হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়োগের সংস্কৃতি

সাবিনা আহমেদ

বাংলাদেশে ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানগুলোতে দলীয় লোক নিয়োগের যে ধারা চলে আসছে, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতি—যাকে ‘বিজয়ীর সবকিছু দখল’ নীতির ক্লাসিক প্রকাশ বলা চলে। অথচ এই প্রথা সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদ বা কোনো নির্দিষ্ট আইনের বাধ্যবাধকতা নয়। এটি নিছক ক্ষমতার অভ্যাস, যা ক্রমে প্রতিষ্ঠানকে দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করেছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে কোথাও বলা হয়নি যে ক্ষমতাসীন দলকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা বিটিভির মহাপরিচালক পদে দলীয় আনুগত্যসম্পন্ন ব্যক্তি বসাতে হবে। বরং আইনগুলো নির্বাহী বিভাগকে বিস্তৃত ক্ষমতা দিয়েছে—এবং সেই ক্ষমতাকেই দলীয় বিবেচনায় ব্যবহার করা হয়েছে বারবার। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের অর্ডিন্যান্সের আওতায় চলে, যেখানে সিনেট প্যানেলের সুপারিশ থাকার কথা। বাস্তবে সরকার প্রায়ই ‘বিশেষ পরিস্থিতি’র অজুহাতে সেই প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে যায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বিইউইটি) কিছুটা ভিন্ন। ১৯৬১ সালের অর্ডিন্যান্সের অধীনে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানে সংগঠিত ছাত্ররাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে সীমিত ছিল। ২০১৯ সালে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর কর্তৃপক্ষ সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করে এবং শিক্ষক রাজনীতিও সীমিত করা হয়। এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সংগঠিত নীল দল-সাদা দলের প্যানেল ব্যবস্থা নেই বা খুবই দুর্বল। তবু উপাচার্য নিয়োগের চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে থাকায় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া নিশ্চিত হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিটিভির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে দলীয় আনুগত্যকে যোগ্যতার ওপর স্থান দেওয়া হয়েছে বারবার।

এই সংস্কৃতির শিকড় গভীর। শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে স্বাধীনতার পরপরই প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ শুরু হয়। জাতীয়করণের সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং শিক্ষক সমাজে নীল দল ও গোলাপি দলের বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জিয়াউর রহমানের আমলে এই প্রবণতা আরো জোরদার হয়। তিনি রাষ্ট্রযন্ত্রে নিজস্ব সমর্থকদের স্থান করে দেন এবং বিএনপি গঠন করেন। তবে শিক্ষকদের সংগঠিত ‘সাদা দল’ তার আমলে গঠিত হয়নি; তা গড়ে ওঠে ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে, এরশাদের শাসনামলে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসার পর প্রথাটি পদ্ধতিগত রূপ নেয়। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে সাদা দলের শিক্ষকদের উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং প্যানেলকে শক্তিশালী করা হয়। এরপর ক্ষমতায় যারাই এসেছে—আওয়ামী লীগ বা বিএনপি—তারাই নিজেদের প্যানেলের লোকদের নিয়োগ দিয়েছে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে নীল দলের আধিপত্য চরমে ওঠে।

জুলাই ২০২৪-এর বিদ্রোহ এই পুরোনো সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক বড় গণরায় ছিল। জনগণ চেয়েছিল এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় হাতিয়ার নয়, বরং নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক হবে। জুলাই সনদ এবং পরবর্তী গণভোটের মাধ্যমে সংস্কারের যে ম্যান্ডেট পাওয়া গিয়েছিল, তার পূর্ণ ও দ্রুত বাস্তবায়নে ধীরগতি ও দ্বিধা দেখা যাচ্ছে। পুরোনো অভ্যাস নতুন ক্ষমতার ছায়ায় ফিরে আসছে। এতে বিদ্রোহের চেতনা ও জনপ্রত্যাশা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দলীয় নিয়োগ শুধু অনৈতিক নয়, দেশের জন্য ক্ষতিকর। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও শিক্ষার কেন্দ্র হওয়ার পরিবর্তে দলীয় রাজনীতির আখড়ায় পরিণত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে। মেধাবী ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিরা পদ থেকে বঞ্চিত হন। দুর্নীতি ও অদক্ষতা বাড়ে। মানুষ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় হাতিয়ার হিসেবে দেখতে শুরু করে এবং গণতন্ত্রের ওপর আস্থা হারায়। দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রশাসনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। জুলাই বিপ্লবের পর জনগণ যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য এই পুরোনো সংস্কৃতি ভাঙতেই হবে। না হলে বিপ্লবের অর্জন অর্থহীন হয়ে যাবে।

সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড ও কানাডা প্রমাণ করেছে যে প্রতিষ্ঠানকে দলীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখা সম্ভব—এবং তা দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য লাভজনক। সিঙ্গাপুরের সিভিল সার্ভিস বিশ্বের সেরা সিভিল সার্ভিসগুলোর মধ্যে অন্যতম। যুক্তরাজ্যে সরকার পরিবর্তন হলেও স্থায়ী ও নিরপেক্ষ প্রশাসন বহাল থাকে। নিউজিল্যান্ড ও কানাডায় স্বাধীন পাবলিক সার্ভিস কমিশন মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করে। বাংলাদেশেও সিভিল সার্ভিস কাঠামোগতভাবে স্থায়ী, কিন্তু বাস্তবে পদায়ন, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে দলীয় প্রভাব এখনো প্রবল।

বাংলাদেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়োগ কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নয়। এটি এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যা শেখ মুজিবের আমলে শুরু হয়, জিয়াউর রহমানের আমলে জোরদার হয়, ১৯৮০-এর দশকের শেষে সাদা দলের মাধ্যমে সংগঠিত হয় এবং ১৯৯১ সালের পর পদ্ধতিগত রূপ নিয়ে আজ পর্যন্ত চলছে। জুলাই ২০২৪-এর বিদ্রোহ এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জনগণের স্পষ্ট রায় ছিল। এখন প্রশ্ন হলোÑসেই রায়কে কি আমরা সম্মান করব, না কি পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যাব? মেধা ও নিরপেক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়ে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করা এখন আর বিলম্বের বিষয় নয়। শুধু তখনই প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থে জনগণের সেবায় নিয়োজিত হবে এবং দেশ এগিয়ে যাবে।

বিশ্ববাজারে বাড়ল তেলের দাম

চার বিভাগে ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি

ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের নীতিতে বড় পরিবর্তনের দাবি, বিচারের মুখোমুখি মেটা

হামাস নিরস্ত্র না হলে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না ইসরাইল

শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়া নরসিংদীর স্কুলকে শোকজ

লিড নিউজ: ঢাকায় ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট

রমজানে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আগাম প্রস্তুতি

‘ফ্রোজেন ৩’-এর প্রথম ঝলক প্রকাশ, রাজকীয় বিয়েতে নতুন খলনায়কের হানা

শিবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই যুবকের মৃত্যু

সংহতি যখন উগ্রতায় বদলে যায়