সরকারের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ দাবি
ঈদের ছুটিতে দলীয় বিবেচনায় দেশের আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য পরিবর্তনের বিষয়টি অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে তিনি বলেন, পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে যখন দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কার্যত বন্ধ; শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় অতিবাহিত করছেন; এমন এক সময়ে গত ১৬ মার্চ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হঠাৎ ঘোষণা দিয়ে দেশের আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পরিবর্তন করেছেন। দলীয় বিবেচনায় এই পদক্ষেপ দেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে এক অস্বাভাবিক, নজিরবিহীন ও গভীরভাবে উদ্বেগজনক ঘটনা। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ জাতির বিবেক গঠনের কেন্দ্র। অথচ উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং সমগ্র উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে নষ্ট করে। ইতোমধ্যেই দেশের মানুষ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর সন্দেহ ও বিরূপ ধারণা পোষণ করতে শুরু করেছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধীদল একে অপরের পরিপূরক ভূমিকা পালন করে। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মান যদি অবনতির দিকে যায়, শিক্ষার্থীরা যদি মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়; তবে তার দায় কেবল সরকারের নয়, বরং জাতীয় সংসদেরও। জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আমরা মনে করি, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার কঠোর অনুসরণ অপরিহার্য। আমরা দৃঢ়ভাবে জানতে চাই, কোন যুক্তিতে এবং কী অপরাধের ভিত্তিতে পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যগণকে অপসারণ করা হলো? যেখানে তুলনামূলক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে নিয়োগ পাওয়া আটজন উপাচার্যের মধ্যে সাতজনই শিক্ষা এবং গবেষণায় পূর্ববর্তীদের চেয়ে পিছিয়ে এবং নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যগণের প্রায় সকলেই সরকারি দল এবং তার অঙ্গসংগঠনের পদধারী। এমন বাস্তবতায় তড়িঘড়ি করে উপাচার্যদের অপসারণের বিষয়ে সরকারকে জাতির সামনে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো পরীক্ষাগার বা দলীয় ব্যক্তিদের পদায়নের ক্ষেত্র নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের কেন্দ্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো একক দলের অনুসারীরা নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের নাগরিকদের সন্তানরা অধ্যয়ন করে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, দায়িত্বরত উপাচার্যদের সঙ্গে কোনো ধরনের পূর্ব-আলোচনা, মূল্যায়ন বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে হঠাৎ ঘোষণা এবং পরবর্তী প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের অপসারণ করা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক প্রশাসনিক রীতি ও শিষ্টাচারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একজন শিক্ষক তার পেশাজীবনের সর্বোচ্চ সম্মান হিসেবে উপাচার্যের দায়িত্ব লাভ করেন। সেই সম্মানকে উপেক্ষা করে এভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার ওপরও এটি এক সুস্পষ্ট আঘাত।
তিনি বলেন, এই আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রশাসনিক ও একাডেমিক অস্থিরতার ঝুঁকিতে পড়েছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশকে ঘিরে যে নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষা দেশবাসীর মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল, সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপ তা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে এবং জনগণের মধ্যে হতাশার জন্ম দিয়েছে। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, চার বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যদের তাদের পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করার সুযোগ দিতে হবে। যদি সরকার একান্তই পরিবর্তন করতে চায়, তবে তা অবশ্যই সংসদে আলোচনা সাপেক্ষে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য সার্চ কমিটির মাধ্যমে করতে হবে; যেখানে সরকার ও বিরোধীদল উভয়ের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও একাডেমিক পদে এ ধরনের একতরফা ও দলীয় বিবেচনাপ্রসূত নিয়োগ দেশের উচ্চশিক্ষার অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করবে, প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে এবং একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আর এই সব অপকর্মের দায় সরকারকেই নিতে হবে। বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী এ ধরনের অগণতান্ত্রিক, শিষ্টাচারবহির্ভূত ও একতরফা সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং অবিলম্বে এ বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ দাবি করছে।