বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আতিকুর রহমান বলেছেন, শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট করে শ্রমিকের পকেট কাটার অপচেষ্টা করছে একটি কুচক্রী মহল। নতুন বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ এ অপচেষ্টা সফল হতে দেবে না।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের শ্রমিকরা সেখানে গিয়ে কাজ করে দেশের জন্য রেমিট্যান্স আহরণ করবেন। কিন্তু বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে দলীয়করণ ও সিন্ডিকেটের কারণে এই শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের ৩১ মে বিভিন্ন সিন্ডিকেটের কারণে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১৭ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়া যেতে পারেননি।
মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মালয়েশিয়ার বাংলাদেশের শ্রমবাজার পুনরায় সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত বন্ধ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্পকারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাই রোধ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ এবং সব পেশার শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি অবিলম্বে পুনর্নির্ধারণের দাবিতে এ মানববন্ধনের আয়োজন করে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন।
আতিকুর রহমান আরও বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া সফরের মাধ্যমে শ্রমবাজারটি পুনরায় খোলার উদ্যোগকে তারা নিঃসন্দেহে স্বাগত জানান। কিন্তু সম্ভাবনাময় এই শ্রমবাজার আবারও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সরকার মাত্র ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কাজের সুযোগ দিয়ে আবারও পুরোনো পথে হাঁটছে।
তিনি বলেন, সিন্ডিকেটের কারণে মালয়েশিয়া যেতে একজন শ্রমিকের ওপর ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে। এতে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হবেন।
দেশের শিল্পখাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রসঙ্গ তুলে আতিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট চলছে। এর কারণে ইতোমধ্যে তিন শতাধিক কলকারখানা বন্ধ হয়েছে এবং সারাদেশে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বেকার হয়েছেন। বিভিন্ন কোম্পানি থেকে একের পর এক শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে। গত ছয় মাসে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন।
তিনি বলেন, সরকারকে নতুন করে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতির আগে বিদ্যমান চাকরি রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা যে চাকরিতে আছি, যেখানে আছি, সেখানকার গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিরসন করে চাকরির নিশ্চয়তা দিন। না হলে চাকরি ছেড়ে বাসায় গিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে অভিশপ্ত জীবনযাপন করতে হবে। শ্রমিকরা কখনো তা চায় না।
সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আতিকুর রহমান বলেন, গত ছয় মাসে রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটেনি। বরং প্রতিটি সেক্টরে অনভিজ্ঞতা ও দুর্বলতার প্রকাশ ঘটছে। গত চার-পাঁচ মাসে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে পারছে না। বাজারে যে আগুন লেগেছে, সেই আগুন সরকারকেই নেভাতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের চা শ্রমিকরা দৈনিক মাত্র ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন করছেন। তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বাংলাদেশের চা-বাগানগুলোতে এখনও দাসপ্রথার মতো পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সেখানে মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের যথেষ্ট অভাব রয়েছে।
এ অবস্থায় সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজপথে নেমে এলে আপনারা পালানোর রাস্তা পাবেন না।
অবিলম্বে পোশাকশিল্পসহ সব খাতের শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আতিকুর রহমান বলেন, জাতীয় মজুরি বোর্ড ও পেশাভিত্তিক মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে। শ্রমজীবী মানুষ যেন দুবেলা দুমুঠো খাবার খেতে পারে, সেই ব্যবস্থা সরকারকে করতেই হবে।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের সামনে সুন্দর সুন্দর ছবক দিলে সাধারণ মানুষ আর তা শুনতে চায় না। বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ করুন, বিদ্যুৎ দিন, তেল ও গ্যাসের দাম কমান, মজুরি বোর্ড গঠন করুন। এসব করতে না পারলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আপনাদের আর সময় দেবে না।
কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লসকর মো. তসলিমের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি কবির আহমদ, মজিবুর রহমান ভুঁইয়া, সহ-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসাইন, আব্দুস সালাম, এস এম লুৎফর রহমান, মাওলানা মহিবুল্লাহসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।
মানববন্ধনে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষসহ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় ও শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।