যুদ্ধবাজ আমেরিকা-১
ইরান যুদ্ধ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি, পর্যালোচনা, মতামত ও ভবিষ্যদ্বাণীনির্ভর নানা সমীক্ষা হচ্ছে এবং আলোচনা হয়েছে। আর এখনো চলছে। তবে আমার এই লেখায় এর কোনোটিই করার ইচ্ছা নেই। কারণ বিশ্বজুড়ে অথবা বিশ্বব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে এ রকমটা নতুন কোনো ঘটনাও নয়, নতুন কোনো আচরণও নয় পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শোচনীয় পরাজয়ের পর এ রকমটাই দেখা গেছে। একই ঘটনা ঘটেছে আফগানিস্তানের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৯৮০-এর দশকের যুদ্ধের পর, যাতে পাকিস্তান স্বভাবজাত কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নিয়ে খেসারত দিয়েছে প্রচুর। একই ভূখণ্ডে অর্থাৎ আফগানিস্তানে ২০০১ থেকে ২০২২ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানদের যুদ্ধ এবং যুদ্ধ শেষ না করেই, যুক্তরাষ্ট্রের পলায়ন ইরাক যুদ্ধ এবং সাদ্দাম হোসেনকে ‘উইপন্স অব মাস ডেসট্রাকশন’ বা ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্রের জনক’ বলে মিথ্যা অজুহাতে হত্যা, দক্ষিণ আফ্রিকার লায়ন অব দ্য ডেসার্ড (মরুভূমির সিংহ) আফ্রিকান সমাজতন্ত্রী জাতীয়তাবাদের নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে হত্যার মতো ঘটনার পর পশ্চিমা দুনিয়ার চোখে বা দৃষ্টিতে—অর্থাৎ তাদের মিডিয়ার বদৌলতে আমরা বহুত আলোচনা-পর্যালোচনা শুনেছি এবং দেখেছি। আর আমাদের ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন দেখতে হয়েছে, তাদেরই চোখে, দৃষ্টিতে ও দৃষ্টিভঙ্গিতে। গ্লাসনস্ত আর পেরেস্ত্রইকার—অর্থাৎ সংস্কার আর স্থবিরতার নামে (পুনর্গঠনের) দোহাই দিয়ে পশ্চিমা খোলা হাওয়ার বা পশ্চিমা তথাকথিত সভ্যতা রপ্তানি করা হলো ওই ভূখণ্ডে। গ্লাসনস্ত উন্মুক্ততা আর পেরেস্ত্রইকার—অর্থাৎ পুনর্গঠন ‘কীসের’ এক কথিত জাতীয়তাবাদী চেতনার আমদানি-রপ্তানির রাজনৈতিক খেলা এবং ডিপস্টেট আর ক্রনি ক্যাপিটালিজমের হাত জড়াজড়ি করে, নয়া এক বিশ্বব্যবস্থা বাস্তবায়নের জয়ধ্বনি তারা দিলেন দেশে দেশে। প্রতিযোগিতা শুরু হলো, কে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙেছে, তার দাবিদারদের মধ্যে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং ইউরোপীয় সহযোগীদের মধ্যে পশ্চিমা ‘উদার গণতন্ত্র’ এবং ‘খোলাবাজার অর্থনীতির’ ধাক্কায় সব লন্ডভন্ড হয়ে গেলে।
এর আগে জার্মানিতে ঘটে গেল আরেক ঘটনা। ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর পতন হলো ঐতিহাসিক বার্লিন ওয়াল বা বার্লিন দেয়ালের। এই দেয়ালকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমারা মনে করত ভিন্ন এক দৃষ্টিতে পশ্চিম জার্মানিতে রয়েছে স্বর্গ আর পূর্ব জার্মানিতে দুনিয়ার ‘সব নরক’। দেয়াল ভাঙল বটে, তবে দুই জার্মানির মানুষের ঐক্য, সমতা এবং এক পক্ষের স্বর্গপ্রাপ্তির কোনো নিশানা দেখা গেল না।
নিজের কথা বলার আমার নিদারুণ অপছন্দের। তবু লিখতে হলো বলে মার্জনা করবেন। ১৯৮৭ সালে আমি আফগান যুদ্ধের খবর সংগ্রহের জন্য ওই দেশটিতে গিয়েছিলাম। ছিলাম দুই সপ্তাহর বেশি। উদ্দেশ্য যুদ্ধের খবর সংগ্রহ। যুদ্ধ যে কি ভয়াবহ হতে পারে, তা আরেকবার প্রথম যৌবনে একজন রিপোর্টার হিসেবে দেখতে বাধ্য হয়েছিলাম। এ কথা আজও বলতে হবে, যুদ্ধে আসলে পরাজিত হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে, যুদ্ধের মধ্যে শিশু এবং নারীরা কি দুর্বিষহ জীবনযাপন করে, তা বিদেশবিভুঁইয়ে যাওয়া (আফগানিস্তান) প্রথম যৌবনের একজন রিপোর্টার হিসেবে এক দগদগে দুঃসহ স্মৃতি আজও আমাকে তাড়া করে। যুদ্ধ শুনলেই ভয় পেয়ে যাই। ১৯৭১-এর আমাদের দেশের কথা বাদই দিলাম। ২০০৬-এও আফগান যুদ্ধ দেখেছি, তবে পাকিস্তানের পেশোয়ার থেকে। কিন্তু অনুভূতি একই।
বলছিলাম জার্মানির দেয়ালের কথা। ১৯৯০-এর শেষে জার্মানির দেয়াল ভাঙার পরের খবর সংগ্রহের জন্য আমি জার্মানির দুই অংশেই (তখন সবে একীভূত) যাই। পূর্ব জার্মান অংশের মানুষ মহাসুখের পশ্চিমে স্বর্গের আশায় ছুটছে কাঙ্ক্ষিত পূর্বাংশের মহাসুখ বা মহান স্বর্গের আশায়।
পশ্চিম জার্মান অংশের পতিতালয়সহ বিভিন্ন স্থানে পূর্ব জার্মান নারীরা গিজ গিজ করছিল। পশ্চিম জার্মান অংশের হামবুর্গ, ফ্রাঙ্কফুটসহ বড় বড় শহরের একই দৃশ্য। কাঙ্ক্ষিত স্বর্গ খুঁজতে খুঁজতে হয়রান পূর্ব জার্মানিরা। এ রকম অনেক বাহিনী তখন ঘটেছে যুদ্ধবিহীন বা পুনর্মিলন বা পুনরেকর্ত্রীকরণের নামে। এও এক ধরনের যুদ্ধ, মনস্তাত্ত্বিক এসব ঘটনা বা অপ্রাপ্তির বেদনাক্রান্ত মুখগুলো এখনো আমার মনে ভাসছে দুঃসহ স্মৃতি হিসেবে।
ইরান যুদ্ধ বুঝতে হলে পশ্চিমের ভিন্ন ধরনের এক যুদ্ধ—অর্থাৎ পোল্যান্ডের ১৯৮০-এর দিকের ঘটনা বুঝতে হবে। সলিডারিটি নামের একটি সংগঠনের—অর্থাৎ শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা লেস ওয়ালেসা ১৯৮০ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রী পোল্যান্ডের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের মদতে। এ জন্য তাকে পরে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারও দেওয়া হয়। পোল্যান্ডই প্রথম দেশ, যেটি সোভিয়েত ইউনিয়নের বলয় থেকে ১৯৯০-এ প্রথম খবর হয়ে পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা চালু করে। পোল্যান্ড পরে অনিবার্যভাবে নিদারুণ দুরবস্থার মধ্যে পড়ে যায়। অবস্থাটা এমন দাঁড়ায়, মানুষ দেশান্তরী হতে শুরু করে। ১৯৯১-এ পোল্যান্ডের ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপিকা সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার মনোবাসনায় জার্মানিতেই আটকা পড়ে থেকে যান এবং শেষ পর্যন্ত তার জায়গা হয় এক নিষিদ্ধ পল্লীতে। সম্ভবত ১৯৯৩ সালে জার্মানিতে তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় তিনি সারাক্ষণ কাঁদছিলেন।
এ তো গেল পশ্চিমা দুনিয়ার স্বর্গের হাতছানি। লোভ কিংবা মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কাহিনি। এর উল্টোদিকের কাহিনিও আছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পানামা। একসময় গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মানা প্রজাতন্ত্র। মার্কিনিদের কাঁধে চড়েই ক্ষমতা দখল করেছিলেন জেনারেল ম্যানুয়েল নরিয়েগা ১৯৮১ সালে। এই নরিয়েগাকেই আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পানামা থেকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসে। ১৯৯১ সালের ৩ জানুয়ারি নরিয়েগাকে নিজ দেশ থেকেই আটক করা হয়, পানামা খালে মার্কিন যাতায়াতে কথিত বাধা দেওয়ার অজুহাতে। তবে আটকের কারণ দেখানো হয় ভিন্ন কাহিনি—অর্থাৎ ‘মাদক সম্রাট’ হিসেবে নরিয়েগা নাকি কাজ করেছেন। এই অপারেশনের নাম ছিল ‘অপারেশন জাস্ট কজ’—অর্থাৎ অপারেশনের সঠিক কারণ। পানামার এই শাসক মার্কিন ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির কাভারে কাজ করা—বিশেষ এজেন্ট ওমর আলেমান জেনারেল নরিয়েগাকে বন্দি করার অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। সঠিক সাল মনে নেই, সম্ভবত ১৯৯১ বা ৯২ সাল হবে। এই ওমর আলেমানের সঙ্গে আমি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় আলাপ করার সুযোগ পাই এবং সংক্ষিপ্ত আকারে সাক্ষাৎকার নিই।
একইভাবে ক্যারাবিয়ান দেশ হাইতির প্রেসিডেন্ট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বার্ট্রান্ড অ্যারিস্টিককে ইঁদুর-বিড়াল খেলার মতো সাতবার দেশটির প্রেসিডেন্ট বানানো হয়, আবার পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের কথা অক্ষরে অক্ষরে না শুনলেই ক্ষমতাচ্যুতি।
লাতিন আমেরিকার দেশ চিলির প্রথম সমাজতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট স্যালভাদর আলেন্দেকে হত্যা করা হয় ১৯৭৩ সালে। যুক্তরাষ্ট্র তাকে ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হত্যা করে সামরিক ক্যুয়ের মাধ্যমে। বিশ্বব্যাপী সমাদৃত নেতা আলেন্দের দোষ ছিল এই যে, তিনি সমাজতন্ত্রী আদর্শে বিশ্বাসী থেকে ওই মতাবাদ অনুযায়ী দেশ পরিচালনা শুরু করেন। আর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এতটুকুও তোয়াক্কা করতেন না। এভাবে দেশে দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয় হত্যা, হত্যাযজ্ঞ, অপহরণের বা স্বর্গের লোভের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের ঘটনা ঘটিয়েছে অসংখ্যবার অনেক দেশে।
সবশেষ উদাহরণ—এ বছরেরই ৩ জানুয়ারি দক্ষিণ আমেরিকার তেলসম্পদে অতিসমৃদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বুড়ো আঙুল দেখানো দেশ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বিশেষ বাহিনী তার দেশ থেকে সস্ত্রীক অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসে। তাদের অপরাধ—এক. বিশ্বের প্রধানতম তেলসমৃদ্ধ দেশ হওয়া এবং দুই. প্রকাশ্যে আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদকে সমালোচনা করে তেলসম্পদ জাতীয়করণ করে গণতান্ত্রিক উপায়ে দেশ পরিচালনা। কিন্তু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বলে কথা। নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীর বিচার হচ্ছে ওই কারণে নয়। বরং মাদক-সন্ত্রাসবাদ, কোকেন পাচার এবং অস্ত্র মামলায়।
নয়া উপনিবেশবাদ
এসব ঘটনাবলি যুদ্ধ, সাম্রাজ্য বিস্তার নতুন করে এককালের ঔপনিবেশকতার বিস্তারের কথাই মনে করিয়ে দেয়। বিশ্বের দেশে দেশে ঔপনিবেশিক শক্তি সাম্রাজ্য বিস্তার করত এক ভিন্ন পদ্ধতিতে। এখন পদ্ধতি, কলাকৌশল এবং এর ধরন-ধারণ পাল্টেছে।
কার্ল মার্কস তার সময়ে সাম্রাজ্য বিস্তারকে দেখেছেন ভিন্নভাবে। তিনি সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণকে নৈতিক বা রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, পুঁজিবাদের এক অন্তর্নিহিত এবং কাঠামোগত বিবেচনা ও অপরিহার্যতা হিসেবে দেখেছেন। আর এই চক্র ক্রমাগত গড়ে তুলত নতুন নতুন দেশের অর্থনৈতিক—অর্থাৎ বাজার, শ্রম (দাস) এবং ওই অঞ্চলের সম্পদ লুণ্ঠনের লক্ষ্যে ও অনুসন্ধানের তাগিদে। মার্কস ওই ব্যবস্থাকে নির্মম, নিষ্ঠুর কিন্তু অনিবার্য বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেন। মার্কসের মতে, এটাই বিশ্বব্যাপী একক পুঁজির পুঞ্জীভবনের লক্ষ্যে একক এক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় একীভূত করে। মার্কস তার লেখায় দেখিয়েছেন, এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে হলে, বুর্জোয়া বা পুঁজির মালিকদের ‘সর্বত্র আস্তানা প্রতিষ্ঠা, বসতি বা দখল স্থাপন এবং সামগ্রিক যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ব্যবস্থা’ গ্রহণ করতে হবে। কার্ল মার্কস এ বিষয়ে জোর দিয়ে বলেন, ‘এই সম্প্রসারণ কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সম্ভব নয়, রাষ্ট্রকে এর জন্য যেকোনো ধরনের জোর খাটাতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন ঔপনিবেশিকতার যুদ্ধ, যা এর কেন্দ্রবিন্দু।’
মার্কস ঔপনিবেশিকবাদকে পুঁজিবাদী সম্প্রসারণের এক নৃশংস এবং ভয়ংকর ধ্বংসাত্মক অথচ পুঁজিবাদীদের জন্য অনিবার্য উপজাত বা পদ্ধতি হিসেবে দেখেছেন। তিনি এও বলেছেন, এটা হচ্ছে আদিম সঞ্চয়ন ব্যবস্থা, যা কি না চিরায়ত সমাজকে উল্টে-পাল্টে দিয়ে তথাকথিত এক সমাজ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে। যাকে মার্কস ইতিহাসের এক অচেতন হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। [বিস্তারিত আলোচনার জন্য, মার্কস ‘On Colonialism; 1818-1883]
পাঠক নিশ্চয়ই লক্ষ করবেন, ১৮ শতকের যেসব ঘটনাবলির কথা বলা হলো, বর্তমান সময়েও তার পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং সম্পদের ধরন-ধারণ পাল্টেছে। আগে যে স্থান ছিল সাধারণ সম্পদ, সে স্থান দখল করেছে তেলসম্পদ। আর এই তেলসম্পদই হচ্ছে নয়া উপনিবেশবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের নতুন রূপ, এক নয়া নগ্ন চেহারা।
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে গেলে নয়া উপনিবেশবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের পুরো ব্যবস্থা, এর নীতিকৌশল বুঝতে হবে এই কারণে যে, কেন তারা যুদ্ধকে একটি কার্যসম্পাদন বা কর্ম-উদ্ধারের অস্ত্র (Tool) মনে করে।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ বছরের ইতিহাসে মাত্র ১৬ বছর এই রাষ্ট্রটি যুদ্ধবিহীন অবস্থায় থেকেছে। কোথাও না কোথাও যুদ্ধে তারা জড়িত থেকেছেই। আর এই যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রটি ২৩৪ বছর যুদ্ধের মধ্যেই থেকেছে।
এ ক্ষেত্রে সংক্ষেপে বলা প্রয়োজন, যুদ্ধ হচ্ছে যে বিশ্বব্যবস্থা বিভক্ত হয়ে গেছে, তাকে ভাগাভাগি করা অথবা আধিপত্য বিস্তারের কর্তৃত্ব স্থাপন করার লক্ষ্যে নৃশংস এক ব্যবস্থা। আন্তোনিও গ্রামসি যাকে অর্থনৈতিক শোষণের জন্য বলপ্রয়োগ এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা হিসেবে দেখেছেন।
তবে ১৯৫০-এর দশকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বক্তব্যটি দিয়েছেন ঘানার প্রথম প্রেসিডেন্ট এবং উপনিবেশবাদবিরোধী নেতা কোয়ামে নক্রমা (Kwame Nkrumah)। তিনি নয়া উপনিবেশবাদ ধারণার প্রবক্তা। নক্রমা বলেছিলেন, নয়া উপনিবেশবাদে জাতিগুলো নামমাত্র স্বাধীন-সার্বভৌম হলেও অর্থনৈতিকভাবে বিদেশি শক্তির দ্বারা শাসিত হয়। আর একে প্রতিহত এবং প্রতিরোধের জন্য জনঐক্যের প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেছিলেন—এ বক্তব্য আজও প্রাসঙ্গিক। ইরান যুদ্ধ সম্পর্কে বুঝতে গেলে এ বিষয়টি জানা জরুরি। আশা করি আগামী পর্বগুলোতে কেন এবং কোন উদ্দেশ্যে ইরানকে টার্গেট করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সহযোগী ইসরাইল, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। আলোচনা করা হবে কীভাবে যুদ্ধকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা এবং বিশ্ব অব্যবস্থাপনা (World order and disorder) সৃষ্টি, কোন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কেন এবং কত ব্যয় করেছে, যুদ্ধ ব্যয় কেন, যুদ্ধ কী আসলে বিনিয়োগ, পেট্রো-ডলার অর্থনীতিসহ যুদ্ধ-সম্পর্কিত বিষয়াবলি। তবে এই পর্ব শেষ করার আগে এটুকু বলা যায়, ইরান যুদ্ধ যত বিলম্বিত হবে, যুক্তরাষ্ট্র ততই দুর্বল থেকে দুর্বলতার হবে।
লেখক : গবেষক; সামরিক শাসন ও বাংলাদেশের অনুন্নয়ন এবং সামরিক শাসনোত্তর বেসামরিক শাসনের সমস্যা বইয়ের লেখক