হোম > ইসলাম ও জীবন

কোরবানির মাংস তিন ভাগ করা কতটা জরুরি

আমার দেশ অনলাইন

প্রতি বছর ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদে মুসলিমরা গরু, ছাগল, মহিষসহ বিভিন্ন ধরনের পশু কোরবানি দিয়ে থাকেন। ঈদের দিন সকালে কোরবানির পশু জবাইয়ের পর মাংস কাটাসহ সেগুলো ভাগ এবং বণ্টন করে থাকেন কোরবানিদাতারা। এই কোরবানির মাংস বণ্টন করা নিয়েও নানা ধরনের মতবাদ প্রচলিত রয়েছে বাংলাদেশে। কেউ কেউ বলে থাকেন, কোরবানির পশুর মাংস তিন ভাগ করা উচিত। এই মাংসের এক ভাগ কোরবানিদাতা নিজে রাখবেন, এক ভাগ আত্নীয়স্বজনকে দেবেন এবং বাকি এক ভাগ গরিব বা মিসকিনদের মধ্যে বণ্টন করবেন।

কোরবানির মাংসের তিন ভাগ নিয়ে এই আলোচনা বহু পুরোনো। আলেম সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, কোরবানির মাংসের তিন ভাগ বণ্টন কোরআন হাদিস দ্বারা সমর্থিত। তবে, এটি কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক মুফতি আনিসুর রহমান সিকদার বলছেন, কোরবানির মাংস কেউ যদি চায় সে পুরোটাই নিজে খেতে পারে, আবার চাইলে সবটুকু দান করে দিতে পারে। সাধারণত গরু-মহিষের মতো বড় পশুর ক্ষেত্রে অনেকেই সর্বোচ্চ সাত ভাগে কোরবানি দিয়ে থাকেন।

তবে, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় কোরবানির মাংস বণ্টনের ক্ষেত্রে একটি নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। গ্রামগঞ্জে পশু কোরবানির পর ‘সামাজিক ভাগ’ নামে একটি ভাগ করে রাখেন অনেকে।

এই রীতি অনুযায়ী সামর্থ্যবানেরা তাদের কোরবানির মাংসের একটা নির্দিষ্ট অংশ সমাজের কল্যাণ তহবিল বা অভাবী মানুষের জন্য দান করেন। তবে মুফতি ও আলেম সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, কোরবানির মাংসের এ ধরনের ভাগ কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক করা যাবে না।

ধর্মগ্রন্থ কোরআনে বলা আছে, কোরবানির পশুর রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, এর গোশতও না, বরং তাঁর কাছে যা পৌঁছায়, তা হলো তোমাদের তাকওয়া বা ধর্মনিষ্ঠা। যে কারণে কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা দিয়ে ধর্মীয় পণ্ডিতগণ বলছেন, মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই পশু কোরবানি দেওয়া সামর্থ্যবান মানুষের জন্য ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক।

কোরবানি দেওয়া অবশ্যপালনীয় ইবাদত—এটি কোরআন ও হাদিস দ্বারা স্বীকৃত। তবে কোরবানির মাংস বণ্টন নিয়ে আমাদের সমাজে নানা ধরনের মতবাদ বহু পুরোনো। কোরবানির মাংস প্রসঙ্গে ধর্মগ্রন্থ কোরআনের সুরা হজে বলা হয়েছে, তোমরা তা থেকে (কোরবানির মাংস) খাও এবং মানুষকে খাওয়াও—মানুষের কাছে হাত পাতে না এমন অভাবীদের এবং চেয়ে বেড়ায় এমন অভাবীদের।

ধর্মীয় গবেষক ও আলেমরা বলছেন, ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.) কোরবানির মাংস এক ভাগ নিজের পরিবারকে খাওয়াতেন। এক ভাগ গরিব প্রতিবেশীদের দিতেন আর এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের দিতেন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক মুফতি আনিসুর রহমান সিকদার বলেন, ‘কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন জায়গায় ভাগ বা বণ্টনের ক্ষেত্রে তিন ভাগের বিষয়টি এসেছে এবং ভাগের ক্ষেত্রে তিন ভাগ করার বিষয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।’

তার মতে, এক্ষেত্রে শুধু কোরবানির পশুর মাংস নয় ইসলামের বিধান অনুযায়ী, অন্য অনেক কিছুতেই তিনভাগের বিষয়টি এসেছে।

ইসলামি লেখক ও গবেষক শরীফ মুহাম্মদ বলছিলেন, ইসলাম ধর্মের যে বড় দুটি উৎসব রয়েছে, এ দুটি উৎসবেই গরিবদের খুশি করার উপলক্ষ রয়েছে। সেটি যেমন ঈদুল ফিতরে রয়েছে, তেমনি ঈদুল আজহায়ও রয়েছে।

তিনি বলেন, রোজার ঈদে গরিবদের ফিতরা দেয়। আর কোরবানির ঈদে মাংসও বিতরণ করা হয়। তবে ফিতরা যেমন সচ্ছল মানুষের ক্ষেত্রে না দিলে গুনাহ হবে, কোরবানির মাংসের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়।

