হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ছয় মাসের হিসাব-নিকাশ

আবদুল লতিফ মাসুম

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি পুরোনো পর্যবেক্ষণ হলো, কোনো শাসনের প্রকৃত চরিত্র তার দীর্ঘ মেয়াদে নয়, ধরা পড়ে যায় প্রথম কয়েকটি মাসের পদক্ষেপেই। অ্যারিস্টটল বলতেন, ‘Well begun is half done.’—সূচনা যথার্থ হলে অর্ধেক কাজ সারা। আধুনিক গণতন্ত্রে তাই ‘প্রথম একশ দিন’ কিংবা ‘প্রথম ছয় মাস’ নিছক পঞ্জিকার হিসাব নয়; এ হলো একটি সরকারের অগ্রাধিকার, সামর্থ্য আর নৈতিক দিকনির্দেশ যাচাইয়ের আয়না। ম্যাকিয়াভেলি তার ‘দ্য প্রিন্স’-এ মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, নতুন ক্ষমতাসীনের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় হলো সূচনাপর্ব—যখন পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা তখনো ক্ষুব্ধ, আর নতুন ব্যবস্থার সম্ভাব্য সুফলভোগীরা এখনো সংশয়ী। ঠিক এই দোলাচলের ভেতর দিয়েই আজ পথ হাঁটছে বাংলাদেশ। গণঅভ্যুত্থানের রক্তস্নাত পথ পেরিয়ে গঠিত একটি নির্বাচিত সরকারের প্রথম হিসাব-নিকাশ তাই স্বাভাবিকভাবেই বহন করে বাড়তি ভার—প্রত্যাশার ভার, ত্যাগের ভার ও ইতিহাসের ভার।

আজ ১৬ আগস্ট। এই দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হলো। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়ী হয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি এই সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ক্ষমতা গ্রহণের ভাষণেই প্রধানমন্ত্রী নিজের দল ও প্রশাসনের কর্মদক্ষতা মাপার জন্য এই ১৮০ দিনের সীমারেখা নিজ হাতে টেনে দিয়েছিলেন। নির্বাচনের আগে তার ঘোষণা ছিল—‘ধানের শীষের বিজয় হলে ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখ থেকে শুরু হবে জনগণের দিন।’ কাজেই আজকের হিসাব-নিকাশ কোনো বিরোধীর আরোপিত পরীক্ষা নয়; এ শাসকের নিজেরই বেঁধে দেওয়া মানদণ্ড। সরকার ইতোমধ্যে নিজস্ব মূল্যায়নে দাবি করছে, অধিকাংশ নির্বাচনি অঙ্গীকার ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ বাস্তবায়িত। এই নিবন্ধকারের বিবেচনায় সেই দাবিতে খানিক আত্মতুষ্টি আছে—বাস্তবে সরকার সেই মানদণ্ডে সম্পূর্ণ উত্তীর্ণও নয়, সম্পূর্ণ ব্যর্থও নয়; তবে পাল্লার কাঁটা এখনো আশার দিকেই সামান্য ঝুঁকে আছে।

প্রথমে প্রাপ্তির খতিয়ান। এই ছয় মাসের সবচেয়ে লক্ষণীয় পরিবর্তনটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। বাংলাদেশের ক্ষমতাচর্চা বরাবরই ব্যক্তিবন্দনার রোগে আক্রান্ত—সরকারি অফিস থেকে আদালত, বিদ্যালয়ের দেয়াল থেকে মহাসড়কের তোরণ, সর্বত্র নেতার প্রতিকৃতি। এই সরকার সেই সংস্কৃতিতে কাঁচি চালিয়েছে—সরকারি স্থাপনায় নেতাদের ছবি টাঙানোর প্রথা বন্ধ, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহারে নিরুৎসাহ, ভিআইপি সংস্কৃতির লাগাম টানা প্রভৃতি। প্রধানমন্ত্রী নিজে সরকারি গাড়ির বদলে ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়েন, কনভয়ের বহর কমিয়েছেন, এমনকি নিজ মূল বেতনের এক-দশমাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে দেন। ট্রাফিক সিগন্যালে সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে অপেক্ষা, শনিবারও দাপ্তরিক কাজ চালু রাখা, দেশে তৈরি যানবাহনে চড়ে তরুণ উদ্ভাবকদের উৎসাহ দেওয়া—এই খুচরো দৃষ্টান্তগুলোও প্রচলিত ধারার বাইরের এক নেতৃত্বেরই ইঙ্গিতবাহী। কেউ বলবেন, এসব নিছক প্রতীক; কিন্তু রাজনীতিতে প্রতীকের ভাষাও রাষ্ট্রভাষার সমান শক্তিশালী। দল ও রাষ্ট্রকে অভিন্ন সত্তা ভেবে বসার যে পুরোনো ফ্যাসিবাদী প্রবণতা এ দেশকে দেড় দশক গ্রাস করে ছিল, ব্যক্তিপূজার বিরুদ্ধে এই সচেতন সংযম তারই এক প্রতিষেধক।

