হোম > রাজনীতি > জামায়াত

নির্বাচনি প্রচারে নারীদের ওপর হামলার ১১ সচিত্র তথ্য প্রকাশ জামায়াতের

স্টাফ রিপোর্টার

দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনি প্রচারের সময় দলের নারী কর্মীদের হামলা, হেনস্থা ও হুঁমকির অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। এ বিষয়ে ১১টি ঘটনার সচিত্র তথ্য প্রকাশ করেছে দলটি। মঙ্গলবার জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তথ্যগুলোর ভিডিও প্রদর্শন করা হয়।

এ সময় জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমরা লক্ষ্য করেছি, দেশের বিভিন্ন জেলায় নির্বাচন কর্মকাণ্ডে যুক্ত নারীরা, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর নারীকর্মীরা ধারাবাহিকভাবে হামলা, মারধর, অপমান, ভয়ভীতি ও সামাজিক লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। এটি নারীর নিরাপত্তা নিয়ে সৃষ্ট একটি গভীর জাতীয় উদ্বেগের বিষয়।

আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, আজ যাদের ওপর হামলা হচ্ছে তারা এক দলের নারী; আগামীকাল তারা অন্য যেকোনো দলের হতে পারে, হতে পারে আমাদেরই মেয়ে, বোন বা ছাত্রী। এই সহিংসতা থামানো না গেলে রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সব নারীকে সরিয়ে দেওয়ার একটি ভয়ংকর প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা কারোরই কাম্য নয়। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এগুলো পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হচ্ছে।

সচিত্র তথ্য প্রকাশ করে বলা হয়-২৫ জানুয়ারি দুপুরে যশোর-২ আসনে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোটের প্রচারণাকালে জামায়াতের নারী নেত্রীদের ওপর যুবদলের হামলা ও হেনস্তার ঘটনা ঘটে। এতে ২ জন নারী আহত হন। ঝিকরগাছা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কীর্তিপুর এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা মহিলা নেত্রীরা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট চাইতে গেলে উপজেলা যুবদলের সভাপতি আরাফাত রহমান কল্লোলের নেতৃত্বে সবুজ, আহনাত, সোহাগসহ ১৫/২০ জনের একটি দল জামায়াতের মহিলা কর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা করে আহত করে এবং মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ভাঙচুর করে। ওই সময় তারা ভ্যানিটি ব্যাগও ছিনিয়ে নেয়।

চুয়াডাঙ্গায় ২৫ জানুয়ারি রোববার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেলের পক্ষে জামায়াতে ইসলামী ও তার অঙ্গসংগঠনের নারী নেতাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইছিলেন। এ সময় এলাকার বিএনপির কয়েকজন নারী কর্মী প্রথমে তাদের বাধা দেন এবং হেনস্তা করেন। পরে বিএনপির পুরুষ কর্মীরাও ঘটনাস্থলে এসে জামায়াতের নারী কর্মীদের গ্রাম থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় দাওয়াতি কার্যক্রমে অংশ নেওয়া নারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও মারধরের অভিযোগ করেছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এই ঘটনায় জামায়াতের ৫ জন নারী আহত হন।

কুমিল্লায় নির্বাচনি প্রচারণার সময় জামায়াতের নারী কর্মীদের প্রকাশ্যে ঘিরে ধরে হেনস্তা করা হয়। নারীদের হিজাব-নিকাব খুলে নেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, নারীদের কথা বলতে বাধা দেওয়া হচ্ছে, অপমান করা হচ্ছে, চলাফেরায় বিঘ্ন সৃষ্টি করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের গোপালপুরে বিএনপি কর্মীদের দ্বারা জামায়াতের নারীকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। নারীদের প্রচারণা কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হয়, ধাক্কা দেওয়া হয়, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।

লালমনিরহাটে জামায়াতের নারী কর্মীদের হিজাব নিয়ে টানাহেঁচড়া করে এবং হিজাব খুলে নেয় বিএনপি কর্মীরা। তারা বলে, ভোট চাইতে নয় বরং চুরির জন্য এসেছে নাকি জামায়াত কর্মীরা। ঘটনার ভিডিও ধারণ করলে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। জামায়াতের পুরুষ সদস্যদের বিএনপি নেতাদের নেতৃত্বে রুমে ঢুকিয়ে ব্যাপক মারধর করা হয়। ৪টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়, ১টি ল্যাপটপ ভাঙচুর করা হয়। প্রশাসনের সামনে এ ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল।

২৪ জানুয়ারি ঝিনাইদহ সদরের কালিচরণপুর ইউনিয়নের উত্তর কাস্টসাগরা গ্রামে নারী কর্মীদের হেনস্থার ঘটনা ঘটে।

ভোলায় লালমোহনের রামগঞ্জ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে জামায়াতের নারী কর্মীরা গণভোট ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশ নিতে ইউনুছ পাটওয়ারীর বাড়িতে যান। এ সময় স্থানীয় নুরনবীর ছেলে রুবেল (২৮) তাদের সঙ্গে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করেন। বিষয়টি জানতে পেরে এক নারী কর্মীর স্বামী ও রায়চাঁদ বাজারের ব্যবসায়ী মো. জসিম উদ্দিন মুঠোফোনে রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকেও গালিগালাজ করা হয়। পরে রুবেল জসিম উদ্দিনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তার ওপর হামলা চালায়। সন্ধ্যার দিকে বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মী বাজার এলাকায় জড়ো হন। একপর্যায়ে ১০ দলীয় জোটের কর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে বিডিপির (বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি) অন্তত ১৫ জন নেতা-কর্মী গুরুতর আহত হয়ে লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন।

অপরদিকে ভোলার চরফ্যাশনে পছন্দের প্রার্থীর বিপক্ষে নির্বাচনি প্রচারণায় নামায় হাজেরা বেগম নামে এক নারীকে মারধর করে গুরুতর আহত করেন স্থানীয় এক যুবদল নেতা শাহাবুদ্দিন। এ সময় তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে ওই নারীর ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকেও নির্মমভাবে মারধর ও পেটে লাথি মারা হয়। একপর্যায়ে শাহাবুদ্দিন ওই নারীর কান ছিঁড়ে স্বর্ণালংকার নিয়ে যান এবং কাঠ দিয়ে মাথায় আঘাত করলে তিনি ঘটনাস্থলেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে চিকিৎসক তার মাথায় ছয়টি সেলাই এবং ছিঁড়ে যাওয়া কানে দুটি সেলাই দেন।

জামায়াত নারীরা যাতে নির্বাচনি কাজ না করতে পারে, সে জন্য হুমকি দিয়েছেন বিএনপি নেত্রী ও বিএনপি এমপি প্রার্থীর স্ত্রী এবং বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট সৈয়দা আশিফা আশরাফি পাপিয়া। পাপিয়া তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘মা-বোনদের উদ্দেশে বলছি, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামের ছাত্রীসংস্থার কর্মীরা কেউ বাসায় গেলে ৯৯৯-এ কল দিয়ে ধরিয়ে দেবেন, যাতে বয়ান দেওয়ার আর সুযোগ না পান।’

মেহেরপুরের গহরপুর গ্রামে জামায়াতের নারী কর্মীদের হেনস্তার প্রতিবাদ করায় তিনজনকে মারধর করা হয়। ভোট চাইতে গেলে স্থানীয় বিএনপি নেতা আলেহিম ও হায়দারের নেতৃত্বে এই হামলা ও মারধর করা হয়। এর আগেও একবার তারা নির্বাচনি কাজে বাধা দিয়েছিল।

কেরানীগঞ্জে বিএনপি কর্মীদের হাতে জামায়াতের নারীকর্মীরা মারধরের শিকার হন। জামায়াতের এমপি প্রার্থীর পক্ষে নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্বাচনি প্রচারপত্র বিলি করছিলেন। তখন আরেক নারী কর্মী মুঠোফোনে দৃশ্য ধারণ করছিলেন। ঠিক সে সময় বিএনপির কিছু নেতা-কর্মী ভিডিও ধারণকারীর মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তখন অন্য নারী কর্মীরা বাধা দিলে তাঁদের ভ্যানিটি ব্যাগ ও ওড়না টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়। একপর্যায়ে বিএনপির নেতা-কর্মীরা জামায়াতের নারী কর্মীদের লাথি ও কিল-ঘুষি দেন। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করার পর ওসি সাহেব ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক সংঘর্ষে নারী কর্মীরা আহত হয়েছেন, বাধার মুখে পড়েছেন, কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেননি বলে জানান ডা. তাহের।

তিনি বলেন, আমরা আজ রাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে বলতে চাই- নারীর ওপর রাজনৈতিক সহিংসতা কোনো দলীয় ইস্যু নয়। এটি একটি জাতীয় মানবাধিকার সংকট। এটি সংবিধানের ২৭, ২৮ ও ৩১ অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন। এটি নারী উন্নয়ন নীতির সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রকাশ্য বিশ্বাসঘাতকতা।

ডা. তাহের বলেন, আমাদের কয়েকটি দাবি এখানে তুলে ধরা হলো—

১. নারীদের ওপর সংঘটিত সব হামলার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে;

২. দোষীদের দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে;

৩. নির্বাচনি কর্মসূচিতে নারীদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে;

৪. নারীর বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য ও উসকানিমূলক প্রচারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে;

৫. নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে নারীর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে;

৬. গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজকে দলনিরপেক্ষভাবে নারীর পক্ষে দাঁড়াতে হবে।

উল্লেখ্য, নির্বাচনি প্রচারে নারী কর্মীদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হেনস্থার প্রতিবাদে আগামী শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নারী সমাবেশ ডেকেছে জামায়াতের মহিলা বিভাগ। প্রথমবারের মত এ ধরণের সমাবেশ করতে যাচ্ছে দলটি।

বৈষম্যবিহীন মানবিক রাষ্ট্র পরিচালনাই জামায়াতের মূল লক্ষ্য

বিজয়ী হলে প্রতিশোধ নেব না, সবাইকে ক্ষমা করা হবে: জামায়াত আমির

প্রথমবারের মতো সমাবেশ করবে জামায়াতের মহিলা বিভাগ

মোস্তাফিজকে খেলতে না দেওয়া চরম অপমান: জামায়াত আমির

বিভিন্ন জায়গার ডিসি-এসপিরা পক্ষপাতিত্ব করছেন: ডা. তাহের

নির্বাচনি প্রচারে হামলা, মহাসমাবেশের ঘোষণা মহিলা জামায়াতের

আগামীর রাজনীতি কোনো দলের নয়, জনগণের রাজনীতি হতে হবে

আজ ৪ জেলায় জনসভায় যোগ দেবেন জামায়াত আমির

চাঁদা না দেওয়ায় সাংবাদিকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জামায়াতের

‘দুর্নীতিবাজদের পেটে হাত ঢুকিয়ে কালো টাকা বের করে আনা হবে’