ইসলামী আন্দোলন
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্মমহাসচিব ও দলীয় মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে পেশকৃত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপরে তৎক্ষণাৎ দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বাজেটে এতো বেশি আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে যে, বাজেটকে আশাবাদে ভারাক্রান্ত বলে মনে হচ্ছে। এই বাজেট বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।
তবে বাজেট সুলিখিত। বাজেট বক্তৃতায় জুলাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে,“সমাজ-সংস্কৃতির বুনন, অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন”,জনমিতিকি লভ্যাংশ, দীর্ঘজীবিতা লভ্যাংশ ও গণতান্ত্রিক লভ্যাংশ এর কথা বলা হয়েছে। “স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ন্যায্যতা”কে মূল বিবেচনা করে বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো সাধুবাদযোগ্য।
কিন্তু ২০৩৪ এর মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির আশাবাদ, মূল্যস্ফিতি ৭.৫ এ নামিয়ে আনা, ৬.৫ প্রবৃদ্ধির লক্ষমাত্রা অর্জন করা বর্তমান বাস্তবতায় কঠিন হবে। বাজেট বক্তব্যে ভঙ্গুর অর্থনীতি, অস্থির বিশ্বরাজনীতির কথা আলোচনা করেও এমন আশাবাদ ব্যক্ত করা কেবলই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বলেই মনে হচ্ছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনে করে, জনগণকে অর্জনঅযোগ্য আশা না দিয়ে বাস্তবভিত্তিক লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা উচিৎ।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুখপাত্র বলেন, বাজেট বক্তৃতায় ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশে উন্নীত করা, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপি'র ২.৭ শতাংশে উন্নীত করা এবং মোট বিনিয়োগকে জিডিপি'র ৪০ শতাংশে উন্নীত করার যে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে তা চ্যালেঞ্জিং হবে।
বাজেট বক্তৃতায় ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি (Creative Economy), ক্রীড়া অর্থনীতি (Sports Economy), সবুজ অর্থনীতি (Green Economy) এবং সুনীল অর্থনীতি (Blue Economy)-এর মত খাতগুলোকে জাতীয় অর্থনীতির একেবারে কেন্দ্রে নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছি।
কর ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় আনার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি রোধ করা, রাজস্ব-জিডিপি'র অনুপাত বর্তমান ৮ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশে উন্নীত করা যা বর্তমানে ৬.৮ শতাংশ এবং যা আগামী ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে ৯.৬ শতাংশে উন্নত করার আশাবাদও চ্যালেঞ্জিং হবে। কারণ রাজস্ব আদায় পদ্ধতি ও চর্চা দুর্নীতি ও অদক্ষতায় নিমজ্জিত। এইখাতে সংস্কার আনতে অন্তর্বতী সরকারকে প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছিলো।
ঋণ নির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগ নির্ভর অর্থনীতির যে আশাবাদ তাকে সাধুবাদ জানাই কিন্তু নীতি দুর্বলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংস্কার নিয়ে সরকারের অনিহা বিনিয়োগ নির্ভর অর্থনীতির জন্য অদৃশ্য বাঁধা হয়ে আছে।
ব্যাংক ও আর্থিকখাতে যে প্রতিশ্রুতি ও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে তার বাস্তবতা নাই। বাংলাদেশ ব্যাংকে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে বসানো হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকে রাজনৈতিক কারণে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। খেলাপি ঋণ হ্রাস, ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিল ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহিতা জোরদার করার প্রতিশ্রুতির বরখেলাফ এখনই দৃশ্যমান।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্মমহাসচিব বলেন, বাজেট প্রণয়নের আগে কেবলই ব্যবসায়ী ও সমাজের ওপরের তলার অংশীজনদের সাথে আলাপ আলোচনা করা হয়। কিন্তু শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের সাথে আলাপ-আলোচনা করা হয় না। এবারও তার ব্যক্তিক্রম হয় নাই। আমরা বলবো, জনমানুষের সাথে কথা বলতে হবে, তাদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বাজেট তৈরি করতে হবে।
বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বৃদ্ধি ও পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনা, ব্যাংকিংখাত থেকে ঋণ গ্রহণ কমিয়ে আনার নীতিকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।
প্রস্তাবিত বাজেটে সম্পদ সঞ্চালনে শিক্ষা ও মানবসম্পদ, স্বাস্থ্য, দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, নারীর ক্ষমতায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো, স্থানীয় সরকার ও গ্রামীণ উন্নয়ন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে। আমরা এর বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চাই।
শিক্ষাখাতে আধুনিকায়ণ, বহুভাষা শিক্ষা, পেশা বাছাইয়ে বহুমূখিকরণ, মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ইউনিফর্ম, জুতা ও স্কুলব্যাগ সরবরাহ, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং বিশেষায়িত সহায়ক প্রযুক্তি ও শিক্ষাসামগ্রী প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। শক্তিশালী ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ ও ইন্টার্নশিপ সুবিধা এবং স্টার্ট-আপ চালুকরণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি করার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। এর সাথে শিক্ষাখাতে যে বরাদ্দ করা হয়েছে তা যথাযথভাবে কাজে লাগলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু অতিত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ পরিবারদের মাসিক ২০ হাজার টাকা এবং এ, বি ও সি ক্যাটাগরিতে আহতদের যথাক্রমে ২০, ১৫ ও ১০ হাজার টাকা মাসিক ভাতা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আমরা এটা আরো বৃদ্ধি করার দাবী জানাচ্ছি।
ধর্মীয় উপাসনালয়ের নেতৃত্বকে সম্মানি বাবদ ১,০৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটা আরো বৃদ্ধি করে দেশের সকল মসজিদের ইমামদের এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত করার দাবী জানাচ্ছি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুখপাত্র বলেন, করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো, কর্পোরেট কর না বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। বিদ্যমান করসীমার ভেতরে আদায়যোগ্য কর আদায় করতে পারলে এই বরাদ্দে কোন ঘাটতি তৈরি হবে না।
মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য, যেমন-ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ হতে হ্রাস করে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাকে স্বাগত জানাচ্ছি। একই সাথে স্বাস্থ্য খাতে কর ছাড়ের অংশ হিসেবে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফ করার প্রস্তাব একটি ভালো প্রস্তাব।
মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, এই সরকার সব অর্থেই একটি নতুন সরকার। তাদের প্রস্তাবিত বাজেটকে ইতিবাচকভাবে দেখা যায় তবে এই বাজেট বাস্তবায়নে তাদের ওপরে নজর রাখা হবে। আগামী অর্থ বছরে তাদের প্রকৃত দক্ষতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পাবে। বাজেট বিষয়ে আমরা বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবো।