হোম > রাজনীতি

বিএনপি-জামায়াতের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস

বগুড়ার সাত আসন

সবুর শাহ্ লোটাস, বগুড়া

রাত পোহালেই শুরু হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। বগুড়ার সাতটি আসনেই বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ভোটের লড়াই তীব্র হওয়ার আভাস মিলেছে। শুধু দল বা প্রতীক নয়- উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতাই এবারের ভোটের ফল নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এসব ইস্যু সামনে রেখেই প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের দুর্বলতা তুলে ধরে ভোটের মাঠে এগিয়ে থাকার চেষ্টা করেছেন বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী-সমর্থকরা। তারেক রহমানের আসনে ভোটের ব্যবধান একটু বেশি হলেও অন্য ছয়টি আসনে বিএনপি-জামায়াতের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

বগুড়ার সাতটি আসনে মোট ভোটার ২৯ লাখ ৮১ হাজার ৯৪০ জন। ১২ উপজেলা ও ১১ পৌরসভা নিয়ে গঠিত এসব আসনে ৯টি রাজনৈতিক দলের ৩৪ জন প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। সাতটি আসনই বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উপহার দিতে চায় দলটির নেতাকর্মীরা। জামায়াত বলছে, তারা সব আসনেই ভালো করবে। অন্তত দুটি আসনে তারা বিজয়ী হবে বলে আশা করছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বগুড়াকে ‘বিএনপির দুর্গ’ বলা হলেও শুধু তারেক রহমানের আসন ব্যতীত প্রতিটি আসনেই দলটিকে ঘাম ঝরাতে হচ্ছে। বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আসনটিতেও তিনি জীবিত থাকলে ধানের শীষের পক্ষে যে পরিমাণ ভোট কাস্টিং হতো, সেই পরিমাণ ভোট কাস্টিং হবে না ।

এদিকে, অল্পসংখ্যক কর্মী-সমর্থক নিয়ে ভোটের মাঠে থেকে আলোচনায় এসেছেন বগুড়ার একমাত্র নারী প্রার্থী দিলরুবা নূরী। তিনি বাসদ মনোনীত গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী। তার মূল স্লোগান- ‘কোটিপতি, দুর্বৃত্ত আর সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ক্লাব নয়, সংসদ হোক গণমানুষের অধিকার আদায়ের প্রতিষ্ঠান’।

অন্যদিকে, শেষ সময়ে এসে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে খোঁচা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বগুড়া-২ আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ। তিনি বিতর্কিত তিনটি নির্বাচনে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। তার মতে, তার নির্বাচনি এলাকায় সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ন্যূনতম পরিবেশ নেই। কয়েকটি অভিযোগ তুলে খোলা চিঠিতে লিখে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। যদিও নির্বাচনের শেষ সময়ে তার এমন পদক্ষেপকে নির্বাচন বিতর্কিত করার রাজনৈতিক কৌশল বলছেন অনেকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনে মূল ইস্যু নদীভাঙন ও কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য। বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের ভোটাররা উন্নয়ন কাজের হিসাব চাইছেন। তরুণরা দাবি করছেন কর্মসংস্থানের। বগুড়া-৩ (দুপচাঁচিয়া-আদমদীঘি) আসনে রেল যোগাযোগ, স্বাস্থ্যখাত এবং ক্রীড়া খাতে উন্নয়নসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টির দাবি রয়েছে ভোটারদের। বগুড়া- ৪, ৫ ও ৭ (শেরপুর-ধুনট-গাবতলী) আসনে কৃষিভিত্তিক উন্নয়ন, শিল্পপার্ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন গুরুত্ব পাচ্ছে। বগুড়া-৬ (সদর) আসনটি ভিআইপি আসন। কারণ বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই আসনটির প্রার্থী। প্রতিদ্বন্দ্বী সবাই যানজট নিরসন ও ড্রেনেজ সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছেন ভোটারদের।

ভোটারের মধ্যে এবার আর কেবল ‘মার্কা’ দেখে ভোট দেওয়ার প্রবণতা নেই বলে জানা গেছে। তরুণ ভোটাররা কর্মসংস্থান ও স্বচ্ছ রাজনীতির প্রত্যাশী। বগুড়া-৬ আসনের ভোটার ইউনুস শেখ রোহান বলেন, শুধু উন্নয়ন নয়, এর সঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থানও দরকার। দেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া। ঘরে ঘরে শিক্ষা পৌঁছাতে পারলে এবং শিক্ষিত মানুষকে কর্মঠ করে তুলতে পারলে দেশের উন্নয়ন আপনাতেই আসবে।

আরেক ভোটার তৃতীয় লিঙ্গের প্রীতি বলেন, সমাজে সম্মান নিয়ে জীবনযাপন করতে চাই। যারা বিভিন্ন আশ্বাস দিয়ে ভোট চেয়েছেন, তারা যেন শুধু আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকেন। তারা যেন আমাদের নিয়ে ভাবেন, কর্মের ব্যবস্থা করে দেন।

বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের তরুণ ভোটার তানভীর হোসেন বলেন, আমরা এমন প্রতিনিধি চাই, যিনি শুধু রাজনীতি করবেন না, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন।

