‘শালীনতা’ শব্দটি আজকাল যেন আর সঠিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। যাচ্ছেতাই ব্যবহারে এ শব্দটিই যেন এখন নিপীড়নের শিকার মাজলুমে পরিণত হয়েছে! অথচ এ বিষয়টি নৃ-তাত্ত্বিকভাবে স্বীকৃত যে, পোশাক-পরিচ্ছদ মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বহুকাল থেকেই পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান এবং পোশাকে শালীনতা বজায় রাখা মানবজাতির অবিচ্ছেদ্য সংস্কৃতির অংশ হিসেবেই দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ-নির্বিশেষে সবার মাঝে পরিচিত হয়ে আসছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার মাঝেই শালীন পোশাক পরিধানের চর্চা হয়ে আসছে।
আবার নৃবিজ্ঞান মানুষের পোশাককে সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। আর পোশাক সংস্কৃতি নিঃসন্দেহে সৌন্দর্যের প্রতীক, যা এখন শুধু সৌন্দর্যবর্ধনেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং শরীরকে ঢেকে রাখতে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টি থেকে বাঁচাতে এটি দারুণ কার্যকর পদ্ধতি। সুতরাং, আমরা বলতে পারি, পোশাকে শালীনতা বজায় রাখা নিজের জন্য যেমন জরুরি, তেমনি অন্যের জন্যও অপরিহার্য। সবার জন্য এ বিষয়ে লক্ষ রাখা উচিত যে, আমার পরিধেয় পোশাকটি যেন কারো জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না করে। এমনকি অনাকাঙ্ক্ষিত আকর্ষণ তৈরি থেকেও বিরত রাখে। এমন পোশাক পরিধান করা সুস্থ মানসিকতার পরিচয় বহন করে। এটি সভ্য ও সুস্থ সমাজের সবারই নৈতিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে এমন আচরণ অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনও বটে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতেও ইউরোপীয় দেশগুলোতে এ শালীনতার চর্চা অমুসলিমদের মধ্যেও অব্যাহত ছিল। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও, মুসলিমপ্রধান দেশেও এখন শালীনতা রক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। অর্থাৎ, মুসলমানদের মধ্যেও এখন পশ্চিমা অনুকরণে নারী-পুরুষ সবার কাছে হাফপ্যান্ট বা এ জাতীয় সংক্ষিপ্ত পোশাকের প্রচলন ব্যাপক বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি ভিনদেশি সংস্কৃতিপ্রীতি এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি চরম উদাসীনতারও পরিচায়ক। পোশাক নির্বাচনে এমন দেউলিয়াত্ব কারো থেকে কাম্য নয়!
পোশাক পরিধানে শালীনতা রক্ষা করা জরুরি। এমনকি মুসলমানদের জন্য আবশ্যক হলো, তারা কোরআন-হাদিসে বর্ণিত নির্দেশনা অনুযায়ী পোশাক পরিধান করবেন। এর মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয় হচ্ছেÑপোশাকটি হতে হবে ঢিলেঢালা এবং সতর (পুরুষের জন্য কমপক্ষে নাভি থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত) ঢেকে রাখে এমন। আঁটসাঁটভাবে গায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, এমন না হওয়া; বিধর্মীদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ না হওয়া; অহংকার প্রকাশ করে এমন না হওয়া; পোশাকটি টাখনুর নিচে ঝুলে না থাকা ইত্যাদি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা পছন্দ করে যে, ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতা প্রসার লাভ করুক (ছড়িয়ে পড়ুক), তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহতায়ালা (এমন বিষয় সম্পর্কে) জানেন, (যে সম্পর্কে কিছুই) তোমরা জানো না।’ সুরা আন-নূর : ১৯
হাদিসে লজ্জা বা শালীনতাকে ঈমানের অংশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আর ঈমানদাররাই জান্নাতে প্রবেশ করবেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘লজ্জা (শালীনতাবোধ) ঈমানের একটি অংশ, আর ঈমানদার ব্যক্তি জান্নাতে যাবে। লজ্জাহীনতা অত্যন্ত মন্দ কাজ। আর মন্দ লোকজন জাহান্নামে যাবে।’ মুসনাদে আহমদ : ১০৫১২
এমনকি হাদিসে আরো এসেছে, নির্লজ্জতা বা বেহায়াপনা হচ্ছে দুশ্চরিত্রের অংশ, যা খুবই নিন্দনীয়। কেননা, চরিত্রহীনকে সমাজের কেউই পছন্দ করে না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘লজ্জা হলো ঈমানের অংশ। আর ঈমানের ফল হলো জান্নাত। পক্ষান্তরে নির্লজ্জতা হচ্ছে দুশ্চরিত্রের অংশ। আর দুশ্চরিত্রের পরিণতি হলো জাহান্নাম।’ মিশকাত : ৫০৭৭
জীবিত বা মৃত উভয়ের রান বা ঊরুকে আবৃত করে রাখতে বলা হয়েছে, যা অবশ্যই আবরণ তথা ঢেকে রাখার অঙ্গ। মুহাম্মাদ ইবনে জাহশ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) মামার নামক এক সাহাবির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই সময়ে তার ঊরু খোলা ছিল। (এ অবস্থা দেখে) তিনি তাকে বললেন, হে মামার! তোমার ঊরুদ্বয় ঢেকে রাখো, কেননা ঊরুদ্বয় সতরের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, যা ঢেকে রাখতে হয়!’ (আহমদ : ২২৪৯৫) আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমার রান অনাবৃত করবে না এবং জীবিত ও মৃত কারো রানের প্রতি (কখনো) দৃষ্টিপাত করবে না।’ (আবু দাউদ : ৩১৪০)
সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানের জন্যই আবশ্যক হলো, প্রত্যেকেই নিজের সতর ঢেকে রাখতে সচেষ্ট হবেন। নিজ ঊরু ঢেকে রাখবেন। কাউকে দেখাবেন না। অপ্রয়োজনে জীবিত বা মৃত কারো ঊরুর দিকে কখনো দৃষ্টি দেবেন না। একইভাবে উপরোল্লিখিত পোশাক পরিধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অবশ্যই অনুসরণ করবেন। ঘরে-বাইরে সর্বত্র লজ্জা ও শালীনতা বজায় রেখে চলবেন। আল্লাহতায়ালা আমাদের সঠিকভাবে শালীনতা রক্ষা করে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর