হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ইরান বিপ্লবের রুহ ও দীর্ঘ একাকিত্ব

শাহীদ কামরুল

‘ইরান’ নামটি উচ্চারণ করলেই একাধিক ইতিহাস, একাধিক স্মৃতি, একাধিক বেদনা ও সম্ভাবনার স্তর একসঙ্গে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। পারস্যের প্রাচীন সাম্রাজ্যিক গৌরব, ইসলামের নৈতিক মহিমা, সুফি কাব্যের রুহানি আবেশ, আধুনিক বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ ছায়া—সব মিলিয়ে ইরান এক জটিল সভ্যতার পাঠ্যরূপ। এই ভূখণ্ডে মানুষ শুধু নাগরিক নয়, তারা ইতিহাসের ধারক, ধর্মীয় কল্পনার উত্তরাধিকারী এবং রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার নির্মাতা। অথচ এই বহুমাত্রিক ঐতিহ্যের মাঝেই স্বাধীনতার প্রশ্নটি বারবার স্থগিত হয়েছে, যেন মুক্তি সর্বদা প্রতিশ্রুত কিন্তু অসম্পূর্ণ একটি ভবিষ্যৎ। আজ ইরানের মুক্তিকামী জনতার প্রতি সংহতি প্রকাশ করা মানে কেবল একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তন কামনা করা নয়; বরং মানবমর্যাদা, ন্যায় ও অংশগ্রহণমূলক শাসনের সর্বজনীন দাবিকে স্বীকার করা।

ইরানের ইতিহাসে ক্ষমতার রূপান্তর বারবার ঘটেছে, কিন্তু নাগরিক স্বাধীনতার ধারাবাহিকতা গড়ে ওঠেনি। প্রাচীন আখেমেনীয় ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের শাসন কাঠামোতে রাজকীয় কর্তৃত্ব ছিল পবিত্রতার সঙ্গে যুক্ত; ইসলামি যুগে সেই পবিত্রতা ধর্মীয় বৈধতায় রূপ নেয়; আধুনিক যুগে বিপ্লবের ভাষ্য সেই বৈধতাকে জনগণের নামে পুনর্লিখন করে।

আসলে ইরান এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে ভূসম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রশ্নটি কেবল অর্থনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা রূপ নিয়েছে নৈতিক, ঐতিহাসিক ও দার্শনিক আত্মপরিচয়ের সংগ্রামে। উনিশ শতকের শেষভাগে এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে ব্রিটিশ-নিয়ন্ত্রিত অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি যে প্রকারে ইরানের ভূগর্ভস্থ সম্পদ শোষণ করেছিল, তা ঔপনিবেশিক অর্থনীতির একটি ক্লাসিক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যেখানে প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদের আহরণ এবং সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির সঞ্চয় প্রক্রিয়া একই কাঠামোয় সংযুক্ত ছিল। ইরানের জাতীয় আয়ের একটি বিশাল অংশ তেল থেকে উৎপন্ন হলেও মুনাফা নির্ধারণের ক্ষমতা ছিল বিদেশি করপোরেট ব্যবস্থার হাতে; ফলে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও ন্যায়বণ্টনের প্রশ্ন ক্রমেই রাজনৈতিক ক্ষোভে পরিণত হয়। এই পরিস্থিতি ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইনের ‘ওয়ার্ল্ড-সিস্টেমস থিওরি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, ইরানকে ‘পেরিফেরি’ বা আধা-পরিধি অঞ্চলের মতো ব্যবহার করা হচ্ছিল, যেখানে সম্পদ কেন্দ্রীয় পুঁজিবাদী শক্তির দিকে সঞ্চালিত হয়, আর স্থানীয় সমাজ কাঠামোগত নির্ভরতার মধ্যে আবদ্ধ থাকে। এই নির্ভরতা শুধু অর্থনীতিতে নয়, জ্ঞান ও হিসাবের নিয়ন্ত্রণেও প্রতিফলিত ছিল; আন্তর্জাতিক অডিটে পূর্ণ প্রবেশাধিকার না থাকা মানে ছিল এপিস্টেমিক ডমিনেশন—জ্ঞানগত সার্বভৌমত্বেরও হরণ।

