আগামী দিনের মাঠের কর্মসূচি বেগবান এবং তৃণমূলকে আরো সক্রিয় করার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এরই অংশ হিসেবে চলতি সপ্তাহে একযোগে ৪৫টি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে নতুন ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে সংগঠনটি। তবে সেসব কমিটি নিয়ে একের পর এক বিতর্ক সামনে আসছে। এগুলো নিয়ে সংগঠনের মধ্যে রীতিমতো তুলকালাম চলছে।
কমিটি নিয়ে গুরুতর অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা, অছাত্র ও বিবাহিতরা পদ পেয়েছেন। অন্যদিকে জুলাই বিপ্লবসহ বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে থাকা এবং ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের নিপীড়ন, হামলা-মামলায় জর্জরিত নেতাকর্মীদের বঞ্চনা সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের আন্তরিকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এ নিয়ে বিভিন্ন জেলায় সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। কোথাও সড়ক অবরোধ, কোথাও ঝাড়ু মিছিল করেছেন পদবঞ্চিতরা। ঘটেছে সংঘর্ষ ও আহত হওয়ার ঘটনা। সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে রাঙামাটিতে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। এছাড়া পদবঞ্চিতদের একটি বিরাট অংশ নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছে।
পদবঞ্চিত নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন পর কমিটি ঘোষণার ফলে যেখানে নেতাকর্মীদের মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে শুরু হয় তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্ক। পদবঞ্চিত ও প্রত্যাশিত পদ না পাওয়ায় অভিমানে দল ছাড়ার ঘোষণাও দিয়েছেন কেউ কেউ। শুধু তাই নয়, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ‘নিষ্ক্রিয়’ এবং সুবিধাবাদীদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ায় ছাত্রদলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্রে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অন্তর্কোন্দলে সংগঠনের ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ার অবস্থা।
পদবঞ্চিত নেতাদের দাবি, আগামী দিনে বিরোধী দলের মাঠের কর্মসূচি ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যেতে পারে। সেসব কর্মসূচিতে এ অভ্যন্তরীণ কোন্দল ছাত্রদলের শক্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রদলের কেন্দ্র ও তৃণমূলের একাধিক নেতা আমার দেশকে বলেছেন, আগামী দিনে ছাত্রদলের কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনা মাথায় রেখে এমন অনেককে কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে, যাদের রাজপথে কখনো দেখা যায়নি। আবার নিষিদ্ধ ও বৈরী ছাত্র সংগঠনের অনেককেও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—যাদের মাধ্যমে সংগঠনের শৃঙ্খলা হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর বিপরীতে রাজপথে ভূমিকা রাখা, জেল-জুলুমের শিকার অনেক নেতা পদবঞ্চিত হয়েছেন। কীসের ভিত্তিতে কমিটিতে এমন পদায়ন হয়েছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। সেই সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক, বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা।
তবে দীর্ঘদিন ধরে কমিটি পুনর্গঠনের দাবিতে সোচ্চার একটি অংশ ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা—কমিটি নিয়ে অসন্তোষের বিষয়টি দ্রুত সুরাহা না হলে সংগঠনের ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
একযোগে ৪৫ ইউনিটের কমিটি
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক (সহসভাপতি মর্যাদা) মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির দুই দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪৫টি ইউনিটের কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন। তার মধ্যে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে ২২ ইউনিটে। সেগুলো হচ্ছে- বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স), বরিশাল জেলা ও মহানগর ছাত্রদল, ভোলা, ঝালকাঠি, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী মহানগর, নওগাঁ, জয়পুরহাট, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, লক্ষ্মীপুর, কক্সবাজার, চাঁদপুর, যশোর, বান্দরবান, নোয়াখালী, রাঙামাটি, সুনামগঞ্জ, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ও কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্রদল।
এছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমসহ ২৩টি ইউনিটে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি কমিটিগুলো হলো— কুমিল্লা মহানগর, ময়মনসিংহ মহানগর, ময়মনসিংহ উত্তর ও দক্ষিণ জেলা, জামালপুর, নেত্রকোনা, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, খাগড়াছড়ি, কুমিল্লা মহানগর, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর মেডিকেল কলেজ, সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ।
ক্ষোভ ও বিতর্কের নেপথ্যে
বিভিন্ন ইউনিটে কমিটি ঘোষণার পরপরই প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং পরে রাজপথে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। একাধিক এলাকার নেতাদের অভিযোগ—অনেক ইউনিটে নিয়মিত ছাত্রদের বাদ দিয়ে অছাত্র, ব্যবসায়ী ও বিবাহিতদের পদ দেওয়া হয়েছে। পাশপাশি কোথাও কোথাও ত্যাগীরা অবমূল্যায়িত হয়েছেন। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কমিটি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কয়েকটি জেলা ও মহানগরে নবগঠিত কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদের নেতারা পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। অনেক জায়গায় পদবঞ্চিত কর্মীরা ঝাড়ু মিছিল ও কেন্দ্রীয় নেতাদের কুশপুতুল পুড়িয়েছেন। অনেকে ফেসবুক লাইভে অতীত আন্দোলন-সংগ্রামের বর্ণনা দিয়ে অঝোরে কেঁদেছেন। কেউ কেউ অভিমানে ছাত্রদলের রাজনীতি ছাড়ারও ঘোষণা দিয়েছেন।
কমিটি নিয়ে তুলকালাম
ছাত্রদল ঘোষিত জেলা ও মহানগর কমিটিতে ঠাঁই পেয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা, অছাত্র, ছাত্রশিবির, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে বিভিন্ন জেলায় সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। কোথাও সড়ক অবরোধ, কোথাও ঝাড়ু মিছিল করেছেন পদবঞ্চিতরা। বিক্ষোভ ও সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া সংঘর্ষ থামাতে ১৪৪ ধারা জারি করতে হয়েছে প্রশাসনকে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ
ঢাকা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ চার ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পদবঞ্চিতদের একটি বিরাট অংশ গত রোববার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন। তাদের অভিযোগ—কমিটিতে অছাত্র, ব্যবসায়ী এবং নব্যদেরও পদায়ন করা হয়েছে। টাকার বিনিময়ে পদ বিক্রি করা হয়েছে। সেখানে বিগত দিনের ত্যাগী, নির্যাতিত অনেককে বাদ দেওয়া হয়েছে।
রাঙামাটিতে সংঘর্ষ, ১৪৪ ধারা
জেলা ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাঙামাটিতে নবনির্বাচিত কমিটি ও পদবঞ্চিতদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ করেছেন পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। পরে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন।
নিজ জেলায় অবাঞ্ছিত ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক
সদ্য ঘোষিত নোয়াখালী জেলা ও পৌর ছাত্রদলের কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি গঠনের দাবিতে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও সমাবেশ করেছেন সংগঠনের বঞ্চিত নেতাকর্মীরা। এ সময় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করা হয়। সেই সঙ্গে তারা কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিনকে নোয়াখালীতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। বিক্ষোভকারীদের দাবি, নাছির ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে অনুগতদের দিয়ে কমিটি গঠন করেছেন। কমিটির ১৮ জনই বিবাহিত।
মমেকের কমিটিতে ৮ নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের (মমেক) ২২ সদস্যের কমিটিতে আটজন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পদধারী সাবেক নেতা রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন পদবঞ্চিতরা। তাদের অভিযোগ, মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের কমিটিতে দুঃসময়ের ত্যাগী কর্মীদের পদ না দেওয়া হলেও ছাত্রলীগের নেতাদের পদ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার ও বরিশালে সড়ক অবরোধ
দীর্ঘ দুই বছর পর ঘোষিত কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের আংশিক কমিটিতে যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের স্থান হয়নি দাবি করে রোববার রাতে শহরের প্রধান সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা। একই অভিযোগে সোমবার সন্ধ্যায় বরিশাল নগরীর আমতলার মোড়ে ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা।
ছাত্রদলের সদ্য ঘোষিত কমিটির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেসবুকের এক পোস্টে কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেলের অভিযোগ, তার সহযোদ্ধাদের দেখে দেখে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটাকে অপরাজনীতি আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, নিশ্চয়ই প্রকৃতি কাউকে ক্ষমা করে না।
এছাড়া ঢাকা মহানগর পূর্বের ৪০০ সদস্যের কমিটিতে জায়গা না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাবিবুল্লাহ বাহার ইউনিভার্সিটি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। দিনাজপুরেও একতরফা কমিটি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন পদবঞ্চিতরা। এছাড়া ভোলায় বিএনপি কর্মীদের ওপর হামলাকারী ছাত্রলীগ নেতার ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের পদ পাওয়া নিয়েও ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
সার্বিক বিষয়ে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির আমার দেশকে বলেন, জেলা কমিটিগুলো গঠনের ক্ষেত্রে শীর্ষ দুজন ছাড়া বাকিদের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিএনপি ও অন্যান্য সংগঠনের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়। বিগত দিনের কর্মকাণ্ড এবং আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা বিবেচনায় নিয়েই কমিটি ঘোষণা হয়েছে। তবে বাস্তবে সংগঠনের পদ এবং প্রত্যাশীদের সংখ্যার মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেককে কাঙ্ক্ষিত পদায়ন সম্ভব হয়নি। এ কারণে অনেকের সংক্ষুব্ধ হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা।
ময়মনসিংহ মেডিকেলের বিষয়ে নাছির বলেন, সেখানে ছাত্রলীগ গণহারে অনেককে পদ দিয়ে দিয়েছে। যে কারণে এমন অনেকের নাম এসেছে, যারা আসলে এ বিষয়ে জানেও না।
আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নাকচ করে ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক বলেন, এ রকম কোনো বিষয় নেই। আর এমন অভিযোগ কাম্য নয়।