ গিয়ে পড়ল খোদ চারদলীয় জোট সরকারের ওপর! যে চারদলীয় জোট সরকার চাইলেই সংসদীয় পদ্ধতিতে শরিয়াহ কায়েম করতে পারত, তারা কেন বোমা ফাটিয়ে শরিয়াহ আইন কায়েম করতে চাইল! ইসলামোফোবিক এদেশের সুশীল সমাজ এ প্রশ্নটি নিজের মনের মধ্যে না টেনে টিয়া পাখির মতো একই বুলি আওড়াতে লাগল!

ব্রিটিশ হাইকমিশনকে সিলেটের শাহজালাল মাজারে একই উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা হলো। কোরআনের কিছু আয়াতের আউট অব কনটেক্সট ব্যাখ্যা করে অনেক বিচারকের ওপর আক্রমণ করা হলো! বলা হলো, ‘যারা আল্লাহর আইন অনুযায়ী বিচার করে না, তারা কাফের। আর এই কাফেরদের হত্যা করা ওয়াজিব।’ প্রকৃত আলেম সমাজের কাছে সত্যি ভয়ংকর ঠেকল এদের এসব ব্যাখ্যা! এ সময় দেশের সিনেমা হলগুলোয়ও হামলা করা হলো! আর যিনি এই জিহাদের ‘আমিরুল মোমেনিন’ বলে নিজেকে ঘোষণা করেছিলেন, সেই শায়েখ আব্দুর রহমান হলেন যুবলীগ নেতা মির্জা আজমের আপন দুলাভাই! সেই জেএমবি নামক ফিতনাকে সমূলে উৎপাটন করেছিলেন যে কর্নেল গুলজার, তাকে পিলখানায় অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কর্নেল গুলজারকে হত্যার আগে তার নিজ হাতে নিজের কবর খনন করানো হয়। এখানে উল্লেখ্য, মির্জা আজম তার বোন জামাইয়ের ফাঁসির বদলা এভাবেই নিয়েছিলেন।

অত্যন্ত বিস্ময়ের কথা হলো, দেশপ্রেমিক এই অফিসারগুলোকে বেছে বেছে কিছুদিন আগে বিডিআরে পোস্টিং দেওয়া হয়! কাজেই বুঝতে আর বাকি থাকে না রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি এখানে কীভাবে জড়িত ছিলেন। আর সেই শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার জন্য সফট পাওয়ার হিসেবে কাজ করছেÑকিছু ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ নামের কুলাঙ্গার! হঠাৎ করে টোকাই শ্রেণির কয়েকজনের নামের আগেও ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ লেখা শুরু হয়েছে!

প্রাইম মিনিস্টার তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফর মালয়েশিয়া ও চায়না বেছে নেওয়ায় একই গ্রুপের গাত্রদাহ শুরু হয়! ‘র’-এর এদেশীয় এন্টিনা চৈতালী ও সন্তোষ শর্মারা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে! এরা হিন্দুদের জন্য আলাদা প্রদেশ স্থাপনের আব্দার তুলেছে!

পূজা পরিষদের ব্যানারে অলীক অভিযোগ আবার মাঠে নেমেছে সেই বিতর্কিত সন্তোষ শর্মা! এর মোকাবিলায় আবার এক গ্রুপ কালেমাখচিত পতাকা দিয়ে সারা দেশ ভরিয়ে ফেলে! কালেমাখচিত পতাকায় কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু চৈতালী চক্রবর্তীদের যারা আলাদা প্রদেশ গড়ার কথা বলার জন্য উসকানি দিচ্ছে, সেই একই গ্রুপ চাচ্ছে এর প্রতিক্রিয়ায় একটি গ্রুপ এভাবেই রাস্তায় নামুক। তাতে তারা বিশ্ববাসীকে সেটি দেখিয়ে তাদের প্রতি সহানুভূতি আদায় করতে সক্ষম হবে। কাজেই আমাদের সবার চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। জিও-পলিটিক্যাল পরিবর্তনের ওপর চোখ রাখতে হবে। কালেমাকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। কখনো কখনো সেই কালেমা পতাকায় ধারণ করা ‘পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট’ কাজ হতে পারে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা প্রয়োজন—কালেমা মুসলমানের ঈমানের অংশ, হৃদয়ের গভীরে ধারণ করার বিষয়। অনেক সময় একটি কাজ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় তা প্রতিপক্ষের হাতে প্রচারের সুযোগ করে দিতে পারে।

তাই আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ঠান্ডা মাথার বিশ্লেষণ, দূরদর্শিতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং ঘটনাগুলোর পেছনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

কম খেয়ে হলেও কেন অস্ত্র বানাতে হবে

তরুণ সংসদ সদস্য এবং এনসিপির যুগ্ম সম্পাদক ড. আতিক মুজাহিদের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জাতীয় সংসদে প্রদত্ত তার বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং সমসাময়িক বিভিন্ন দেশের সামরিক ব্যয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনামূলক অবস্থান তুলে ধরেন। তার মূল বক্তব্য ছিল—একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্জনও অপরিহার্য।

এই প্রসঙ্গে অনেকেরই মনে পড়ে যায় পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর বিখ্যাত সেই উক্তি! ১৯৬০-এর দশকে ভারতের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে তিনি বলেছিলেন : ‘We will eat grass, even go hungry, but we will get one of our own (atomic bomb).’¬Ñঅর্থাৎ, ‘প্রয়োজনে আমরা ঘাস খেয়ে থাকব, ক্ষুধার্ত থাকব, তবু নিজেদের পারমাণবিক বোমা তৈরি করব।’

ভুট্টোর এই বক্তব্যের পেছনে ছিল একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা (deterrence) গড়ে তোলার দর্শন। তার বিশ্বাস ছিল, সামরিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে পাকিস্তান সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অবশ্য বাস্তবতা ভিন্ন। বাংলাদেশ কোনো পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি অনুসরণ করছে না এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি ও নীতির প্রতিও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান বা চায়নার মতো পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে আণবিক আম্ব্রেলার অ্যারেঞ্জমেন্ট আমাদের করতে হবে!

তবে ড. আতিক মুজাহিদের বক্তব্য যে প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসেন তা হলো—দ্রুত পরিবর্তিত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিবেশে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার কাঙ্ক্ষিত স্তর কী হওয়া উচিত?

জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটি বিষয় বিবেচ্যÑ

  • বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে।
  • আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সামরিক আধুনিকায়ন দ্রুতগতিতে চলছে।
  • সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও নৌ সক্ষমতা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠছে।
  • প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শুধু যুদ্ধের জন্য নয়; দুর্যোগ মোকাবিলা, সমুদ্রসম্পদ রক্ষা এবং কৌশলগত স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যও প্রয়োজন।

ড. আতিক মুজাহিদ ভুট্টার মতো আমাদের ঘাস খেয়ে অস্ত্র কেনার কথা বলেননিÑএকটু কম খেয়ে হলেও প্রয়োজনীয় অস্ত্র কেনার কথা বলেছেন! কারণ প্রতিপক্ষ বা শত্রুপক্ষ যখন টের পাবে যে আপনি দুর্বল নন, তখনই আপনাকে আক্রমণের প্রলোভন থেকে বিরত থাকবে!

স্বর্ণালি সন্ধ্যায় কিংবা অলস দুপুরে ত্রিবেদীদের সঙ্গে আপনি যখন পদ্যময় ভাববিনিময় করছেনÑতখনো বিএসএফ আমাদের কারো না কারো বুকে গুলি ছুড়ছে। কিংবা মুসলিম নামধারী কিছু বনি আদমকে পুশইনের চেষ্টা করছে। রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে শত্রুর গুলি থেকে আত্মরক্ষা করা যাবে না। ওহে ঘুমন্ত কিংবা চেতনায়িত দেশবাসী! আপনার হাতেও দরকার পাল্টা আক্রমণের একটা অস্ত্র!

লেখক : কলামিস্ট

ফারাক্কা থেকে ফেনী : নদী আগ্রাসন ও সমাধান

আখতার-উল-আলম : জাতীয় চেতনার অগ্রসেনানী

পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির উত্তরাধিকার

ভারতীয় আধিপত্যবাদী নীতি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে প্রধান বাধা

সান ফ্রান্সিসকোর চালকবিহীন গাড়ি

রাজনৈতিক সাংবাদিকতার নামে যা হচ্ছে

ইসরাইলকে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ উপহার দিয়েছে ইরান

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নতুন বর্বরতা ও করণীয়

আত্মমর্যাদার পররাষ্ট্রনীতিতে ফিরছে বাংলাদেশ

রোহিঙ্গা ও বিপন্ন উখিয়া-টেকনাফের কথা