তাছাড়া ১৯৫৩ সালে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দিক যখন তেল জাতীয়করণের ঘোষণা দেন, তখন তিনি কেবল অর্থনৈতিক নীতি বদলাননি; তিনি কলোনিয়াল হেজেমনের বিরুদ্ধে একপ্রকার অনটোলজিক্যাল ক্লেইম উত্থাপন করেছিলেন—জাতির অস্তিত্বের অধিকার তার নিজস্ব সম্পদের ওপর। এই পদক্ষেপ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ ও মার্কিন ভূরাজনৈতিক কৌশল উভয়ের কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। সিআইএ-নেতৃত্বাধীন অপারেশন আজাক্সের মাধ্যমে যে ন্যক্কারজনক ও বিপজ্জনক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘কোভার্ট রেজিম চেঞ্জ’-এর প্রাচীনতম সুপরিকল্পিত উদাহরণগুলোর একটি। রাজনীতি বিজ্ঞানী স্টিফেন কিনজারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারকে অপসারণ করেনি, এটি ইরানের জনগণের রাজনৈতিক চেতনায় এক স্থায়ী অপমানবোধ ও অবিশ্বাসের বীজ রোপণ করে, যা পরবর্তী দশকগুলোয় পশ্চিমা শক্তির প্রতি গভীর সন্দেহে রূপ নেয়। এই অভিজ্ঞতা উপনিবেশোত্তর তত্ত্বের আলোকে পড়লে স্পষ্ট হয়—বিদেশি হস্তক্ষেপ এখানে কেবল ভূরাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি একটি কালেক্টিভ ট্রমা, যা জাতীয় স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। ফিলিস্তিনি-আমেরিকান বিশ্ববিখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও উত্তর-উপনিবেশবাদী লেখক এডওয়ার্ড সাঈদের ‘অরিয়েন্টালিজম’ ধারণা অনুযায়ী, পশ্চিমা শক্তি প্রাচ্যকে এমন এক অবজেক্ট হিসেবে নির্মাণ করে, যার ওপর কর্তৃত্ব নৈতিকভাবে বৈধ বলে প্রতিভাত হয়। মোসাদ্দিকের অপসারণ সেই নির্মাণের রাজনৈতিক প্রয়োগ, যেখানে প্রাচ্যের জনগণের গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তকেও পশ্চিমা শক্তি অস্বীকার করতে পারে, কারণ তাদের চোখে প্রাচ্য নিজেই স্বশাসনে অক্ষম। এই এপিস্টেমিক হায়ারার্কি ইরানের রাষ্ট্রীয় চেতনায় গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে।

১৯৭৯ সালের বিপ্লবকে তাই কেবল ধর্মীয় উত্থান হিসেবে দেখা একপাক্ষিক। এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি অপমান, অর্থনৈতিক শোষণ ও ভূরাজনৈতিক অধীনতার বিরুদ্ধে সমষ্টিগত বিস্ফোরণ। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো এই বিপ্লবকে ‘স্পিরিচুয়াল পলিটিক্স’ হিসেবে দেখেছিলেন—একটি রাজনৈতিক শক্তি, যেখানে ধর্মীয় চেতনা সামাজিক প্রতিরোধের ভাষায় রূপ নেয়। ফুকোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইরানের বিপ্লব আধুনিকতার সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে, যেখানে ধর্মকে ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। এখানে ধর্মই রাজনৈতিক মুক্তির শক্তি হয়ে ওঠে। ফলে বিপ্লবটি ছিল একযোগে অ্যান্টি-ইম্পেরিয়াল এবং অ্যান্টি-সেক্যুলার আধুনিকতার প্রতিক্রিয়া।

ইরানের বিপ্লব-পরবর্তী ভূরাজনীতি বুঝতে গেলে সোভিয়েত আগ্রাসনের প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ। বিপ্লবের মাত্র কয়েক মাস পর আফগানিস্তানে সোভিয়েত আক্রমণ ঘটে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বে ‘বাফার স্টেট’ ধারণাটি এখানে প্রাসঙ্গিক—এক শক্তি আরেক শক্তির প্রভাব ঠেকাতে মধ্যবর্তী ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের আশঙ্কা ছিল, ইসলামি বিপ্লবের আদর্শ তার মুসলিম-অধ্যুষিত প্রজাতন্ত্রগুলোয় ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে আফগানিস্তান ভূরাজনৈতিক প্রতিরোধ-ক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই প্রেক্ষাপটে ইরান কেবল একটি রাষ্ট্র নয়, একটি আদর্শিক প্রতীক—যার বিস্তার বড় শক্তিগুলোর কাছে হুমকি হিসেবে দেখা দেয়।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোও একই কারণে বিপ্লবকে ভয় পায়। কারণ বিপ্লবের বার্তা ছিল শাসনের বৈধতা জনগণের সম্মতি থেকে আসে, বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র থেকে নয়। রাজনৈতিক তত্ত্বে এটি লেজিটিমেসি ক্রাইসিস—শাসনে নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠা। ফলে আরব রাজতন্ত্রগুলো পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রাখে, যাতে বিপ্লবী আদর্শ তাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ না করে। এখানে পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার একটি মৌলিক দ্বৈততা স্পষ্ট হয়। একদিকে তারা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার সর্বজনীন মূল্যবোধ প্রচার করে; অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক স্বার্থে স্বৈরশাসক বা রাজতন্ত্রকে সমর্থন করে। এই দ্বৈততা কেবল সামরিক শক্তি নয়—সাংস্কৃতিক ও নৈতিক বৈধতার নির্মাণ। পশ্চিমা শক্তি নিজেদের মানবাধিকার ও সভ্যতার রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে, অথচ বাস্তবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় দমনমূলক শাসনকেও সমর্থন দেয়। ফলে তাদের নৈতিক ভাষ্য ও বাস্তব নীতির মধ্যে বৈপরীত্য তৈরি হয়, যা উপনিবেশোত্তর সমাজে ‘হিপোক্রেসি অব লিবারেল ইম্পেরিয়ালিজম’ হিসেবে প্রতিভাত হয়।

তাছাড়া তেল-রাজনীতির প্রসঙ্গে আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়। ১৯৫৩ সালে ইরান যে জাতীয়করণ করেছিল, সত্তরের দশকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও একই পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু তখন আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহনীয় ছিল। কারণ ততদিনে বৈশ্বিক শক্তিসাম্য বদলে গেছে, আর পশ্চিমা করপোরেট কাঠামো নতুন চুক্তির মাধ্যমে স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ ইরান ছিল পরীক্ষামূলক ক্ষেত্র, যেখানে ঔপনিবেশিক অর্থনীতির বিরুদ্ধে প্রথম চ্যালেঞ্জ কঠোরভাবে দমন করা হয়। ইরানের জাতীয় চরিত্র নিয়ে বহু পর্যবেক্ষক একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন—সার্বভৌম মর্যাদার প্রতি তীব্র সংবেদনশীলতা। ইতিহাসবিদ নিকি কেডি দেখিয়েছেন, পারস্য সভ্যতার দীর্ঘ ঐতিহ্য ইরানি সমাজে আত্মমর্যাদাবোধকে গভীরভাবে প্রোথিত করেছে। ফলে বিদেশি প্রভাবকে তারা কেবল রাজনৈতিক হুমকি নয়, সাংস্কৃতিক অপমান হিসেবে অনুভব করে। এই মনস্তত্ত্ব ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে জাতীয় চেতনায় স্থায়ী প্রতিরোধমুখী অবস্থান তৈরি করে।

বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে এই প্রেক্ষাপট আরো জটিল। বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য ক্রমেই বহুমেরু হলেও সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রাধান্য এখনো পশ্চিমা জোটের হাতে। মার্কিন ভূরাজনৈতিক কৌশল প্রায়ই ‘সিকিউরিটি ডকট্রিন’ নামে বৈধতা পায়, কিন্তু সমালোচকদের কাছে তা হলো প্রভুত্বশীল শক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধ করে রাখার প্রক্রিয়া ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণের নীতি। আন্তর্জাতিক আইন যেখানে সার্বভৌমত্বের সমতা ঘোষণা করে, বাস্তবে সেখানে শক্তির অসমতা নির্ধারণ করে কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কতটা সম্মান পাবে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আরেকটি ট্র্যাজিক দ্বন্দ্ব দেখা যায়—অভ্যন্তরীণ স্বৈরতন্ত্র ও বহিরাগত আধিপত্যের যুগপৎ উপস্থিতি। অনেক আরব রাষ্ট্র পশ্চিমা সামরিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল; ফলে তারা আঞ্চলিক সংহতির পরিবর্তে নিরাপত্তা-নির্ভর কূটনীতিতে আবদ্ধ থাকে। অর্থনৈতিকভাবে তেল ও গ্যাস বিপুল সম্পদ দিলেও রাজনৈতিকভাবে তা স্বাধীনতা নিশ্চিত করেনি। কারণ সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জনগণের অংশগ্রহণের সমান নয়। ফলে একদিকে পশ্চিমা সামরিক উপস্থিতি, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসন—এই দ্বৈত কাঠামো অঞ্চলের জনগণের মধ্যে বঞ্চনা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

আদতে পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার সমালোচনায় প্রায়ই বলা হয়, মানবাধিকারের ভাষা প্রায়ই কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কোনো রাষ্ট্র পশ্চিমা স্বার্থের বিরোধিতা করলে তার মানবাধিকার লঙ্ঘন আন্তর্জাতিক আলোচনায় প্রবলভাবে উঠে আসে; কিন্তু মিত্র রাষ্ট্রের একই লঙ্ঘন তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত থাকে। এই নৈতিকতা উত্তর-ঔপনিবেশিক সমালোচনায় দ্বৈত মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত। ফলে পশ্চিমা মূল্যবোধের সর্বজনীনতার দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

ইরানের ক্ষেত্রে এই দ্বৈততা বিশেষভাবে দৃশ্যমান। একদিকে দেশটি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি; অন্যদিকে একই অঞ্চলের কতিপয় রাষ্ট্র পশ্চিমা সামরিক জোটের অংশ হয়ে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সুবিধা পায়। ফলে ইরানের রাজনৈতিক বয়ানে পশ্চিমা শক্তি একটি শত্রুভাবাপন্ন হেজেমন হিসেবে চিত্রিত হয়, যে মুসলিম বিশ্বে বিভাজন ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়। এই বয়ান বাস্তবতার সব মাত্রা ধারণ না করলেও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তা আবেগীয় সত্য লাভ করে। দার্শনিক ফ্রাঞ্জ ফ্যানন উপনিবেশোত্তর সমাজের মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, দীর্ঘ শোষণ ও অপমানের অভিজ্ঞতা জনগণের মধ্যে প্রতিরোধকে নৈতিক কর্তব্যে পরিণত করে। ইরানের বিপ্লবী ও পরবর্তী রাষ্ট্রীয় বয়ানে এই মনস্তত্ত্ব প্রতিফলিত—বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান শুধু কৌশল নয়, পরিচয়ের অংশ। ফলে আন্তর্জাতিক সংঘাতে আপসকে অনেক সময় আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখা হয়। তবে বিশ্লেষণে এটিও স্বীকার্য যে কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোও জনগণের স্বাধীনতা নির্ধারণ করে। পশ্চিমা আধিপত্যের সমালোচনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাকাঠামোর সমালোচনাও অপরিহার্য। কারণ উপনিবেশোত্তর তত্ত্বের একটি মৌলিক সতর্কতা হলো—বাহ্যিক আধিপত্যের বিরোধিতা অভ্যন্তরীণ কর্তৃত্ববাদকে বৈধতা দিতে পারে না।