বগুড়া-১ (সোনাতলা-সারিয়াকান্দি) আসনের তরুণ ভোটার নজরুল ইসলামের আশা, নির্বাচন-পরবর্তী গুম-খুন বন্ধ, ন্যায়বিচার নিশ্চিত, অর্থপাচার রোধ এবং চাকরিতে অনিয়ম বন্ধ হবে নতুন সরকার এলে। একই সঙ্গে তিনি চান, যে সরকারই আসুক, নতুন ফ্যাসিবাদ যেন না গড়ে ওঠে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বগুড়া জেলা সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম তুহিন বলেন, এবারের নির্বাচনি প্রতিযোগিতা বেশ হাড্ডাহাড্ডি হবে। বিএনপি একটি বা দুটি আসন হারিয়েও ফেলতে পারে। কারণ আগে বিএনপি ও জামায়াতের জোট থাকায় তাদের ভোটের ব্যবধান অনেক বেশি থাকত। বর্তমানে জামায়াত ও বিএনপি আলাদা হয়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আসনটি বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছিল। এই আসনে তিনিই নির্বাচন করতেন। খালেদা জিয়া জাতীয় পর্যায়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তার পরিবর্তে বর্তমানে যিনি প্রার্থী হয়েছেন, তিনি তো সেই মাপের প্রার্থী নন। ফলে জামায়াতের দিকে কিছু ভোট চলে যেতে পারে।

বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বলেন, গত ১৬ বছরে ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক কারণে বগুড়াকে বঞ্চিত করেছে। জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান হওয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে এখানে উন্নয়ন হয়নি। বগুড়ায় যত উন্নয়ন হয়েছে, তা বিএনপির আমলেই। বিএনপি ক্ষমতায় এলে আবারও উন্নয়ন হবে।

সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড রাষ্ট্রীয়ভাবে চালু করা হবে, যা রেশন কার্ডের মতো সবাই পাবে। এতে দলীয়করণের সুযোগ থাকবে না।

ভোটের পরিবেশ নিয়ে তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো থাকলেও কিছু জায়গায় আইডি কার্ডের ছবি তোলা ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহের ঘটনা ঘটছে, যা ভোট কেনাবেচার সন্দেহ তৈরি করছে।

বিএনপি এবার ২-৩টি আসন হারাবে বলে শোনা যাচ্ছেÑএমন ক্যালকুলেশনের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো বটবাহিনীর অপপ্রচার। ইনশাআল্লাহ, বগুড়ার জনগণ তাদের প্রিয় সন্তান তারেক রহমানকে সাতটি আসনই উপহার দেবে।

বগুড়া শহর জামায়াতের সেক্রেটারি আ স ম আব্দুল মালেক বলেন, তারা নির্বাচনে আশাবাদী এবং নেতাকর্মীরা সক্রিয়ভাবে মাঠে কাজ করছে। ভোটাররাও উৎসাহিত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বগুড়ায় বিভাগ বাস্তবায়ন, প্রথম শ্রেণির সিটি করপোরেশন গঠন, যানজট নিরসন, পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, সাতমাথায় ওভারব্রিজ এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য হিমাগার নির্মাণ জামায়াতের প্রধান পরিকল্পনা।

ভোটের পরিবেশ নিয়ে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি ভালো রয়েছে। বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। দীর্ঘদিন মানুষ ভোট দিতে না পারায় কিছুটা শঙ্কা থাকলেও এবার ভোটাররা কেন্দ্রে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

আইডি কার্ড বা মোবাইল নম্বর সংগ্রহের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব প্রতিপক্ষের অভিযোগ মাত্র। বগুড়ায় এমন কোনো ঘটনার অস্তিত্ব নেই।

সাংবাদিক ইউনিয়ন বগুড়ার সভাপতি গণেশ দাশ মনে করেন, বগুড়ায় একচেটিয়া সবাই বিএনপির লোক। সব আসনেই বিএনপি জয়ী হবে। তবে জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তারা রুট লেভেলে চলে গেছে। জামায়াতের মহিলা ভোটার অনেক বাড়ছে। সে ক্ষেত্রে জামায়াতের ভোট বাড়বে।

তিনি আরো বলেন, বগুড়া সদর আসনের বিষয়টা ভিন্ন। বগুড়া-১ আসনে সেদিন গিয়েছিলাম। ভোটারদের সঙ্গেও কথা বলেছি। সেখানে ভোটাররা বলেছে, গত ১৫-১৬ বছর তারা বিএনপির প্রার্থী কাজী রফিকুল ইসলামকে দেখেইনি। এরকম ঘটনাকে কেন্দ্র করেও কিন্তু বিএনপির ভোট কমবে বলে মনে করছি। তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপিই জিতবে। কারণ বিএনপির পরীক্ষিত এবং গ্রহণযোগ্যতা আছে এমন ব্যক্তিকেই প্রার্থী করা হয়েছে।

শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত জামায়াত জোটের প্রার্থীরা

জয়-পরাজয়ে মূল ফ্যাক্টর হবে নারী ভোটার ও হিন্দু সম্প্রদায়

জামায়াতের ভোট পাবে তো চরমোনাই পীর, নগরজুড়ে প্রশ্ন

সাংবাদিক আলী মামুদের মৃত্যুতে বিএনপি মিডিয়া সেলের শোক

ভোটারদের টাকা, নারীদের বিশেষ পোশাক, অবৈধ ব্যালট—ইসির নিষ্ক্রিয়তায় বিএনপির উদ্বেগ

জমিয়তের শীর্ষ নেতারা কে কোথায় ভোট দেবেন

ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত পরিবেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব: সাকি

ভোটকেন্দ্রে পর্যাপ্ত বডি ও সিসি ক্যামেরা স্থাপনের দাবি জামায়াতের

হাসনাতের সেই ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ প্রার্থী এবার বিএনপি থেকেও বহিষ্কার

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে বাংলাদেশ জিতে যাবে: জামায়াত আমির