প্রচার ও গণসংযোগসহ দীর্ঘদিনের বিভিন্ন তৎপরতার পর এখন নির্বাচনের শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার সকালে আনুষ্ঠানিক প্রচার কার্যক্রম শেষে এখন ভোটকেন্দ্র ঘিরে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সারছেন তারা। সর্বশেষ করণীয় ঠিক করতে দফায় দফায় বৈঠক করছেন ১১ দলীয় জোটের নেতারা। সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে নির্বাচনে ভোটদানের বিষয়ে কেন্দ্র থেকে সারা দেশের প্রার্থী ও দলের নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ পর্যন্ত দাঁড়িপাল্লার প্রতি জনাসাধারণের আগ্রহ ও সমর্থনের পরিপ্রেক্ষিতে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে জামায়াত জোটের প্রার্থীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হবেন বলে সংশ্লিষ্টরা প্রত্যাশা করছেন।
এদিকে, নির্বাচন ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নির্বাচন কমিশনের কিছু সদস্যের আচরণ নিয়ে উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছেন জামায়াত নেতারা। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানালেও তা সমাধানে কিছুটা অনাগ্রহ ও ঢিলেমি ভাব দেখা যাচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করেছেন।
সূত্রমতে, আগামীকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করছে জামায়াতে ইসলামী। এতে জোটগতভাবে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ ২২৪ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
অন্যদিকে ৭৪টি আসনে সাত দলের প্রার্থীরা জোটের পক্ষ থেকে লড়ছেন। এর মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ২৯, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২৩, খেলাফত মজলিস ১০, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) চার, এবি পার্টি তিন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) দুটি এবং নেজামে ইসলাম পার্টির একটি আসনে একক প্রার্থী রয়েছেন। এছাড়া আটটি আসনে একাধিক দলের প্রার্থী উন্মুক্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জামায়াতের পক্ষ থেকে একটি আসন ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীমের সম্মানে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দলটির আরেক প্রার্থী শেরপুর-৩ আসনের মাওলানা নুরুজ্জামান বাদল মারা যাওয়ায় সেখানে ভোট স্থগিত রয়েছে।
এছাড়া জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), খেলাফত আন্দোলন এবং লেবার পার্টি কোনো প্রার্থী ছাড়াই ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের শরিক হিসেবে কাজ করছে। যদিও খেলাফত আন্দোলনের সাত প্রার্থী অঘোষিতভাবে বিভিন্ন আসনে বহাল রয়েছেন বলে জানা গেছে।
প্রার্থীদের সর্বশেষ প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আনুষ্ঠানিক প্রচারের কাজ এরই মধ্যে শেষ করেছেন প্রার্থীরা। এখন প্রার্থীদের ভোটকেন্দ্রে যাতায়াত, ভোটার স্লিপ পৌঁছানো, কেন্দ্রের বিভিন্ন দায়িত্ব বণ্টন, প্রশাসনের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনাসহ অন্যান্য কাজ চলছে। এ বিষয়ে আগেই কেন্দ্রের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি স্থানে অপ্রীতিকর কিছু ঘটনা ছাড়া মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই গণসংযোগ করেছেন প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা। এতে সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে ভোট হলে আমাদের প্রার্থীরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হবেন বলে আমরা প্রত্যাশা করি।
তিনি বলেন, আমাদের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির অনেকগুলো সাব-কমিটি ভোটের কার্যক্রম মনিটরিং করছে। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ভোটের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রশাসনের আচরণ, পক্ষপাতিত্ব, হুমকিধমকি, নির্বাচনি ক্যাম্পে আগুন দেওয়াসহ বিভিন্ন ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়ে আমরা নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছি, অভিযোগ দিচ্ছি। কিছু অভিযোগ আমলে নিলেও অনেক ক্ষেত্রে বিলম্ব করা হচ্ছে। এমনকি নির্বাচন কমিশনের কিছু কর্মকর্তাও দলীয় ঊর্ধ্বে উঠতে পারছেন না। এ বিষয়ে পক্ষপাতিত্ব না করে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতের জন্য আমরা বারবার আহ্বান জানাচ্ছি।
নির্বাচন ঘিরে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় দলীয় প্রস্তুতি সম্পর্কে জামায়াতের এই নেতা বলেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে যেকোনো ধরনের সন্ত্রাস, অরাজকতা মোকাবিলার জন্য সারা দেশে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেউ যাতে ভোট লুট করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
নির্বাচনি মাঠের সর্বশেষ পরিস্থিতি ও প্রস্তুতি সম্পর্কে ঢাকা-৬ আসনের জামায়াতের প্রার্থী ড. আব্দুল মান্নান বলেন, নির্বাচনের ভালো প্রস্তুতি নিতে সক্ষম হয়েছি। ভোটারদের দরজা ও অলিগলিতে অসংখ্যবার গেছি। এতে নবজাগরণ দেখা যাচ্ছে, সবাই পরিবর্তন চাচ্ছেন।
তিনি বলেন, মানুষ চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ, তারা মুক্তি চান। আমার পক্ষে বিএনপির সমর্থকসহ সাধারণ মানুষের নীরব সমর্থনে জয়ের ব্যাপক সম্ভাবনা দেখছি।
তবে ভোটকেন্দ্র ঘিরে কিছু শঙ্কার কথা জানিয়ে ড. মান্নান বলেন, অস্ত্রধারীরা প্রকাশ্যে ঘোরাঘুরি করছে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের পদক্ষেপে ঢিলেমি ভাব ও পক্ষপাতিত্ব আচরণ দেখা যাচ্ছে। তবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করে আমরা ভোটের ফলাফল পর্যন্ত মাঠে শক্ত অবস্থানে থাকব।
নির্বাচনি ওয়েবসাইট চালু
সংসদ নির্বাচন ঘিরে ওয়েবসাইট চালু করেছে জামায়াতে ইসলামী। ভোটের তিনদিন আগে সোমবার রাতে বিষয়টি জানায় দলটি।
সূত্রমতে, ওয়েবসাইটটিতে আছেÑদলের নির্বাচনি ইশতেহার, প্রার্থী পরিচিতি, ১১ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর পরিচিতি, প্রার্থীর তথ্য, ক্যাম্পেইন কিটসহ বিভিন্ন বিষয়। রয়েছে বিভিন্ন ক্যাম্পেইন ও অন্যান্য তথ্যসংবলিত ফটো ও ভিডিও গ্যলারি। বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভার্সনেও ওয়েবসাইটি তৈরি করা হয়েছে।
জামায়াতের নির্বাচনি ওয়েবসাইটের ঠিকানা https://cholobangladesh.net । ‘চলো একসঙ্গে গড়ি বাংলাদেশ’ শিরোনামের এ ওয়েবসাইটে ‘দাঁড়িপাল্লায়’ ভোট দেওয়ার পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী করার আহ্বান জানানো হয়েছে।