হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

আধিপত্যবাদ রুখে দেওয়ার জন্য দক্ষিণ এশিয়া যাকে মনে রাখে

শহীদ জিয়াউর রহমান ও সার্বভৌমত্বের আদর্শ

ড. সিরাজুল আই ভুইয়া

২০২৬ সালের ৩০ মে শহীদ জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী পালনের সময় জাতি কেবল একজন নেতাকেই স্মরণ করছে না, বরং তাঁর আদর্শের চিরন্তন তাৎপর্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করছে।

ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কোনো নেতাকে সেই পথে বিচার করে না, যা তাঁকে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছিল, বরং বিচার করে সেই সীমারেখা দিয়ে, যা তিনি অতিক্রম না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী উত্তাল সময়ে জিয়াউর রহমান শেষ পর্যন্ত কেবল রাজনীতিতে আসা একজন সৈনিক হিসেবে নন, বরং একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, যিনি সার্বভৌমত্বকে এমন একটি জাতীয় দর্শনে রূপ দিয়েছিলেন, যা নির্ভরশীলতা, আদর্শিক বিচ্যুতি এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের হুমকিতে থাকা এক অনিশ্চিত গন্তব্যের তরুণ জাতিকে পথ দেখিয়েছিল।

বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে, এবং এই স্বাধীনতা কখনও নিছক আনুষ্ঠানিকতার জন্য ছিল না। তারপরও ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সেই কষ্টার্জিত স্বাধীনতা এক বিপজ্জনক ভঙ্গুরতার মুখে পড়েছিল, যা ছিল রাজনৈতিকভাবে কেন্দ্রীভূত, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত, কূটনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের অবস্থান নিয়ে মানসিকভাবে অনিশ্চিত।

জিয়ার ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিহিত রয়েছে একটি অপ্রিয় সত্যকে আপসহীনভাবে স্বীকার করে নেওয়ার মধ্যে: স্বাধীনতা একবার অর্জিত হলেই তা চিরস্থায়ী হয় না, বরং একে সক্রিয়ভাবে রক্ষা না করলে তার ক্ষয় হতে থাকে—বিশেষ করে যখন একটি ছোট রাষ্ট্র অপেক্ষাকৃত বড় এবং অধিকতর প্রভাবশালী আঞ্চলিক শক্তির পাশে সহাবস্থান করে। তাঁর প্রতিক্রিয়া কেবল বাগাড়ম্বরপূর্ণ আস্ফালন ছিল না, বরং তা ছিল স্বাধীনতাকে একটি অর্থবহ রূপ দেওয়ার সুশৃঙ্খল অঙ্গীকার; যা নীতি, প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় চেতনার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

ঠিক এ কারণেই জিয়ার উত্তরাধিকার আজও বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত হয়, যাদের অনেকেই আঞ্চলিক অসামঞ্জস্যতার বাস্তবতায় বহিঃশক্তির আধিপত্যের ঝুঁকি সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন। তিনি এমন একজন নেতা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন, যিনি কখনও নীরবে, কখনও দৃঢ়তার সঙ্গে বাংলাদেশকে অন্য কোনো শক্তির কৌশলগত কক্ষপথে নিয়ন্ত্রিত, পরিচালিত বা বিলীন হতে দিতে অস্বীকার করেছিলেন। এটি করার মাধ্যমে তিনি কেবল শাসনই করেননি; বরং তিনি জাতীয় মর্যাদার সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।

সার্বভৌমত্ব একটি নীতি, কোনো লোকদেখানো ভঙ্গি নয়

জিয়ার সার্বভৌমত্বের ধারণা নাটকীয় বা হঠকারী ছিল না। তিনি নিরন্তর সংঘাতের নীতি বা অবাধ্যতার ফাঁকা হুমকি প্রদর্শনের পথে হাঁটেননি। বরং তিনি কাঠামোগত স্বাধীনতার একটি নীতি বজায় রেখেছিলেন, যা ছিল বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, জাতীয় পরিচয় বা পররাষ্ট্রনীতির ওপর কোনো একক বিদেশি শক্তির মাত্রাতিরিক্ত প্রভাব যেন না থাকে, তা নিশ্চিত করার এক কঠিন সংগ্রাম।

এই কৌশলের পেছনের মূল চালিকাশক্তি ছিল এই বিশ্বাস—যে রাষ্ট্র তার বৈধতা, নিরাপত্তা বা টিকে থাকার জন্য অন্য কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল, সে রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে স্বাধীন রাষ্ট্র নয়। জেনারেল জিয়া ঠিক এই পরিস্থিতিরই পরিবর্তন ঘটাতে চেয়েছিলেন। জেনারেল জিয়ার সংজ্ঞায় সার্বভৌমত্ব কোনো আবেগ ছিল না, যা কেবল বিশেষ দিবসগুলোতে প্রকাশ করতে হয়; বরং এটি ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডের একটি সুশৃঙ্খল অনুশীলন।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ: ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা থেকে আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধার

জিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং আলোচিত উত্তরাধিকার ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বিকাশ। এটি নিছক কোনো আদর্শিক অনুশীলন কিংবা সংস্কৃতির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন ছিল না। বরং এটি ছিল একটি বাস্তব হুমকির জবাব। যে হুমকি ছিল—বাংলাদেশের আত্মপরিচয় কেবল সাংস্কৃতিক বা ভাষাগতভাবে নয়, বরং রাজনৈতিকভাবেও এক বৃহৎ প্রতিবেশীর মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার আশঙ্কা।

আঞ্চলিক নাগরিকত্ব, অভিন্ন ইতিহাস এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুত্বারোপের মাধ্যমে জিয়ার ‘বাংলাদেশি’ ভিশন এটিই প্রতিষ্ঠিত করেছিল যে, বাংলাদেশ ভারতের পূর্বাঞ্চলের কোনো সাংস্কৃতিক উপজাত নয়, কিংবা অন্য কোনো বৃহত্তর সভ্যতার ঐতিহ্যের অংশবিশেষ মাত্র নয়। বাংলাদেশের এই পুনর্কল্পনা ছিল জাতির মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির পথ, এটি ছিল অন্য পক্ষের স্বীকৃতির তোয়াক্কা না করেই নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার অধিকার।

সমালোচকদের কাছে এই মতবাদটি ছিল বিতর্কিত, কিন্তু সমর্থকদের কাছে এটি ছিল অপরিহার্য। তবে যে পক্ষই হোক না কেন, এর একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল। আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে আত্মপরিচয়ই হয়ে উঠেছিল প্রথম প্রতিরক্ষা প্রাচীর। এটি সার্বভৌমত্বকে জাতির সম্মিলিত চেতনা এবং এর ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে প্রোথিত করেছিল।

পররাষ্ট্রনীতির পুনর্গঠন: একক অক্ষের ওপর নির্ভরশীলতার ফাঁদ থেকে মুক্তি

জিয়া সম্ভবত তাঁর আধিপত্যবাদ-বিরোধী কৌশল সবচেয়ে প্রকাশ্যভাবে প্রয়োগ করেছিলেন পররাষ্ট্রনীতির আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে। স্বাধীনতার প্রথম দশকগুলোতে বাংলাদেশকে যে সংকীর্ণ ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বলয়ের মধ্যে রাখা হয়েছিল, যা দেশটিকে অরক্ষিত করে তুলেছিল, তিনি সেখান থেকে বের করে আনেন। কোনো একটি নির্দিষ্ট দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক যেন অন্য সব সম্পর্ককে ছাপিয়ে যেতে না পারে, তিনি তা নিশ্চিত করেছিলেন।

জিয়ার শাসনামলেই মুসলিম বিশ্ব, জোটনিরপেক্ষ দেশ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায়; সেই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরের বহুমুখী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতেও অংশগ্রহণ বাড়ে। এটি কোনো আদর্শিক বিলাসিতা ছিল না। বরং এটি ছিল একটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশল; সব সময় বিকল্প পথ খোলা রাখার একটি দূরদর্শী পরিকল্পনা।

জিয়া বুঝতে পেরেছিলেন, কোনো রাষ্ট্র যদি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সামরিক দিক থেকে তার প্রতিবেশীকে অপরিহার্য করে তোলে, তবে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি লঙ্ঘন না হলেও দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই কারণেই তাঁর পররাষ্ট্রনীতি এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে সর্বাধিক বিকল্প তৈরি করা যায়, যেন আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে বাংলাদেশ দুর্বল নয়, বরং শক্তিশালী কণ্ঠে নিজের কথা বলতে পারে। এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় যে, সেই সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা ও গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছিল।

নদী, কোনো বাগাড়ম্বর নয়: পানি কূটনীতির মাধ্যমে কাঠামোগত আধিপত্যের মোকাবিলা

আঞ্চলিক অসমতা সম্ভবত পানি সম্পদের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব উজানের দেশগুলোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত জলপ্রবাহের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিয়াউর রহমান তাঁর মেয়াদের শুরুতেই অনুধাবন করেছিলেন, পানি কেবল একটি পরিবেশগত উদ্বেগের বিষয় নয়; এটি সার্বভৌমত্বের বিষয়।

এর ফলে তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশ গঙ্গা নদী এবং ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে ভারতের সঙ্গে এমন এক মনোভাব নিয়ে আলোচনা শুরু করে যে একটি জাতির জীবনরেখাকে কখনও নিছক কোনো কারিগরি বিষয় কিংবা নিছক শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে অবহেলা করা যায় না এবং করা উচিতও নয়। যদিও এসব আলোচনায় কিছুটা অপূর্ণতা ছিল, তবুও এই অবস্থানটি নিজেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। জিয়া পানি নীতিকে জাতীয় নিরাপত্তার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার দোহাই দিয়ে জাতীয় দুর্বলতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে রাজি হননি।

বর্তমানে যারা একই রকম পানি সংকটের মোকাবিলা করছেন, সেই অধিকাংশ বাংলাদেশির কাছে এই অবস্থানটি আজও পররাষ্ট্রনীতিতে নীতি ও বাস্তববাদের এক অনন্য প্রতীক হয়ে আছে। তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি কঠোর ছিলেন কিন্তু নাটকীয় ছিলেন না; যিনি অন্যের সামনে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন কিন্তু বিশ্ব থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি এবং যিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, সার্বভৌমত্বকে কেবল বক্তৃতায় নয়, বরং দৈনন্দিন সম্পদের মৌলিক অধিকারের মধ্যেও প্রতিষ্ঠিত করতে হয়।

সার্ক: আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসনে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বহুপাক্ষিকতা

জিয়াউর রহমানের আধিপত্যবাদ-বিরোধী উদ্যোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দূরদর্শী ছিল কোনো সংঘাত নয়, বরং একটি ধারণাগত উদ্ভাবন, যা পরে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। জিয়া ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, তীব্র অসামঞ্জস্যপূর্ণ এই অঞ্চলে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা চুক্তিগুলো প্রায়ই শক্তিশালী রাষ্ট্রের অনুকূলে চলে যায়, যা ছোট রাষ্ট্রগুলোকে কাঠামোগতভাবে সুবিধাবঞ্চিত এবং রাজনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ করে ফেলে।

তাঁর সমাধান ছিল দ্বিপাক্ষিকতাকে ছাপিয়ে যাওয়া। আঞ্চলিক সম্পৃক্ততাকে একটি বহুপাক্ষিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে জিয়া চেয়েছিলেন সমষ্টিগত নিয়ম, অভিন্ন কর্মসূচি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এই অসামঞ্জস্যতা কমিয়ে আনতে। সার্ক-কে এমন একটি ফোরাম হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল, যেখানে সহযোগিতা গড়ে উঠবে ঐকমত্যের ভিত্তিতে, জবরদস্তির মাধ্যমে নয়—এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলো একতরফা আধিপত্যের ভয় ছাড়াই কথা বলতে পারবে।

সার্ক গঠনে ভারতের প্রাথমিক দ্বিধা এর সৃষ্টির পেছনের যৌক্তিকতাকেই আরও দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেছিল। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে শঙ্কিত অনেক বাংলাদেশির কাছে সার্ক হলো জিয়ার অন্যতম কৌশলগত উত্তরাধিকার। এটি এই ধারণার এক চিরন্তন সাক্ষী যে, ভারসাম্যহীনতার মুখে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণ নিজেই প্রতিরোধের একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী রূপ হতে পারে।

২০২৪ সাল থেকে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই ভিশনটিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি অভিন্ন উন্নয়ন লক্ষ্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একটি সহযোগী দক্ষিণ এশিয়ার পক্ষে কথা বলেছেন। তবে একটি আঞ্চলিক শক্তির অব্যাহত আধিপত্য এই ভিশন বাস্তবায়নকে কঠিন করে তোলে। এই পটভূমিতে, ভারতের অসম প্রভাব সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন ক্রমবর্ধমান সংখ্যক বাংলাদেশি এখন তারেক রহমান, বিএনপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকিয়ে আছেন, যাতে জিয়ার সেই বহুপাক্ষিক উত্তরাধিকার পুনরুজ্জীবিত ও এগিয়ে নেওয়া যায়। তাঁদের কাছে সার্ক পুনরুদ্ধার কেবল একটি কূটনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়; বরং সংহতির মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি কৌশলগত অপরিহার্যতা।

সীমান্ত, করিডোর ও মর্যাদা: অস্পষ্টতাকে স্বাভাবিকীকরণ রুখে দেওয়া

করিডোর, ছিটমহল এবং সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত আঞ্চলিক সমস্যাগুলো অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রায়শ চাপের একটি নীরব হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে। এসব বিষয়ে জিয়া যে দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিলেন তা ছিল একটি একক ও অবিচল নীতি—‘অস্পষ্টতা যেন স্থায়িত্ব না পায়।’ তিনি এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন যে আঞ্চলিক সম্প্রীতির জন্য অমীমাংসিত দুর্বলতাগুলোকেই মূল্য হিসেবে দিতে হবে।

সীমান্ত করিডোর হোক বা সমুদ্রসীমা/দ্বীপ নিয়ে বিরোধ—তাঁর কূটনৈতিক পদ্ধতি সব সময় সাম্য, পারস্পরিক বিনিময় এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তিনি সীমানার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা চেয়েছিলেন উস্কানির জন্য নয়, বরং স্থিতিশীলতার জন্য। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, যে দেশের সীমানার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই, সেই দেশকে সহজেই প্রভাবিত বা চাপে ফেলা সম্ভব।

আধিপত্য-বিরোধী কৌশল হিসেবে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা

জিয়াউর রহমান এমন একটি সত্য জানতেন, যা অনেক নীতিনির্ধারক হয় জানতেন না, অথবা ভুলে থাকতে পছন্দ করতেন; তা হলো—‘নির্ভরশীলতার শুরু হয় ঘর থেকে।’ যে জাতি তার নিজের জনগণের অন্নসংস্থান, কর্মসংস্থান বা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবিকা নির্বাহের ক্ষমতা রাখে না, সেই জাতি স্বাধীন হওয়ার যত দাবিই করুক না কেন, তার নিজস্ব দুর্বলতা থেকেই যাবে।

ঠিক এ কারণেই, জিয়া যখন গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদনশীলতা, ব্যাপক ভিত্তিক খাল খনন এবং উৎপাদনমুখী রাজনীতির কথা বলতেন, তখন তা কখনও নিছক কোনো উন্নয়ন কৌশল ছিল না। এটি ছিল কৌশলগত। জিয়া অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিদেশি চাপ ও বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। যারা বিদেশি প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, তাদের কাছে এই নীতিগুলো ছিল সার্বভৌমত্বকে নিছক আদর্শিক রূপ থেকে বাস্তবে রূপান্তরের বহিঃপ্রকাশ।

কেন তাঁর স্মৃতি আজও প্রতিরোধের প্রেরণা জোগায়

১৯৮১ সালে জিয়ার হত্যাকাণ্ডের ফলে এই সার্বভৌমত্বের প্রকল্পটি মাঝপথে থমকে যায়। পরবর্তী দশকগুলো ছিল নীতিগত ডিগবাজি, বিভিন্ন ধরনের নির্ভরশীলতার পুনরাগমন এবং জাতীয় স্বাধীনতা হারানোর বিষয়ে ক্রমবর্ধমান জনউদ্বেগের সময়—বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। এভাবে, জিয়ার স্মৃতি কেবল নস্টালজিয়ায় বিলীন হয়ে যায়নি, বরং একটি মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে।

অনেক বাংলাদেশির কাছে তিনি এমন এক যুগের প্রতীক, যখন রাষ্ট্রের একটি বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিল; যখন জাতীয় সার্বভৌমত্ব কোনো দ্বিধা ছাড়াই প্রকাশ করা হতো; যখন স্বাধীনতা ছিল নিছক কোনো আনুষ্ঠানিক আচরণের চেয়েও বেশি কিছু। রাজনৈতিক সমালোচনার একটি রূপ হিসেবে এই স্মৃতির শক্তি ঠিক এখানেই।

বর্তমান প্রতিধ্বনি: একটি অপূর্ণ আদর্শ হিসেবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’

আজকের দিনে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ স্লোগানের যে প্রয়োগ দেখা যায়, তা অনুধাবনের জন্য একে জিয়াউর রহমানের সার্বভৌমত্ব দর্শনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করা প্রয়োজন। এর সমর্থকদের কাছে এই শব্দগুচ্ছ কেবল নির্বাচনি বাগাড়ম্বর নয়; বরং এটি একটি অসম্পূর্ণ জাতীয় ভিশনের মর্মস্পর্শী স্মারক, যা আঞ্চলিক আধিপত্যের মুখে বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠায় জিয়ার প্রচেষ্টারই এক নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা।

বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে, বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে—সঠিক বা ভুল যেভাবেই দেখা হোক না কেন—এই আদর্শিক উত্তরাধিকারের রক্ষক হিসেবে ব্যাপকভাবে গণ্য করা হয়। তবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’-এর আবেদন কেবল ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এর ধারাবাহিকতার ওপর নির্ভরশীল। এটি অনেক বাংলাদেশির মধ্যে বিদ্যমান সেই চিরস্থায়ী আকাঙ্ক্ষাকেই প্রতিফলিত করে, যেখানে তাঁরা দেখতে চান যে তাঁদের দেশ নিজেদের কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে; কোনো প্রকার দ্বিধা বা নতজানু মনোভাব ছাড়াই নিজেদের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করছে; এবং এমন এক নেতৃত্বের অধীনে তা করছে, যারা বহিঃশক্তির চাপ বিশেষ করে শক্তিশালী প্রতিবেশীদের চাপকে চ্যালেঞ্জ করতে ভয় পান না।

ইতিহাস যেভাবে শহীদ জিয়াউর রহমানকে মনে রাখবে

শহীদ জিয়াউর রহমান ইতিহাসে কেবল একজন আদর্শ নেতা হিসেবেই নয়, বরং একজন অপরিহার্য নেতা হিসেবে অমর হয়ে থাকবেন। তিনি এমন এক সময়ে এগিয়ে এসেছিলেন, যখন বাংলাদেশ এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল, অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর, কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন এবং এক নিঃশব্দ নির্ভরশীলতার জালে জড়িয়ে পড়ার বাস্তব ঝুঁকিতে নিমজ্জিত ছিল। সেই অনিশ্চয়তার মুহূর্তেই দেশ জিয়ার মধ্যে এমন একজন নেতাকে খুঁজে পেয়েছিল, যাঁর ছিল দৃঢ় সংকল্প, দূরদর্শী চিন্তা এবং পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস।

জিয়া ছিলেন যুদ্ধজয়ী এক সৈনিক থেকে রূপান্তরিত রাষ্ট্রনায়ক, যাঁর অন্তরে ছিল যুদ্ধের ক্ষত আর কাঁধে ছিল একটি বিধ্বস্ত জাতিকে পুনর্গঠনের বিশাল দায়িত্ব। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাকারী প্রথম অফিসারদের একজন হিসেবে তিনি তাঁর প্রেসিডেন্সিকেও সাজিয়েছিলেন সেই একই আপসহীন চেতনা এবং নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে জনগণের অধিকারের প্রতি অটল বিশ্বাস দিয়ে। এবং মাত্র পাঁচ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে তিনি তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছিলেন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, অর্থনীতিকে স্বনির্ভরতার দিকে চালিত করেন, ‘গ্রাম সরকার’ উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদের ক্ষমতায়ন করেন, কৃষিকে বদলে দিতে বিশাল সেচ প্রকল্প চালু করেন এবং একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলেন, যা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে একটি বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর দিয়েছিল।

জিয়া লোকদেখানো অর্থে জনতোষণকারী নেতা ছিলেন না, কিন্তু তাঁর নেতৃত্ব মানুষের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করেছিল। তিনি এমন এক প্রজন্মের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছিলেন, যারা যুদ্ধ ও বিশৃঙ্খলা দেখেছিল; তিনি তাদের কেবল প্রতিশ্রুতি দেননি, দিয়েছিলেন একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য। তাঁর বক্তৃতাগুলো উচ্চবাচ্যপূর্ণ বা নাটকীয় ছিল না; সেগুলো ছিল স্থির, সুশৃঙ্খল ও সংকল্পবদ্ধ। তাঁর কাজই তাঁর হয়ে কথা বলত, যার মূলে ছিল তিনটি পরিষ্কার নীতি—শৃঙ্খলা, বিকেন্দ্রীকরণ ও উন্নয়ন। জিয়ার কাছে জাতীয়তাবাদ কখনও অন্যকে বর্জন করার বিষয় ছিল না; এটি ছিল মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এবং একটি ছোট রাষ্ট্রকে দৈত্যাকৃতির দেশগুলোর আধিপত্যপূর্ণ অঞ্চলে নিছক দর্শক হিসেবে থাকতে অস্বীকার করার নাম।

যারা আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অতি-প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে চান, তাদের কাছে জিয়া আজও নীতিগত ও কৌশলগত নেতৃত্বের এক শক্তিশালী প্রতীক। তিনি বিশ্বকে দেখিয়েছিলেন, একটি ছোট রাষ্ট্রের মর্যাদা ক্ষমতার কাছে মাথানত করার মধ্যে নয়, বরং তার উদ্দেশ্যের স্পষ্টতা এবং সংকল্পের দৃঢ়তার মধ্যে নিহিত। তাঁর উত্তরাধিকার আমাদের এই চিরন্তন সত্যটি শেখায়—স্বাধীনতা ইতিহাসের কোনো একটি মুহূর্ত নয়; এটি সংকল্পের এক নিরন্তর অনুশীলন। এটি কেবল আবেগ বা আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে টিকে থাকে না, বরং টিকে থাকে সতর্কতা, সাহস এবং জাতীয় ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে।

ঠিক এই কারণেই, ১৯৮১ সালে তাঁর হত্যাকাণ্ডের কয়েক দশক পরেও জিয়াউর রহমানের প্রাসঙ্গিকতা কেবল বৃদ্ধিই পাচ্ছে। তাঁর উত্তরাধিকার কেবল স্মৃতিস্তম্ভ বা রাজনৈতিক স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি মানদণ্ড হিসেবে বেঁচে আছে, যা দিয়ে নেতৃত্বকে পরিমাপ করা হয়। একটি সার্বভৌম, আত্মমর্যাদাশীল এবং স্বনির্ভর দেশের স্বপ্ন দেখা কোটি কোটি বাংলাদেশির হৃদয়ে জিয়া কেবল একটি স্মৃতি নন, বরং একটি আন্দোলন।

শহীদ জিয়ার আদর্শ: ইসলামী দৃষ্টিকোণ

জিয়াউর রহমান: সৈনিক থেকে রাষ্ট্রনায়ক

ঈদুল আজহার অর্থনীতি

প্রতিশ্রুতি ভাঙার রাজনীতি

কেন উত্থান হচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টির

বরকতময় আরাফার দিন

সংকটে টেকনাফের সীমান্ত সুরক্ষা

ভারতের গোয়েন্দা উচ্চাকাঙ্ক্ষায় বিপর্যয়

শুধু দোষারোপ নয়, জানতে হবে করণীয়

জুলাইয়ের ব্যর্থতা মানে বাংলাদেশের ব্যর্থতা