বিরোধী দলের আন্দোলনে ভয় পেলে সরকারকে দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল পরিচালক মাওলানা আবদুল হালিম। তিনি বলেছেন, “ভয় পেলে দাবি মেনে নিন। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ঘোষণা দিন।”
শনিবার দুপুরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রংপুর মহানগর কার্যালয়ে ১১ দলীয় ঐক্য ঘোষিত ১৯ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-টু-রংপুর লংমার্চ বাস্তবায়নে রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল আয়োজিত প্রস্তুতি সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চের ছয় দফা দাবির মধ্যে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন একটি মৌলিক দাবি। সরকার রাষ্ট্রপতির আদেশ অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সংস্কার বাস্তবায়নে গণভোটের বিষয়টি সামনে এনেছিল। এর মধ্যে একটি বিষয় মেনে বিএনপি সরকার গঠন করেছে এবং সরকার পরিচালনা করছে। কিন্তু গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবি সরকার উপেক্ষা করছে। এতে জনগণকে অপমান করা হচ্ছে এবং জনগণের মধ্যে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ খোঁজার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার কথা বলা হলেও গণভোটের বিষয়টি মানা হচ্ছে না। এ দুটির মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। জনগণ এর সোজা-সাপটা জবাব চায়।
তিনি বলেন, জনগণ ভোট দিয়ে বিএনপিকে সরকার গঠনের সুযোগ দিয়েছে, আর জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে বিরোধী দলের অবস্থানে রয়েছে। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করা হলে জুলাই বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার যে প্রত্যাশা, সেটিও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথায় কথায় পল্টন ময়দান ও শাহবাগের কথা বলেন এবং এসব বক্তব্য তাচ্ছিল্যের সুরে দেওয়া হচ্ছে। অথচ তিনি ভিন্নভাবে, স্বাগত জানানোর মতো করেও কথা বলতে পারেন।
জুলাই যোদ্ধা হাসনাত আবদুল্লাহ এবং ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদকে ঘিরে দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করেন। তার ভাষ্য, শাহবাগ স্কয়ারের কারণেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একসময় পালিয়ে থাকতে হয়েছে বা পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে বড় বড় কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, একাত্তরে এ দেশের মানুষের রক্তের কারণে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সম্মান ও স্বাধীনতা জাতির অহংকার।
তবে তার দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন আধিপত্যবাদী শক্তির কবর রচনা করেছে। সেই চেতনাকে ধারণ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের সম্মান সমুন্নত রাখতে হবে। একই সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের গণরায় গ্রহণ করে এগিয়ে যেতে হবে।
রংপুরে নির্বাচনকালীন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করে রংপুরের সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, “দুটি ভোট দেবেন, একটি গণভোট আরেকটি তাঁর দলের ভোট।” এখন আবু সাঈদসহ শহীদদের সঙ্গে কেন প্রতারণা করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
দেশের জনজীবনের সংকট তুলে ধরে মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সার-সংকটের কারণে মানুষ উদ্বিগ্ন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতেও মানুষ দিশেহারা। অথচ বিএনপি তাদের ৩১ দফার মধ্যে স্থানীয় সরকারের নিরপেক্ষতার অঙ্গীকার করেছিল।
জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশের অর্ধশত জেলা পরিষদে বিএনপি দলীয় লোকদের প্রশাসক পদে বসানো হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে দেড় থেকে দুই লাখ ভোট কম পেয়ে পরাজিত হওয়া দলীয় লোকদের প্রশাসক পদে বসানোর মাধ্যমে জনগণের ভোটের সঙ্গে তামাশা করা হচ্ছে।
রংপুর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রংপুরের ছয়টি আসনে মানুষ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের ভোট দিয়েছে। অথচ সরকার জনগণের মতামতকে তোয়াক্কা না করে নির্বাচনে পরাজিত দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সিটি করপোরেশনে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, আগে এসব প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন স্তরের দপ্তরের সচিব কিংবা দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হতো। কিন্তু এখন দলের পরিচিত ও পদমর্যাদার লোকদের নিয়োগ দিয়ে সরকার ফ্যাসিস্ট সরকারের চেয়েও দলীয়করণের সংকীর্ণতার পরিচয় দিচ্ছে।
১৯ সেপ্টেম্বর ঘোষিত ঢাকা-টু-রংপুর লংমার্চের কর্মসূচি প্রসঙ্গে মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে রংপুর জেলা স্কুল পর্যন্ত মানবপ্রাচীর হবে, মানুষের আওয়াজ উঠবে এবং নেতৃবৃন্দের হুংকার আসবে।
তিনি বলেন, মানুষের কাছে যেতে হবে। পথসভা, মিছিল ও পিকেটিংয়ের মাধ্যমে গণভোটের গণরায় মেনে নেওয়ার দাবি তুলে ধরতে হবে। শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনে রংপুর ও দিনাজপুরের দায়িত্বশীলদের ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, “ইনশাআল্লাহ, গণভোটের গণরায় মেনে নিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে সরকার বাধ্য হবে।”
প্রস্তুতি সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের সহকারী পরিচালক অধ্যক্ষ মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর মহানগর আমির উপাধ্যক্ষ মাওলানা এটিএম আজম খান, রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল টিম সদস্য মাওলানা আব্দুল হাকিম, রংপুর মহানগর সেক্রেটারি কে এম আনোয়ারুল হক কাজল, রংপুর জেলা সেক্রেটারি মাওলানা এনামুল হক, নীলফামারী জেলা আমির মাওলানা আব্দুস সাত্তার এমপি ও সেক্রেটারি মাওলানা আনতাজুল ইসলাম, পঞ্চগড় জেলা আমির মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন ও সেক্রেটারি মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন, ঠাকুরগাঁও জেলা আমির অধ্যাপক বেলাল উদ্দিন প্রধান ও সেক্রেটারি মোহাম্মদ আলমগীর, দিনাজপুর জেলা আমির অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আনিছুর রহমান ও সেক্রেটারি মুহাদ্দিস ডক্টর এনামুল হক, গাইবান্ধা জেলা আমির মোহাম্মদ আব্দুল করিম সরকার এমপি ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি সৈয়দ রোকনুজ্জামান, কুড়িগ্রাম জেলা আমির অধ্যাপক আজিজুর রহমান সরকার ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি আব্দুল হামিদ মিয়া, লালমনিরহাট জেলা আমির এডভোকেট আবু তাহের, সেক্রেটারি এডভোকেট ফিরোজ হায়দার লাভলু ও সাবেক জেলা আমির আব্দুল বাতেন এবং শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের রংপুর বিভাগীয় সহকারী পরিচালক অধ্যাপক আবুল হাশেম বাদল।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও রংপুর মহানগর সভাপতি মো. আনিছুর রহমান, সেক্রেটারি মো. সাজ্জাদ হোসাঈন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি আব্দুর রাকিব মুরাদ, সেক্রেটারি ইমরান খান, রংপুর জেলা সভাপতি মো. হামিদুর রহমান, সেক্রেটারি মো. হানিফুর রহমান স্বাধীন, গাইবান্ধা জেলা সভাপতি ইউসুফ আল কারজাভি, সেক্রেটারি ফাহিম মন্ডলসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।