হালের ভূরাজনীতি পর্যন্ত ধারাবাহিক ইতিহাস দেখায়, সার্বভৌমত্ব প্রশ্নটি এখানে কেবল রাষ্ট্রের সীমানা নয়; এটি মর্যাদা, স্মৃতি ও প্রতিরোধের সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা। পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার দ্বৈত নীতি, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির বিভাজন এবং উপনিবেশোত্তর অপমানবোধ—সব মিলিয়ে ইরান এমন এক ঐতিহাসিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি সংঘাত অতীতের স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রতিটি উত্তেজনা তাদের কাছে কেবল কূটনৈতিক ঘটনা নয়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা বিশ্ব যদি সত্যিই মানবাধিকার ও স্বাধীনতার সর্বজনীন মূল্যবোধে বিশ্বাসী হয়, তবে তার নীতিতে ধারাবাহিকতা প্রয়োজন—যেখানে ভূরাজনৈতিক স্বার্থ নৈতিকতার ওপরে স্থান পাবে না। অন্যথায় হেজেমনি ও হিপোক্রেসির অভিযোগ থেকে মুক্তি অসম্ভব। একইভাবে মুসলিম বিশ্ব ও মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর জন্যও প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ বৈধতা, জনগণের অংশগ্রহণ ও আঞ্চলিক সংহতি, যাতে বাহ্যিক শক্তির ওপর নির্ভরতা কমে।

ইতিহাসের দীর্ঘ বয়ান আমাদের শেখায়, সার্বভৌম মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা কোনো জাতির মধ্যে নিঃশেষ হয় না। ইরানের ক্ষেত্রেও তা সত্য। ১৯৫৩ সালের অপমান, ১৯৭৯ সালের বিস্ফোরণ এবং বর্তমান উত্তেজনা—সবই একই ধারার অধ্যায়। পশ্চিমা আধিপত্য ও আঞ্চলিক বিভাজনের মাঝে দাঁড়িয়ে ইরান নিজেকে এমন এক রাষ্ট্র হিসেবে কল্পনা করে, যে মাথা নত না করে টিকে থাকতে চায়। এই কল্পনা বাস্তবতার সব মাত্রা ধারণ না করলেও তার ঐতিহাসিক শিকড় গভীর।

সর্বোপরি ইরানের ইতিহাস যেন এক অন্তহীন শোকগাথা ও প্রতিজ্ঞার সমবায়—ক্ষতবিক্ষত, তবু অবনত নয়। বহিরাগত চাপ, অবরোধ, অবিশ্বাস আর অভ্যন্তরীণ সংকটের দীর্ঘ ছায়ার মধ্যেও একটি জাতি তার মর্যাদাকে শেষ আশ্রয় করে বেঁচে আছে। তাদের চোখে স্বাধীনতা কেবল একটি রাজনৈতিক শব্দ নয়, তা রুহের আর্তি, ইজ্জতের দাবি, বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার। যে মাটি বহুবার কেঁপে উঠেছে ষড়যন্ত্র ও সংঘাতে, সেই মাটিতেই মানুষ এখনো দাঁড়িয়ে থাকে—নীরবে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে।

তাদের স্মৃতি ভারী, তাদের পথ কণ্টকাকীর্ণ, তবু তাদের আশা নিভে যায়নি। ইরান যেন এক আহত হৃদয়, যে রক্তক্ষরণ সত্ত্বেও স্পন্দন থামায় না। এই স্পন্দনই তাদের পরিচয়। এই স্পন্দনই তাদের প্রতিরোধ। আর যতদিন তা বেঁচে থাকবে, ততদিন কোনো একাকিত্বই তাদের শেষ শব্দ হতে পারবে না।

লেখক : সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি

sahidkamrul25@gmail.com

আন্তর্জাতিক নারী দিবস : বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন

গিগ ইকোনমি : সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ : নৈতিকতা ও ভবিষ্যতের ঝুঁকি

যুদ্ধের অভিঘাত ও ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের চ্যালেঞ্জে

জলবায়ু সংকটে সুন্দরবন : ভিনদেশি গাছের নীরব বিস্তার

মোদি কি ইসরাইলের পাশে দাঁড়িয়ে ভুল করলেন?

সুশাসনের প্রত্যাশা ও সরকারের করণীয়

জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের সুযোগ

ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ ও মুসলিম উম্মার ঐক্যের ভবিষ্যৎ

জাকাত ও ইসলামিক সামাজিক অর্থনীতি