হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

আমেরিকা কি গণতান্ত্রিক নাকি টেকনো-প্লুটোক্রেটিক রাষ্ট্র

শাহীদ কামরুল

আমেরিকা কি সত্যিই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, নাকি একটি টেকনো-প্লুটোক্রেটিক করপোরেট ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত একটি দেশ? কথাটি অনেকের কাছে আজিব মনে হলেও এটাই সত্য, আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে-যুক্তরাষ্ট্র কি প্রকৃত অর্থে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, নাকি এটি ধীরে ধীরে একটি টেকনো-প্লুটোক্রেটিক করপোরেট ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে? কেতাবিভাবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে উদার গণতন্ত্রের এক আদর্শ উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করে। সংবিধান, ক্ষমতার বিভাজন, মুক্ত নির্বাচন, নাগরিক অধিকার এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সেই দাবিকে শক্তিশালী করে। কিন্তু রাজনৈতিক অর্থনীতি, প্রযুক্তিনির্ভর করপোরেট শক্তি এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের বাস্তব প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে গণতন্ত্রের এই ঘোষিত কাঠামোর আড়ালে ক্ষমতার একটি ভিন্ন জটিল বাস্তবতা কাজ করছে।

যাই হোক, আমেরিকার টেকনো-প্লুটোক্রেটিক ধারা গঠনের ইতিহাস খুব গভীরে গিয়ে দাঁড়ায় ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে, যখন শিল্পবিপ্লব আমেরিকায় ধনী শিল্পপতি এবং বৃহৎ করপোরেশনগুলোর উত্থান ঘটায়। সে সময় থেকেই ক্যাপটিন্স অব ইন্ডাস্ট্রি বা শিল্পের পুরোধারা শুধু অর্থের জোগানই বাড়ায়নি, বরং রাজনৈতিক প্রভাবও অর্জন করতে শুরু করে। ১৯৩০-এর দশকে দ্য গ্রেট ডিপ্রেশনের সময়, জনসাধারণের ওপর সরকারি হস্তক্ষেপ বাড়ানো সত্ত্বেও, করপোরেট লবি ক্রমাগত শক্তিশালী হয়ে ওঠে, বিশেষ করে নিউ ডিলনীতির বিরুদ্ধে। ১৯৮০-এর দশকে রেগনোমিকসের মাধ্যমে করপোরেট কর কমিয়ে, নীতিনির্ধারণে করপোরেট গোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধি পায়, যা পরে ডিজিটাল যুগে টেক জায়ান্টদের মাধ্যমে আরো তীব্র হয়। যখন প্রযুক্তি এবং বড় করপোরেশন রাজনীতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, তখন ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ বা জনসামাজিক ক্ষেত্র দুর্বল হয়, যার ফলে গণতন্ত্রের পার্টিসিপেটরি ডেমোক্রেসি ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়। আজ আমেরিকার টেকনো-অলিগার্চি বা করপোরেট আধিপত্য এমন এক ধাপে পৌঁছেছে, যেখানে বিগ ডেটা, আর্টিফিশিয়ালি ইন্টেলিজেন্স এবং অ্যালগরিদমিক গভর্নেন্স, নির্বাচনি প্রচার এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনগণের প্রতিনিধিত্বকে অনেকটাই ম্লান করে ফেলছে। এই প্রক্রিয়ায়, গণতন্ত্রের মূল দর্শনÑজনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আর আমেরিকা ক্রমেই একটি টেকনো-প্লুটোক্র্যাটিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে অর্থ ও প্রযুক্তির হাতে গণতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে। যেমন : আমেরিকার ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটকে আমরা একটি গুরুতর ট্র্যাজেডি হিসেবে বিবেচনা করতে পারি, কারণ এটি শুধু অর্থনৈতিক ধ্বংসই আনেনি, বরং এর মাধ্যমে সমাজের গভীর অসাম্যতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতাও প্রকাশ পায়। অর্থনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এ ঘটনার জন্য ‘কাঠামোগত ঝুঁকি’র কথা বলেছিলেন, যেখানে করপোরেট বিনিয়োগকারীরা, বিশেষ করে লিজিংভিত্তিক হাউজিং মার্কেট, অত্যধিক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছিল। এ সময়, ব্যাংকিং সেক্টরে ‘মোরাল হ্যাজার্ড’—অর্থাৎ ঝুঁকি নেওয়ার পরিণামে দায়বদ্ধতার অভাবÑএকটি বড় ভূমিকা পালন করে, যা জনগণের ওপর আস্থাভঙ্গির পরিস্থিতি তৈরি করে। একদিকে, করপোরেট গোষ্ঠীর ‘রেন্ট সিকিং বিহ্যাভিয়ার’Ñঅর্থাৎ লাভের জন্য শুধু রেন্ট নেওয়ার প্রবণতা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ‘ফিনান্সিয়াল প্যাট্রিয়ার্কি’—অর্থাৎ আর্থিক অস্থিরতাÑএকটি বিশাল বৈপরীত্য সৃষ্টি করে এবং ট্র্যাজেডিটিকে একটি ‘ক্লাস ডিভাইড’ বা সামাজিক শ্রেণির বিভাজনে পরিণত করে, যেখানে সবচেয়ে দুর্বল গোষ্ঠীগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এভাবে, গ্রেট রিসেশনের মতো একটি ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যখন অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং প্রযুক্তি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর ছায়া ফেলতে শুরু করে, তখন এটি শুধু একটি আর্থিক সংকট নয়, বরং একটি করুণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি হয়ে ওঠে, যা দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্য একটি গভীর সংকেত দেয়।

গণতন্ত্রের ধারণাটি বোঝার জন্য হিস্টোরিসিটিতে ফিরে যেতে হয়। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছিলেন যে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকৃতি নির্ভর করে কে শাসন করছে এবং কাদের স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে, তার ওপর। তার মতে, যখন রাষ্ট্র ধনী ও ক্ষমতাবানদের স্বার্থের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ে, তখন গণতান্ত্রিক কাঠামো ধীরে ধীরে অলিগার্কিতে রূপ নিতে পারে।

গ্রিক পুরাণের একটি মাশহুর কাহিনি এখানে ইয়াদে আসল, রাজা মিদাস দেবতাদের কাছে এমন এক বর চেয়েছিলেন, যাতে তার স্পর্শে সবকিছু সোনায় পরিণত হয়। প্রথমে সেই ক্ষমতা তাকে অপরিসীম শক্তি ও সম্পদের প্রতীক মনে হয়েছিল, কিন্তু খুব দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন যে সেই সোনা তাকে খাদ্য, সম্পর্ক এবং মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। ক্ষমতার এই ট্র্যাজিক রূপকটি রাজনৈতিক অর্থনীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্যÑযখন সম্পদ ও ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ঘটে, তখন তা শেষ পর্যন্ত সমাজের স্বাভাবিক ভারসাম্যকে হালাক করতে পারে।

এই ধারণাটি আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাস শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। সংবিধানপ্রণেতারা একটি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যেখানে জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধিদের নির্বাচন করবে। কিন্তু অনেক ঐতিহাসিকই মনে করেন যে এই ব্যবস্থার ভেতরেই ক্ষমতার অসম বণ্টনের সম্ভাবনা নিহিত ছিল। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ অ্যালেক্সিস দা টাকভিল যখন উনিশ শতকে আমেরিকা ভ্রমণ করেন, তখন তিনি আমেরিকান গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হিসেবে নাগরিক সমাজ এবং স্থানীয় অংশগ্রহণের প্রশংসা করেন। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করেছিলেন যে অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পেলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই বিতর্ক আরো তীব্র হয়ে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানী সি. রাইট মিলস তার বিখ্যাত গ্রন্থ দি পাওয়ার এলিট-এ যুক্তি দেন যে আমেরিকার প্রকৃত ক্ষমতা একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত। তার মতে, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে তিনটি শক্তিশালী গোষ্ঠী-রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামরিক প্রতিষ্ঠান এবং বৃহৎ করপোরেট অর্থনৈতিক শক্তি। এই ত্রিমুখী ক্ষমতা কাঠামো গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বকে সীমিত করে দেয়। জনগণ ভোট দেয়, কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিনির্ধারণ অনেক সময় এই ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর স্বার্থ দ্বারা নির্ধারিত হয়।

অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নটি এই বিতর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফরাসি অর্থনীতিবিদ থমাস পিকেটি তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে যখন পুঁজির ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়, তখন রাজনৈতিক ক্ষমতাও ধনী গোষ্ঠীর দিকে সরে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনি প্রচারের বিপুল ব্যয়, করপোরেট লবিং এবং সুপার-প্যাক অর্থায়নের মতো প্রক্রিয়াগুলো রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর অর্থনৈতিক প্রভাবকে সুস্পষ্ট করে তোলে। ফলে প্রশ্ন ওঠেÑযদি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা মূলত অর্থনৈতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে সেই ব্যবস্থাকে কতটা গণতান্ত্রিক বলা যায়?

এ প্রসঙ্গে ‘প্লুটোক্রেসি’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। প্লুটোক্রেসি বলতে এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো বোঝায়, যেখানে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ মূলত ধনী শ্রেণির স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে করপোরেট লবিংয়ের পরিমাণ এবং নির্বাচনি অর্থায়নের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে বড় করপোরেশন এবং ধনী ব্যক্তিরা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

তবে সব রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এই বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত নন। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী রবার্ট ঢাল যুক্তি দিয়েছিলেন যে আমেরিকাকে ‘polyarchy’ হিসেবে বোঝা উচিত। তার মতে, এখানে বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে। এই ব্যবস্থায় কোনো একক গোষ্ঠী পুরো ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কিন্তু সমালোচকরা বলেন, এই প্রতিযোগিতা প্রকৃতপক্ষে সমান নয়; কারণ অর্থনৈতিক শক্তি এবং সংগঠনের ক্ষমতা সব গোষ্ঠীর মধ্যে সমানভাবে বিতরণ করা হয়নি।

এই বিতর্ক একবিংশ শতাব্দীতে নতুন মাত্রা পেয়েছে প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে। ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ডেটানিয়ন্ত্রণ আজকের রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো শুধু অর্থনৈতিক শক্তি নয়; তারা তথ্যপ্রবাহ, জনমত এবং সামাজিক যোগাযোগের ওপরও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।

এই বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমেরিকান গবেষক Shoshana Zuboff ‘সার্ভেইলেন্স ক্যাপিটালিজম’ ধারণাটি ব্যবহার করেন। তার মতে, আধুনিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করছে। এই তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা মানুষের আচরণ পূর্বানুমান করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা প্রভাবিতও করতে পারে। ফলে প্রযুক্তি করপোরেশনগুলো শুধু বাজার নয়, জনমত গঠনের ক্ষেত্রেও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে।

এই প্রেক্ষাপটে ‘টেকনো-প্লুটোক্রেসি’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এই ধারণা অনুযায়ী প্রযুক্তি করপোরেশন, ডেটা অবকাঠামো এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম রাজনৈতিক ক্ষমতার নতুন উৎসে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ মানে তথ্যের প্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ আর তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ মানে অনেক সময় জনমতের ওপর প্রভাব বিস্তার করা।

আদতে, প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতা মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ থেকে জন্ম নেয়। কিন্তু যখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ক্রমেই প্রশাসনিক অভিজাত, প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞ এবং করপোরেট শক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে, তখন নাগরিক অংশগ্রহণ দুর্বল হয়ে যায়।

এই বিশ্লেষণকে আরো তীব্রভাবে উপস্থাপন করেছেন মার্কিন বুদ্ধিজীবী নোম চমস্কি। তার মতে, আমেরিকার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় করপোরেট মিডিয়া এবং অর্থনৈতিক শক্তি জনমতকে প্রভাবিত করে এবং রাজনৈতিক বিতর্কের সীমা নির্ধারণ করে। ফলে নাগরিকরা যে তথ্য পায় এবং যে রাজনৈতিক বিকল্পগুলো দেখতে পায়, তা অনেক সময় করপোরেট কাঠামোর দ্বারা প্রভাবিত হয়।

