বাংলাদেশের নদ-নদীতে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না হলে ভারতকে কোনো ধরনের করিডোর বা ট্রানজিট সুবিধা দেওয়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, নদীতে পানি না এলে ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশে আসতে পারবে না। একইভাবে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচারের সুযোগও দেওয়া উচিত নয়।
রোববার রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে (কেআইবি) জাতীয় যুবশক্তি আয়োজিত যুব সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, যদি নদীতে পানি না আসে, তাহলে ভারতীয় পণ্যও বাংলাদেশে আসবে না। যদি পানি না আসে, তাহলে কোনো করিডোর হবে না, ট্রানজিট হবে না। যদি বাংলাদেশের নদীতে পানি না আসে, তবে কোনো ভারতীয় চ্যানেল এদেশে চলবে না। এ ছাড়া মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে জাপানের সঙ্গে সরকারের আলোচনা ও চুক্তির বিষয়টি জনগণের সামনে স্পষ্ট করার আহ্বান জানান তিনি।
এসময় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের জন্য তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। সংস্কারের মধ্য দিয়ে পরিবর্তন হওয়ার কথা ছিল। সেজন্য ঐকমত্য কমিশন হয়েছিল। একটি গণভোট হয়েছিল, জুলাই সনদ হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের পরে দেখলাম সরকার সবকিছুকে অস্বীকার করল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজপথে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে গণভোটে ভোট দিয়ে জনগণ তাদের মতামত জানিয়েছে।
গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণ গণঅভ্যুত্থান ও গণভোটের মাধ্যমে দুই দফায় পরিবর্তনের পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। সরকারের গঠিত নতুন কমিটিতে বিরোধী দলকে আলোচনার জন্য ডাকা হচ্ছে। সালাউদ্দিন সাহেবের কোনো কমিটিতে বিরোধী দল যাবে না। সেখানে কোনো মতামত দেবে না। এখন হচ্ছে বাস্তবায়নের সময়। অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে গণভোটের গণরায় অনুযায়ী সংবিধানকে সংস্কার করতে হবে।
সংস্কার প্রশ্নে সরকারের টালবাহানার পরিণতি সরকারকে ভোগ করতে হবে— এমন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, অতীতে ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, সরকার আবারও একই ধরনের চেষ্টা করছে। আগামী নির্বাচনে নিজেদের পছন্দের লোক বসানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে নাহিদ বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আট মাসে তরুণদের কর্মসংস্থান, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। তরুণদের জন্য ঋণ, প্রশিক্ষণ ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
সরকারি নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, পিএসসির চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পদত্যাগে চাপ দেওয়া হচ্ছে এবং দলীয় লোকজনকে সেখানে বসানোর চেষ্টা চলছে। অথচ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল চাকরিতে বৈষম্য ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক সমাধানে আসার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে আন্দোলন দমনে পুলিশ ব্যবহার না করার দাবি জানান তিনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। ওসমান হাদি হত্যার বিচার এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার দাবি জানান। রাজনৈতিক মামলাকে হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের মিছিল হলেও গ্রেপ্তার হচ্ছে না
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এনসিপি সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, সরকারের কাছে বিভিন্ন ধরনের গোয়েন্দা প্রতিবেদন থাকে। সরকারপ্রধানের কাছেও নানা ধরনের গোয়েন্দা তথ্য থাকে। কিন্তু আওয়ামী লীগের মিছিল হচ্ছে, বিভিন্ন জায়গায় বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছে, আগুন দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন দূরের কথা, ঘটনা ঘটার পরও তাদের গ্রেপ্তার করার মতো সক্ষমতা সরকার দেখাতে পারছে না।
তিনি বলেন, সরকার যদি বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে না চায়, তাহলে তাদের জন্য আফসোস। আমরা চাই, নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় বাংলাদেশের রাজনীতি পরিচালিত হোক। কিন্তু সরকার যদি প্রতিটি জায়গায় ব্যর্থ হতে থাকে, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক যুক্তি তাদের আর থাকে না।
আওয়ামী লীগ একটি গোখরা সাপ, সতর্ক থাকুন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সতর্ক করে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, আওয়ামী লীগ একটি গোখরা সাপ। আপনি এদের থেকে সতর্ক থাকুন। আপনার মন্ত্রণালয়ে অনেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছেন। তাদের বিষয়ে সতর্ক হোন। আপনার গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যও আরেকবার যাচাই করুন। কারণ, আপনি বাতির নিচের অন্ধকার দেখতে পান না। যারা আপনার সমস্যা তৈরি করবে, তারা আপনার আশপাশেই রয়েছে।
জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তারিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে জাতীয় যুব সম্মেলন সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার ফরহাদ সোহেল।