নীতির ক্ষেত্রেও কিছু সাহসী পদক্ষেপ চোখে পড়ে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা সরাসরি সুবিধাভোগীর হাতে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা, ক্ষুদ্র কৃষকের কৃষিঋণ মওকুফ—এসব বিচ্ছিন্ন ভাতা-সংস্কৃতিকে একটি সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষার কাঠামোয় রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নারীশিক্ষার ঘোষণাটি। বেগম খালেদা জিয়া একদা মেয়েদের শিক্ষা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক করেছিলেন; সেই উত্তরাধিকার এগিয়ে নিয়ে বর্তমান সরকার স্নাতক তথা অনার্স পর্যায় পর্যন্ত নারীদের পড়ালেখা বিনা মূল্যে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভালো ফলকারীদের জন্য থাকছে বৃত্তির ব্যবস্থা। জনসংখ্যার অর্ধেক নারী—তাদের পিছিয়ে রেখে কোনো জাতি সামনে এগোতে পারে না। এই বিনিয়োগের ফল আগামীকালই দৃশ্যমান হবে না, কিন্তু এক প্রজন্ম পরে জাতি তার প্রতিদান গুনে গুনে বুঝে নেবে। দূরদর্শী রাষ্ট্র সেই বীজই বোনে, যার ছায়া সে নিজে দেখে যেতে পারে না। স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা ফেরাতে প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া—যাদের সিংহভাগই নারী—এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য কার্ড চালুর উদ্যোগও এই জনমুখী ধারারই অংশ। খাদ্যশস্যের সরকারি মজুত নিরাপদ সীমার ওপরে রাখা গেছে বলে সরকারের দাবি, যা দুর্যোগপ্রবণ এই দেশে খানিক স্বস্তির বার্তা বহন করে।

পররাষ্ট্রাঙ্গনেও সরকার তুলনামূলকভাবে পরিণত হাতের পরিচয় দিয়েছে। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এই নীতিকে কেবল স্লোগানে না রেখে বাস্তব ভারসাম্যে রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। জুনে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে কুড়িটির বেশি চুক্তি ও সমঝোতা, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার উন্মোচন ও সিন্ডিকেট ভাঙার উদ্যোগ, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের সক্রিয় কূটনৈতিক উপস্থিতি—বিশ্বমঞ্চে দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের এসব ইঙ্গিত তাৎপর্যপূর্ণ। সবচেয়ে দৃষ্টান্তমূলক ভারতনীতি। প্রতিবেশী পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে গিয়ে আত্মসমর্পণ নয়—পতিত স্বৈরাচারের প্রধান আশ্রয়দাতাকে ফিরিয়ে না দিলে প্রধানমন্ত্রী দিল্লি সফরে যাবেন না বলে যে অনড় অবস্থান, তা চাপের বিনিময়ে চাপ প্রয়োগের কূটনৈতিক কুশলতারই প্রকাশ। বহু বছর পর ভারতের চোখে চোখ রেখে জাতীয় মর্যাদার এই ভাষা এ দেশের মানুষ স্বস্তির সঙ্গে দেখছে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের সুরক্ষা ও নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার প্রশ্নটিও এবার যথাযথ গুরুত্ব পেয়েছে। বিরোধী পক্ষের সঙ্গেও সরকার মোটের ওপর সহনশীল আচরণের চেষ্টা করেছে, যদিও সেই ভারসাম্য সর্বত্র অটুট থাকেনি।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায়ও স্থিতিশীলতা ফেরানোর একটি সুস্পষ্ট চেষ্টা লক্ষণীয়। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিধ্বস্ত অর্থনীতি ও লুণ্ঠিত ব্যাংক খাতের বোঝা মাথায় নিয়ে সরকার ‘পুনরুদ্ধার-পুনর্গঠন-ত্বরান্বিতকরণ’—এই ত্রিমুখী কৌশল ঘোষণা করেছে; ব্যবসা শুরুর দীর্ঘসূত্রতা প্রায় এক বছর থেকে কমিয়ে পক্ষকালের মধ্যে নামিয়ে আনার উদ্যোগ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকের জন্য পুনঃঅর্থায়ন তহবিল, আর আগামী পাঁচ বছরে প্রায় এক কোটি কর্মসংস্থানের রোডম্যাপ—এসব অন্তত সদিচ্ছার পরিচয় বহন করে। বিদেশি বিনিয়োগেও কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলেছে। বিচারব্যবস্থায় দ্রুততার নজিরও চোখে পড়েছে। আলোচিত ধর্ষণ-হত্যা মামলার রায় কয়েক সপ্তাহেই সম্পন্ন হওয়া, ৪৫ বছর পলাতক থাকা এক আসামিকে গ্রেপ্তার—এই ‘দ্রুত বিচার’ ভুক্তভোগীর আস্থা কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়। তবে ঘোষণা আর রোডম্যাপ এক জিনিস, আর মূল্যস্ফীতি বাস্তবে সহনীয় স্তরে নামিয়ে আনা, কিংবা প্রতিশ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরীক্ষা, যার চূড়ান্ত রায় দিতে আরো সময় লাগবে।

কিন্তু কলাম কোনো সরকারি ইশতেহার নয় যে কেবল অর্জনের মালা গাঁথবে। প্রাপ্তির উল্টো পিঠে ঘাটতির খতিয়ানও সমান দীর্ঘ, কোথাও কোথাও আরো ভারী। কারণ একজন কলামিস্টের দায় স্তুতি নয়, নির্মোহ বিশ্লেষণ। এই ছয় মাসের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার নাম জ্বালানি। মার্চ-এপ্রিলের সংকট গড়িয়ে জুলাইয়ে গ্যাসের চাপ এমন তলানিতে ঠেকেছে যে একে একে বন্ধ হয়েছে শিল্পকারখানা, স্তব্ধ হয়েছে সার কারখানা ও সিএনজি স্টেশন, লোডশেডিং আবার ফিরিয়ে এনেছে অন্ধকার। কারখানার চাকা থেমে গেলে থামে উৎপাদন, থামে কর্মসংস্থান, চড়ে দ্রব্যমূল্য। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সরলতা যতই প্রশংসনীয় হোক, চুলা না জ্বলা গৃহিণীর কাছে কিংবা বেতন-বন্ধ শ্রমিকের কাছে সেই সরলতা কোনো সান্ত্বনা বয়ে আনে না। পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি খানিক নামলেও বাজারের থলেতে স্বস্তি ফেরেনি—নীতির কাগুজে সাফল্য আর হেঁশেলের বাস্তবতার এই ব্যবধানই সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি। নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে গতি বাড়ানোর কথা বহুবার শোনা গেলেও মাঠের পদক্ষেপ শ্লথ; আমদানিনির্ভরতার এই ফাঁদ থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে না পারলে শিল্পের চাকা বারবার হোঁচট খাবে।