আসলে ক্ষমতা শুধু অর্থনৈতিক বা সামরিক শক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; সাংস্কৃতিক এবং বৌদ্ধিক প্রভাবের মাধ্যমেও ক্ষমতা টিকে থাকে। আধুনিক মিডিয়া, শিক্ষাব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক শিল্প অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক এবং অনিবার্য হিসেবে উপস্থাপন করে।

এই প্রেক্ষাপটে অনেক গবেষক যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ‘করপোরেট লিবারাল ডেমোক্রেসি’ হিসেবে বর্ণনা করেনÑযেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান, কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং করপোরেট কাঠামো সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক শক্তিকেও উপেক্ষা করা যায় না। সেখানে এখনো মুক্ত নির্বাচন, স্বাধীন আদালত, শক্তিশালী নাগরিক সমাজ এবং তুলনামূলকভাবে স্বাধীন গণমাধ্যম রয়েছে। অর্থনীতিবিদ Joseph Stiglitz যুক্তি দেন যে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এখনো কার্যকর, কিন্তু ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা দুর্বল করে দিচ্ছে।

অতএব প্রশ্নটি সরল নয়। যুক্তরাষ্ট্রকে একক কোনো রাজনৈতিক শ্রেণিতে ফেলা কঠিন। এটি একই সঙ্গে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র, একটি শক্তিশালী করপোরেট অর্থনীতি এবং একটি প্রযুক্তিনির্ভর তথ্যব্যবস্থার সমন্বয়।

সবশেষে বলা যায়, আমেরিকার রাজনৈতিক বাস্তবতা এক জটিল দ্বৈততার ভেতর অবস্থান করছে। একদিকে রয়েছে গণতান্ত্রিক আদর্শ ও প্রতিষ্ঠান; অন্যদিকে রয়েছে করপোরেট পুঁজি, প্রযুক্তিগত শক্তি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রভাব। গ্রিক পুরাণের মিদাসের গল্প, রোমান প্রজাতন্ত্রের পতনের ইতিহাস এবং আধুনিক সাহিত্যের সতর্কতামূলক উপাখ্যানÑসবকিছু যেন আমাদের একই প্রশ্নের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়: ক্ষমতার প্রকৃত উৎস কোথায় এবং সেই ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থ রক্ষা করে?

এ কারণেই সমসাময়িক রাজনৈতিক তত্ত্বে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক সময় একটি ‘হাইব্রিড’ ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়Ñযেখানে গণতন্ত্র, প্লুটোক্রেসি এবং প্রযুক্তিনির্ভর করপোরেট শক্তি একই সঙ্গে সহাবস্থান করছে। ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন হলো, এই ভারসাম্য শেষ পর্যন্ত কোনদিকে ঝুঁকবেÑনাগরিক অংশগ্রহণের গণতান্ত্রিক আদর্শের দিকে, নাকি প্রযুক্তি ও করপোরেট ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত কাঠামোর দিকে।

যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী, কিন্তু ধনী করপোরেট গোষ্ঠীর প্রভাব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। মার্কিন গণতন্ত্রের বিকাশের ইতিহাসে করপোরেট শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাব একটি বিপজ্জনক ধারা তৈরি করেছে, যা গণতন্ত্রের ন্যায়পরায়ণতা কমিয়ে দিচ্ছে। সত্যিকারের গণতন্ত্রে মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণই মূল, কিন্তু যখন প্রযুক্তি আর ধনী করপোরেট গোষ্ঠী নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করে, তখন জনগণের বিকল্প বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

লেখক : সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি

যোগাযোগ : sahidkamrul25@gmail.com

হজ ব্যবস্থাপনায় সংস্কার

দলমুক্ত শিক্ষাঙ্গন থেকে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রের পথে

গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্গঠন : কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত

জনগণের নৈতিক পুনর্গঠন : উত্তরণের রূপরেখা

ইরান যুদ্ধে ডলার-ইউয়ান প্রতিযোগিতা

সংকটে বিশ্ব আর আমাদের প্রস্তুতি

ক্ষমতা বনাম জনগণ : ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

সিফফিনের প্রশ্ন—জুলাইয়ের উত্তর : পথের দ্বন্দ্ব

বিশ্বজুড়ে স্লোগান উঠুক ‘নো কিংস’

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন : সরকারের দায় ও বাস্তবতা