রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানবজাতির জন্য অফুরন্ত কল্যাণ। আধুনিক সভ্যতার চাকচিক্য ও পশ্চিমা জীবনধারার প্রভাবে বর্তমানে নবীজি (সা.)-এর অনেক সুন্দর ও কল্যাণময় সুন্নত উপেক্ষিত ও অবহেলিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আমরা ভুলেই গেছি, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এই কাজগুলো সুন্নত। নিচে এমন ১০টি অবহেলিত সুন্নতের আলোচনা করা হলো—
১. নামাজের আগে মেসওয়াক করা
টুথব্রাশ ও পেস্টের ব্যাপক ব্যবহারে মেসওয়াকের সুন্নত আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। অথচ রাসুল (সা.) মেসওয়াকের ওপর কতটা জোর দিয়েছেন, তা একটি হাদিস থেকেই স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘যদি না আমার উম্মতের কষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকত, তবে আমি তাদের প্রত্যেক নামাজের সময় মেসওয়াক করতে বলতাম।’ (বুখারি: ৮৮৭)। পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের বড় মাধ্যম।
২. শিশুদের আগে সালাম দেওয়া
আমরা বড়দের সালাম দিলেও শিশুদের সালাম দিই না। আমরা আশা করি ছোটরাই শুধু বড়দের সালাম দেবে। অথচ ছোটদের সালাম দেওয়া নবীজির (সা.) একটি মিষ্টি সুন্নত, যা শিশুদের নম্র হতে শেখায়। আনাস (রা.) একবার একদল শিশুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দিলেন এবং বললেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এমনটিই করতেন।’ (বুখারি: ৬২৪৭)
৩. খাওয়ার পর আঙুল চেটে খাওয়া
পাশ্চাত্য ফ্যাশনের প্রভাবে বর্তমানে হাত দিয়ে খাওয়া এবং শেষে আঙুল চেটে খাওয়াকে অনেকেই অস্বস্তিকর ও অমার্জিত মনে করেন। অথচ এর মাঝে রয়েছে খাবারের বরকত। রাসুলুল্লাহ (সা.) তিন আঙুলে খেতেন এবং খাওয়া শেষে আঙুল চেটে খেতেন। (মুসলিম: ২০৩২)
৪. পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাওয়া
প্লেট থেকে খাবার পড়ে গেলে অস্বাস্থ্যকর ভেবে আমরা তা ফেলে দিই। অথচ রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘কারো লোকমা পড়ে গেলে সে যেন তা তুলে নেয় এবং ময়লা দূর করে তা খেয়ে নেয়, আর শয়তানের জন্য কিছু ফেলে না রাখে।’ (মুসলিম: ২০৩৩)। এজন্যই পরিচ্ছন্ন জায়গায় খেতে বসা উচিত।
৫. হাই তোলার সময় মুখ ঢাকা
হাই তোলা অলসতার লক্ষণ। নবীজি (সা.) এ সময় হাতের পিঠ দিয়ে মুখ ঢেকে নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তোমাদের কারো যখন হাই আসে, সে যেন যথাসম্ভব তা প্রতিরোধ করে অথবা মুখে হাত দেয়।’ (মুসলিম : ২৯৯৪)। এছাড়া হাই তোলার সময় বিকট শব্দ আর আঙুল ফোটানোও অনুচিত।
৬. ডানদিক থেকে জুতা পরা
জুতো পরা বা খোলার ক্ষেত্রে আমরা কোনো নিয়মের ধার ধারি না। অথচ নবীজি (সা.) আমাদের জীবনের ক্ষুদ্রতম কাজেরও সুন্দর শৃঙ্খলা শিখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘জুতা পরলে ডান পা দিয়ে শুরু করো এবং খোলার সময় বাম পা আগে খোলো।’ (বুখারি: ৫৮৫৫)
৭. তিন শ্বাসে পানি পান করা
দাঁড়িয়ে এক নিঃশ্বাসে ঢকঢক করে পানি পান করা ব্যস্তজীবনের সাধারণ চিত্র। অথচ রাসুল (সা.) বসে পানি পান করতে বলেছেন এবং নিজেও তিন শ্বাসে পান করতেন। (বুখারি: ৫৬৩১)। চিকিৎসাবিজ্ঞানও প্রমাণ করেছে, এভাবে পানি পান করা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
৮. ওজুসহ ডান কাত হয়ে ঘুমানো
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ওজু করা এবং ডান কাত হয়ে ঘুমানোর সুন্নতটি সমাজ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন তুমি বিছানায় যাবে, তখন নামাজের মতো ওজু করো, তারপর ডান কাত হয়ে শোও।’ (বুখারি: ২৪৭)। এটি মুমিনকে সারা রাত সওয়াব এনে দেয়।
৯. মুচকি হাসি দিয়ে কথা বলা
কর্মব্যস্ততা আর বিষণ্ণতার কারণে মানুষের মুখ থেকে হাসি যেন উবে গেছে। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বদা হাসিমুখে থাকতেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসাও একটি সদকা।’ (তিরমিজি: ১৯৫৬)। একটি সুন্দর হাসি সমাজের বহু বৈরিতা দূর করে দেয়।
১০. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা
এটি কেবল দায়িত্বই নয়, বরং ঈমানের অংশ। রাস্তায় পড়ে থাকা কলার খোসা বা কাঁটা সরিয়ে ফেলার প্রবণতা আমাদের একদমই নেই। অথচ নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘ঈমানের ৭০টিরও বেশি শাখা রয়েছে... এর মধ্যে সর্বনিম্নটি হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা।’ (মুসলিম: ৫৮)
উপর্যুক্ত সুন্নতগুলো পালন করতে আমাদের কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা শ্রমের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু একটু সদিচ্ছা ও সচেতনতার। যাপিত জীবনে এই সুন্নতগুলো চর্চা করার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর সোনালি ঐতিহ্যগুলো সমাজে আবার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।