দ্বিতীয় ঘাটতি আইনশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ দলীয় শৃঙ্খলায়। চাঁদাবাজি, দখলদারি, টেন্ডার-বাণিজ্য আর পেশিশক্তির প্রদর্শন—চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রক্ত ঝরেছিল, ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে দলের একাংশ যেন সেই একই পথেই পা বাড়িয়েছে। এখানে একটি ছোট্ট সংবাদের ভেতরেই লুকিয়ে আছে বড় সতর্কবার্তা। ঝালকাঠির ক্ষমতাসীন দলেরই সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম নিজ ফেসবুক পাতায় প্রকাশ্যে লিখেছেন—দলের নেতাকর্মীরা ছয় মাসে অনেক ‘খেয়েছেন’, এমনকি টাকার বিনিময়ে পতিত দলের লোকদের নিজ দলে ভিড়িয়েও ‘খাচ্ছেন’; তার আক্ষেপ, ‘মনে হচ্ছে আপনারা দলটাকেই খেয়ে ফেলবেন।’ শাসকদলেরই একজন জনপ্রতিনিধির কণ্ঠে এই আর্তনাদ নিছক ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, ইতিহাসের সাবধানবাণী। এই নিবন্ধকার সম্প্রতি এ কলামেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন—যেখানেই দল রাষ্ট্রকে গিলে ফেলেছে, সেখানেই সংবিধান থেকেছে কেবল কাগজে, নির্বাচন পরিণত হয়েছে নিছক আনুষ্ঠানিকতায়। প্রধানমন্ত্রী নিজেই দল ও সরকারকে রেললাইনের দুই পাতের মতো সমান্তরাল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন; কিন্তু কেন্দ্রের সেই সংযমের বার্তা তৃণমূলে পৌঁছাচ্ছে সামান্যই।

শুধু চাঁদাবাজিই নয়, দলীয়করণের পুরোনো ব্যাধিও নতুন মোড়কে ফিরছে। এক বছরের চুক্তিতে একাধিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদে এবং সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের প্রশাসক-আসনে দলীয় লোকদের বসানোর অভিযোগ ইতোমধ্যে সমালোচনার ঝড় তুলেছে; স্থানীয় সরকারের নির্দলীয় চরিত্র ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা প্রকট। আরো উদ্বেগজনক হলো দলের ভেতরের রক্তক্ষয়ী কোন্দল—আধিপত্য ও ভাগ-বাঁটোয়ারার দ্বন্দ্বে একই দলের কর্মীর হাতে কর্মীর প্রাণহানির খবরও শিরোনাম হয়েছে। যে দল ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে স্বৈরাচারকে হটিয়েছিল, ক্ষমতায় গিয়ে সেই দলেরই অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রাণঘাতী হয়ে উঠলে তা কেবল দলের নয়, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও অশনিসংকেত।

তৃতীয় অস্বস্তির জায়গা জুলাই সনদ। যে অভ্যুত্থানের কাঁধে ভর করে এই সরকারের অভ্যুদয়, সেই অভ্যুত্থানের অঙ্গীকারনামা বাস্তবায়নে শ্লথতা সরকারের সদিচ্ছাকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে; সনদ ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনা রাজনৈতিক আস্থার ভিতে চিড় ধরাচ্ছে। আর সবচেয়ে বেদনাদায়ক অভিযোগটি সংক্ষিপ্ত অথচ তীক্ষ্ণ—‘বদলায়নি কিছুই।’ শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে পুরোনো দলীয়করণের ছায়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে দলীয় দখল, প্রশাসনিক পদায়নে দলীয় সুপারিশের নিঃশব্দ প্রত্যাবর্তন—এসব দেখে সংস্কারকামী নাগরিকের মনে সংশয় জাগে, ‘রক্তের বিনিময়ে অর্জিত পরিবর্তন কি তবে কেবল মুখের বদল, ব্যবস্থার নয়?’ এই তীক্ষ্ণ প্রশ্নের জুতসই জবাব সরকারের হাতে এখনো নেই। সংস্কারের প্রতিশ্রুতি যত দীর্ঘায়িত হয়, প্রতিশ্রুতিভঙ্গের অভিযোগ তত ঘনীভূত হয়; আর সেই শূন্যতাতেই সুযোগ খোঁজে পরাজিত পতিত শক্তি।

