মুজিবনগর সরকারের নিযুক্ত রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়া নিয়ে ওই সময় নানা প্রশ্নের জন্ম নিয়েছিলো। ‘রাজনৈতিক অঙ্গীকার’- সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলে বলা হলেও পেছনে হয়তো ভিন্ন কারণ ছিলো বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
স্বাধীনতার যে ঘোষণাপত্র ও মুজিব নগর সরকারের অধীনে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল তা উপেক্ষা করে রাতরাতি প্রধানমন্ত্রীর পদে বসার পেছনে শেখ মুজিবের ক্ষমতা ‘কুক্ষিগত’ করার লিপ্সার অভিযোগ উঠেছিল। অবশ্য কোন কোন বিশ্লেষক বলেছেন, দেশের প্রয়োজনে নিয়মতান্ত্রিকভাবেই তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছে। এদিকে রাতারাতি শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তন নিয়ে সাংবিধানিক শুদ্ধতারও প্রশ্ন উঠেছিল। পরে অবশ্য ভিন্ন একটি মামলার সূত্র ধরে শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তনকে বৈধ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ২৬ দিনের মাথায় ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে ব্রিটেন ও ভারত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফেরেন শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দুইদিনের মাথায় ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন তিনি। এর আগে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিব ১১ জানুয়ারি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রহিত করে অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারি করে রাষ্ট্রপতির শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তে মন্ত্রী পরিষদ শাসিত শাসন ব্যবস্থা চালু করেন। এরপর ১২ জানুয়ারি তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একইদিনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথও নেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ মুজিব শপথ নেয়ার আগে রাষ্ট্রপতির শূন্যপদে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী নিয়োগ দেয়া হয়। নতুন রাষ্ট্রপতিই শেখ মুজিবকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন ও শপথ পড়ান।
তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন আহমদ তাঁর ‘তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা’ বইয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনের ঘটনার কথা তুলে ধরেছেন, মুজিব কাকুর পাশেই আনন্দ-উদ্বেলিত আব্বু দাঁড়িয়ে রয়েছেন। হঠাৎ মুজিব কাকু আব্বুর কানের কাছে মুখ নামিয়ে বললেন, ‘তাজউদ্দীন, আমি কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হব।’
তাজউদ্দিন আহমদের কন্যার এই বক্তব্য খন্ডন করে লেখক, গবেষক আবুল কাশেম ফজলুল হক আমার দেশকে বলেন, শেখ মুজিবের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার এই ইচ্ছাপোষণকে তার একক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার একটি প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই। তিনি বলেন, এটা ঐহিতহাসিক সত্য তাজ উদ্দীন আহমদ সরাসরি যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি যদি স্বাধীন দেশেরও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতেন তাহলে তাকে অনেকে বঙ্গবন্ধুর সমকক্ষ ভাববার সুযোগ পেতেন। আমি মনে করি এই চিন্তা থেকে তাকে সরাতেই শেখ মুজিব শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন আনেন।
এর পেছনে যুক্তি তুলে ধরে এই গবেষক বলেন, ওই ঘটনায় তাজউদ্দীন আহমদ মর্মাহত হলেও নেতার প্রতি আনুগত্যের কারণে তার প্রকাশ পায়নি। বরং তিনি মুজিবের সিদ্ধান্ত বিনাবাক্যে মেনে নিয়েছিলেন। তাজউদ্দীনকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে মুজিব তার অর্থমন্ত্রী করলেও কোনোভাবেই সহযোগিতা করেননি। তার কাজে পদে পদে বাধা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এক পর্যায়ে তো সরকারের চাপে তাকে পদত্যাগই করতে হয়েছে।
মরহুম সাংবাদিক মিজানুর রহমান লিখেছেন- বাহাত্তরের ১১ জানুয়ারি আবু সাঈদ চৌধুরী, কামাল হোসেন ও আমীর-উল ইসলাম সাময়িক সংবিধানের খসড়া তৈরি করেছিলেন। এর আওতায় ১২ জানুয়ারির সকাল থেকে বদলটা ঘটেছিল এভাবে। রাষ্ট্রপতি মুজিব প্রথমে সায়েমকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেন। তাঁর মাধ্যমেই প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মুজিব শপথ নেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই পদত্যাগ করেন। তখন মন্ত্রিসভা রাষ্ট্রপতির শূন্যপদে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে নিয়োগ করেন। সায়েম ‘দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে জনাব চৌধুরীকে শপথ দেন। এরপর তাজউদ্দীন আহমদসহ মন্ত্রিপরিষদের সব সদস্য পদত্যাগ করেন। এটা ছিল যুদ্ধ-পরবর্তী একটি সাংবিধানিক রূপান্তরকরণ।
এদিকে মিজানুর রহমান তার লেখায় ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর প্রথমে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেয়ার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও গবেষক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেছেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিব ১২ জানুয়ারি শপথ নিয়েছেন বলে আলোচনা থাকলেও এর অকাট্য দলিল পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, আমরা রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার শপথ নেয়ার কথা বিভিন্ন সময় শুনে আসছি। কিন্তু আমি এর দালিলিক প্রমাণ পাইনি। তিনি এও প্রশ্ন তোলেন, তিনি যদি ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন তাহলে তার আগের দিন অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারি করেন কোন বিধান বলে?
রাষ্ট্রপতির পরিবর্তনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে মওদুদ আহমদ তাঁর ‘শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল’ বইয়ে লিখেছেন- প্রথম কারণটি ছিল রীতিমতো ঐতিহাসিক। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব নিয়ে আইনসভা বঙ্গদেশে প্রচলিত ছিল প্রায় ৫০ বছর যাবৎ। দ্বিতীয়ত, জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগ সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল।
সাময়িক সংবিধান আদেশ প্রণয়ন করে শেখ মুজিব এই ভেবে গর্ব অনুভব করেছিলেন যে তিনি জনগণের কাছে তাঁর প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপদানে সফলকাম হলেন। তৃতীয়ত, যুদ্ধকালীন সরকারের নেতৃত্বে অবস্থান করে তাজউদ্দীন আহমদ ভারতপন্থী চিহ্নিত হয়েছিলেন। তাই কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক কারণেই প্রচলিত সরকারব্যবস্থা পাল্টে নতুন ধরনের সরকার গঠন অধিকতর উত্তম হবে বলে শেখ মুজিব মনে করেছিলেন।
মওদুদের ভাষ্য যুক্তিগ্রাহ্য হলেও সাংবাদিক মিজানুর রহমান বলেছেন, ‘সংসদীয় পদ্ধতি প্রবর্তন সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়েছিল এক ব্যক্তির হাতেই। বাস্তবে সংসদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। মন্ত্রীরা নিজের কাজের জন্য জনগণের কাছে দায়িত্বশীল ছিলেন না। প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর পদ থেকে অপসারণের সব ধরনের অধিকার ছিল স্থগিত।’
মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল তার অরক্ষিত স্বাধীনতায় পরাধীনতা বইয়ে শেখ মুজিবের রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়া আবার ৭৪ এ বাকশাল গঠন করে আবারো রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেয়ার বিষয়টি ইঙ্গিত করে লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধের জনক হিসেবে পরিচিত শেখ মুজিব মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে অবগত থাকলেও সেই সেই চেতনায় তিনি পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাসী ছিলেন না বলেই ক্ষমতা লাভের পর তার মধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছে মারাত্মক দ্বন্দ্ব এবং অস্থিরতা। যার ফলে তুমি কখনো হয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবার কখনো দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাববুবুর রহমান আমার দেশকে বলেন, এটি প্রকাশ্য সত্য যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্যই শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির পদ থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তবে, এর পেছনে ভিন্ন কোন কারণ যে নেই সেটাও বলা মুশকিল। তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হলে তার ক্ষমতা ও গুরুত্ব দুটোই বেড়ে যেত হয়েতো সেটা শেখ মুজিবের প্যারালায় ভাবার সুযোগ তৈরি হতো। এ চিন্তা থেকে হয়তো তাকে সরাতেই বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। বাস্তবতা হচ্ছে এটা স্বীকার করার উপায় নাই সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন তাজউদ্দিন। সেটাকে হয়তো বঙ্গবন্ধুর এককে নেতৃত্বের পথে ঝুঁকির আশঙ্কা ছিলো।
লেখক গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ এক প্রতিক্রিয়া আমার দেশকে বলেছেন, আমার মনে হইনি বঙ্গবন্ধুর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পেছনে ভিন্ন কোন কারণ ছিলো। ৭০ এর নির্বাচনের ফলাফল বাস্তবায়ন হলেও বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হতেন। এছাড়া ১৯৭১ সালের জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারির দিকে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় বঙ্গবন্ধুকে দলের দল নেতা নির্বাচিত করা হয়েছিল। আর দল নেতা প্রধানমন্ত্রী হবেন এটাই স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, যুদ্ধকালীন একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে তাজউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি তখনও জানতেন বঙ্গবন্ধু আসলে তিনি এ পদে থাকতে পারবেন না। মুজিবনগর সরকার গঠনের পর বিভিন্ন কারণে সকলের কাছে তাজউদ্দিনের গ্রহণযোগ্যতা ছিলো না। স্বাধীনতার পর তিনি ২২ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। এরপর বঙ্গবন্ধু ফেরার আগপর্যন্ত যে সময়টা ছিলো দেশের জনগণ তার কোন কমান্ডই মানেনি। সারা দেশে একটি বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিলো। তখন বঙ্গবন্ধুর কোন বিকল্প ছিলো না।
অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, শেখ মুজিব চাইতেন এদেশের সব বড় কাজ তার হাত দিয়ে হবে। কিন্তু তাজউদ্দিনের আমমেদের নেতৃত্বে সফল মুক্তিযুদ্ধ দেখে শেখ সাহেব মর্মাহত হয়েছিলেন। যে কারণে তিনি তাজউদ্দিনকে প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পরে মন্ত্রীসভা থেকে সরিয়ে দেন। শেখ মুজিব ক্ষমতা কুক্ষিগত করতেই এটা করেছিলেন বলে আমার মনে হয়।