মুসলিম বিশ্বকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন নতুন করে পাঠ করার পাশাপাশি তার শিক্ষা ও আদর্শকে বাস্তব জীবনযাপনের অংশ করে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন আফগানিস্তানে নিযুক্ত ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা ড. সৈয়দ রুহুল্লাহ হোসেইনি। তিনি বলেছেন, মহানবী (সা.) শুধু একটি নির্দিষ্ট জাতি, ভূখণ্ড বা সময়ের জন্য প্রেরিত নন; তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত, নৈতিকতা, মানবিক মর্যাদা ও ঐক্যের বার্তা নিয়ে এসেছেন।
মাজার-ই-শরিফ শহরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও হজরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
হোসেইনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর জন্মদিন শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণ নয়; এটি এমন এক আলোর উদয়ের স্মরণ, যা মানবজাতিকে অজ্ঞতা, নিপীড়ন ও অন্ধকার থেকে মুক্ত করে সঠিক পথ দেখানোর জন্য প্রেরিত হয়েছিল। পবিত্র কোরআনের ‘আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি’ আয়াতের উল্লেখ করে তিনি বলেন, নবীজির (সা.) বার্তা রহমত, তাওহিদ ও মানবিক মর্যাদার বার্তা।
নৈতিকতাই নবীজির শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি
মহানবী (সা.)-এর চরিত্রকে তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উল্লেখ করে হোসেইনি বলেন, কোরআন তাকে ‘মহান চরিত্রের অধিকারী’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, নবীজির (সা.) শিক্ষায় নৈতিকতা কোনো গৌণ বিষয় নয়; বরং তার দাওয়াত ও জীবনাদর্শের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
সততা, আমানতদারি, ক্ষমাশীলতা, দয়া, ন্যায়বিচার, মানুষের প্রতি সম্মান এবং অসহায়দের প্রতি দায়িত্বশীলতা—এসব নবীজির (সা.) নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকের মুসলিম সমাজের এসব গুণ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, মানুষের অন্তরে যদি মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা থাকে, তাহলে সেই ভালোবাসার প্রতিফলন সামাজিক আচরণেও দেখা যেতে হবে। নবীজির (সা.) সম্পর্কে জ্ঞান শুধু আলোচনা, মাহফিল বা জন্মবার্ষিকী পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা মানুষের নৈতিকতা, আচরণ ও জীবনযাপনে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
বিভেদ নয়, ঐক্য
মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের কথা তুলে ধরেন হোসেইনি। তার ভাষায়, মহানবী (সা.) এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যার ভিত্তি ছিল তাওহিদ ও ঈমান। পবিত্র কোরআনও মুসলমানদের আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে এবং বিভক্ত না হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
তিনি বলেন, শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও তাওহিদ, পবিত্র কোরআন, মহানবী (সা.)-এর নবুয়ত ও কিবলার মতো মৌলিক বিষয়ে তাদের অভিন্নতা রয়েছে। এসব অভিন্ন বিষয় মুসলিম ঐক্য ও সংহতির শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে।
মতপার্থক্য যেন শত্রুতা ও বিভাজনে পরিণত না হয়—এ আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মতভেদকে সংলাপ, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার সুযোগে পরিণত করা উচিত।
জ্ঞান ও সংস্কৃতির মাধ্যমে নতুন সভ্যতা
মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শে জ্ঞান ও শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে হোসেইনি বলেন, নবীজির (সা.) দাওয়াতের সঙ্গে শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি ও মানবিক প্রশিক্ষণও যুক্ত ছিল। কোরআনে নবীজির দায়িত্বের মধ্যে আয়াত পাঠ, মানুষের পরিশুদ্ধি এবং কিতাব ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তার মতে, মহানবী (সা.) যে সমাজ নির্মাণ করেছিলেন, তা ছিল জ্ঞান, শিক্ষা ও মানবিক প্রশিক্ষণের সমাজ। তাই মুসলিম বিশ্বের স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গবেষণাকেন্দ্রগুলোর দায়িত্ব হলো অজ্ঞতা, পশ্চাৎপদতা ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে কাজ করা।
বিশেষ করে মুসলিম তরুণদের জ্ঞান, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও নিজস্ব পরিচয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে সমন্বয় করে তরুণ প্রজন্ম একটি নতুন ও মানবিক সভ্যতা নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা
হোসেইনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর শিক্ষায় মানুষের মর্যাদা সম্পদ, ক্ষমতা, বংশ, জাতি বা সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। ঈমান, তাকওয়া ও মানবিকতাই ছিল মানুষের মর্যাদার মূল ভিত্তি।
নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াকে মুসলমানদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিপীড়িত মানুষের দুর্ভোগের কথাও তুলে ধরেন এবং মুসলিম বিশ্বের বিবেক ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার আহ্বান জানান।
আধুনিক সংকটেও নবীজির আদর্শ প্রাসঙ্গিক
বর্তমান বিশ্বের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে হোসেইনি বলেন, এত উন্নতির পরও মানুষ যুদ্ধ, সহিংসতা, বৈষম্য, অবিচার, উগ্রবাদ, নৈতিক অবক্ষয় ও আধ্যাত্মিক সংকট থেকে মুক্ত হতে পারেনি। ফলে বর্তমান বিশ্বে মহানবী (সা.)-এর রহমত, নৈতিকতা, মানবিক মর্যাদা ও আধ্যাত্মিকতার বার্তা আগের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
কোরআনের ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ’ আয়াতের উল্লেখ করে তিনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর জীবন শুধু ইতিহাস পাঠের বিষয় নয়। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও সাংস্কৃতিক জীবনের নানা ক্ষেত্রে তাঁর জীবন আজও পথনির্দেশ দিতে পারে।
ভালোবাসার প্রকৃত প্রকাশ অনুসরণে
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে হোসেইনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার অর্থ তার পথ ও নৈতিকতাকে অনুসরণ করা। তার মতে, মহানবী (সা.)-এর জন্মবার্তার সারকথা এক বাক্যে বলতে হলে বলা যায়—মুহাম্মদ (সা.) রহমত, নৈতিকতা, ঐক্য, জ্ঞান ও ন্যায়বিচারের নবী। তাই এসব মূল্যবোধকে শুধু অনুষ্ঠান ও বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনের বাস্তব পরিসরে নিয়ে যাওয়াই হওয়া উচিত মুসলমানদের দায়িত্ব।
সূত্র: আফগান ভয়েস এজেন্সি