তাহলে ছয় মাসের সারসংক্ষেপ কী দাঁড়ায়? এক অদ্ভুত স্ববিরোধ। ওপরে এক সংযমী, ভদ্র, ব্যক্তিপূজাবিমুখ নেতৃত্ব; নিচে সেই নেতৃত্বেরই দলীয় কর্মীদের একাংশের বেপরোয়া আচরণ। জনগণ কোনো সরকারকে প্রধানমন্ত্রীর সাদাসিধে জীবনযাপন দিয়ে মাপে না, মাপে থানার দারোগা, তহশিল অফিসের কেরানি আর মহল্লার দলীয় নেতার আচরণ দিয়ে। কাজেই আসল পরীক্ষা নীতিঘোষণায় নয়—পরীক্ষা হলো, ক্ষমতাসীন দল নিজের বিপথগামীদের রাশ টেনে ধরতে পারে কি না। প্রধানমন্ত্রীর সংযমের বার্তা যদি মন্ত্রণালয়ের সিঁড়ি বেয়ে থানার দরজা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের আঙিনা পর্যন্ত না পৌঁছায়, তবে সে বার্তা কেবল সংবাদ-সম্মেলনের অলংকার হয়েই থেকে যাবে। কেন্দ্র যদি নিজের ঘরেই সবচেয়ে কঠোর হতে পারে, তবেই এই ছয় মাসের ইতিবাচক ভিত্তি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারে রূপ নেবে; নইলে ভালো সূচনাও সেই পুরোনো বৃত্তেই হারিয়ে যাবে, যে বৃত্ত ভাঙতে এ জাতিকে বারবার চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, ক্ষমতাসীন প্রায় প্রতিটি দলই এই পরীক্ষায় বারবার হোঁচট খেয়েছে; ক্ষমতার মধু বরাবরই দল ও রাষ্ট্রের সীমারেখা গলিয়ে দিয়েছে।

শেষ কথা হলো, ভালো শুরু অর্ধেক কাজ বটে, কিন্তু বাকি অর্ধেকই সবচেয়ে দুরূহ। ইতিহাস বিপ্লবের রক্তকে যেমন স্বর্ণাক্ষরে মনে রাখে, তেমনি বিপ্লব-পরবর্তী প্রতিশ্রুতিভঙ্গকেও কখনো ক্ষমা করে না। জনগণ প্রতিশ্রুতির বাগ্মিতা শুনতে চায় না, তারা দেখতে চায় দৃশ্যমান ফল—চুলায় আগুন, বাজারে স্বস্তি, পথে নিরাপত্তা, প্রশাসনে ন্যায্যতা। দৃষ্টির আড়ালে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা তুষের আগুন সময়মতো নেভানো না গেলে একদিন তা দাউদাউ করে জ্বলে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নকেই ছাই-ভস্মে পরিণত করতে পারে। ‘সরকার বদলায়, প্রজাতন্ত্র বদলায় না’—এই সরল সত্য যেদিন ক্ষমতাসীনেরা অন্তরে ধারণ করবেন, রাষ্ট্রকে দলের সম্পত্তি নয় বরং সবার অভিভাবক হিসেবে গণ্য করবেন, সেদিনই কেবল এই যাত্রা সার্থক হবে। আগামী ছয় মাস তাই কেবল একটি সরকারের নয়, গোটা জাতিরও অগ্নিপরীক্ষা।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক

সরকার ও রাজনীতি বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই: ভারতের তরুণদের সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে ইসরাইলি হামলা, উত্তেজনা বাড়ার শঙ্কা

দুদকের নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের যোগদান

গাজায় ইসরাইলি অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন বাড়ানোর ইঙ্গিত কুশনারের

উচ্চ স্বরে গান বাজানোকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও মাদরাসাছাত্রদের সংঘর্ষ, আহত ৩০

পাঁচ বছরে রাবির চার শিক্ষক ও এক চিকিৎসক চাকরিচ্যুত

হামে মারা যাওয়া ৮২ শতাংশ শিশুই পর্যাপ্ত বুকের দুধ পায়নি

সরকারি স্কুলের দুরবস্থা নিয়ে নতুন আন্দোলনে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’

লুট হওয়া অস্ত্র-গুলিসহ ছোট নিশান গ্রেপ্তার

বিয়ে করলেন সেই প্রবাসী, খাবারে পেলেন আস্ত খাসি