মসজিদ আল্লাহর ঘর। পৃথিবীর আদি নিদর্শন। মুসলিম সমাজ বিনির্মাণে এর গুরুত্ব অপরিসীম। তাইতো রাসলুল্লাহ (সা.) হিজরতের সময়, মদিনার উপকণ্ঠে কুবা পল্লীতে সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। এরপর মদিনায় প্রবেশ করে মসজিদে নববী নির্মাণ করেছেন।
মসজিদ মুসলিম সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু। মসজিদ ছাড়া মুসলিম সমাজ কল্পনা করা যায় না। পৃথিবীর কোনো জনপদে মসজিদ আছে মানেই, সেখানে মুসলমানের অস্তিত্ব টিকে আছে। বাংলাদেশ, বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মুসলমান জন-অধ্যুষিত দেশ। এদেশের কোলজুড়ে রয়েছে লাখো লাখো মসজিদ। তন্মধ্যে মুঘল শাসনামলের মসজিদগুলো মুসলিম স্থাপত্যশৈলীতে অনন্য হয়ে আছে শতাব্দি থেকে শতাব্দি। তেমনই একটি মসজিদ, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জেলার আরিফাইল শাহী জামে মসজিদ। অপরূপ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত মসজিদটি দেখতে ঠিক তাজ মহলের মতো।
এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ঐতিহাসিক স্থাপনামূহের একটি। ৩৬৩ বছর পূর্বে নির্মিত মসজিদটি ‘বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর’ এর তালিকাভুক্ত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। স্থানীয়ভাবে এটি আইরল মসজি নামে পরিচিত। মসজিদটি সরাইল উপজেলা আরিফাইল গ্রামে সাগরদিঘীর পাশে অবস্থিত। এর নির্মাতা দরবেশ শাহ আরিফ। তিনি ঈশা খাঁ’র স্থলাভিষিক্ত ছিলেন। তারই অনুরোধে ১৬৬২ সালে ঈশা খাঁ মসজিদটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন বলে জানা যায়।
মসজিদটির দৈর্ঘ ৮০ এবং প্রস্ত ৩০ ফুট। দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় সাড়ে পাঁচফুট। মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে ৫টি প্রবেশপথ। যার তিনটিই পূর্বদিকে এবং বাকি দু’টি উত্তর ও পূর্বদিকে। মসজিদের চার কোনে রয়েছে নান্দনিক চারটি বুরুজ। আরো আছে পদ্মফূলে অঙ্কতি তিনটি গম্বুজ।
মসজিদটিকে কেন্দ্র করে নানা মিথ রয়েছে। লোকমুখে শোনা যায়, এই মসজিদের পাশেই ঈশা খাঁ’র দুই স্ত্রীকে কবর দেয়া হয়েছে। যা জোড়া কবর নামে পরিচিত লাভ করে। কবর দুটিতেও মুঘল স্থাপত্যকলা বিদ্যমান। জোড়া কবর ছাড়াও মসজিদের পাশে একটি দিঘী রয়েছে। যার নামকরণ করা হয়েছে সাগরদিঘী। এটি মুসল্লিদের অজু করার কাজে ব্যবহৃত হয়। জনশ্রুতি রয়েছে, এই দিঘীর পানি পান করলে রোগমুক্তি হত। যদিও এসবের কোনো ভিত্তি নেই।
প্রাচীনশিল্পকলার অমর স্বাক্ষী এই মসজিদটিকে দেখতে প্রতিদিনিই দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষজন ছুটে আসেন। তাদের পদচারনায় মুখরিত হয়ে ওঠে মসজিদ প্রাঙ্গন ও দিঘির চার পাড়। তবে তাদের মুখে ওঠে আসে, নানান অভিযোগ। তারা বলেন, মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে থাকলেও তারা কোনো দেখভাল করেন না। তেমনি মসজিদ দেখতে আসা দর্শনার্থীরা সরু রাস্তার কারণে দুর্ভোগে পড়েন। সরকার যদি মসজিদটির উন্নয়ের দিকে নজর দেন, তাহলে মুসলিম নিদর্শনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে আরিফাইল শাহী জামে মসজিদ।
লেখক : প্রাবন্ধিক। খতিব, কসবা জামে মসজিদ। কসবা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।