অর্থাৎ, ধর্মীয় স্কলারদের মতে, কোরবানির ঈদে গরিবদের উৎসবে শামিল করার একটি উপলক্ষ কোরবানির মাংস বিতরণ।

কোরবানির দিন মাংস কাটার সময়ও অনেক সময় গরিব কিংবা ভিক্ষুকদের পক্ষ থেকে মাংস সংগ্রহ করতে আসতে দেখা যায়। মাংস ভাগ বা বণ্টনের আগে অনেকেই গরিবদের মাংস দিয়েও থাকেন।

ধর্মীয় গবেষক ও মুফতিরা কোরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন, কোরবানির মাংস তিন ভাগ করে এক অংশ সদকা করা, এক অংশ আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও দরিদ্র প্রতিবেশীদের দেওয়া আর এক অংশ নিজের জন্য রাখা মুস্তাহাব বা উত্তম।

তবে, এটা কোনো জরুরি বা আবশ্যক আমল নয়। যে কারণে মাংসের তিন ভাগ করাকে তারা বাধ্যতামূলক মনে করেন না।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক আনিসুজ্জামান সিকদার বলছিলেন, তিন ভাগ করা কোরআন-হাদিস সমর্থিত। তবে কোরবানির মাংস তিন ভাগের এক ভাগ বণ্টনের ক্ষেত্রে এমন কোনো রেওয়াত নাই যে এটা করতেই হবে। তিন ভাগ হাদিস কোরআন দ্বারা সমর্থিত, তবে এটাকে ইসলামের কোথাও বাধ্যতামূলক করা হয়নি, এটা জরুরি নয়—যোগ করেন তিনি।

ইসলামিক গবেষকেরা বলেছেন, ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.) এবং তার অনুসারী বা সাহাবারা কোরবানির মাংস বণ্টনের ক্ষেত্রে তিন ভাগ করেছেন।

লেখক শরীফ মুহাম্মদ বলছিলেন, কোরবানির মাংসের তিন ভাগের ক্ষেত্রে সামাজিক গুরুত্ব অনে। তবে এবাদতগত স্তরবিন্যাসে ফরজ, ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা ধরনের আমল নয়। যে কারণে কোরবানির মাংস বণ্টনের ক্ষেত্রে তিন ভাগের বিষয়টিকে অবশ্যই পালনীয় বা বাধ্যতামূলক হিসেবে দেখছেন না তারা।

মুফতি সিকদার বলছিলেন, মাংসের তিন ভাগ হাদিস-কোরআন দ্বারা সমর্থিত হলেও বাধ্যতামূলক নয়। কেউ যদি চান সবটুকু মাংস নিজেই খেতে পারবেন। আর কেউ যদি চান পুরোটা দানও করে দিতে পারবেন।

ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, মানুষ কোরবানির পশুর মাংসের একটা অংশ দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে থাকেন। যে কারণে প্রতি কোরবানির ঈদেই দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের বহু মানুষকে দেখা যায় বাড়ি বাড়ি ঘুরে মাংস সংগ্রহ করে।

তবে, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এখনো সমাজের সবাই মিলে একসঙ্গে কোরবানি করার নিয়ম চালু আছে। ওই সব এলাকায় যারা কোরবানি করেন, তাদের প্রত্যেককেই বাধ্যতামূলকভাবে কোরবানির একটি অংশ 'সামাজিক ভাগ' হিসেবে দিতে হয় এবং তা দরিদ্র ও অভাবীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।

ধর্মীয় লেখক ও গবেষকেরা বলছেন, সমাজের ভাগ নামে কোথাও কোথাও কোরবানিদাতা সবার কাছ থেকে মাংস গ্রহণ করে থাকেন। যিনি সেই ভাগে মাংস দেবেন, তার যদি আপত্তি না থাকে, তাহলে এভাবে গরিবদের মধ্যে মাংস বণ্টন করা যেতে পারে।

লেখক ও গবেষক শরীফ মুহাম্মদ বলেন, গ্রামে একটা ভাগ বাধ্যতামূলকভাবে তুলে নেওয়া হয়। এক ভাগ দিতেই হবে, এটা যদি বাধ্যতামূলকভাবে আরোপিত করা হয়, তাহলে এটা জায়েজ নয়।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ধরেন যদি গ্রামের মোড়ল বা মাতব্বর সবার ওপর পাঁচ কেজি বা ১০ কেজি মাংস দিতেই হবে বলে চাপিয়ে দেন, তাহলে এটা হবে আরোপিত। এটি কোনোভাবেই ইসলাম সমর্থন করে না। যদি কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেন, তাহলে কোনো সমস্যা নেই।

সামাজিক ভাগ নামে যদি সমাজের সত্যিকারের গরিবদের মাংসের ভাগ দেওয়া যায়, তাতে যদি কোরবানিদাতাদের মধ্যে কোনো আপত্তি না থাকে, তাহলে সেটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন ধর্মীয় গবেষকেরা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

মসজিদুল হারামে ঈদুল আজহার নামাজের ইমামতি করবেন যিনি

কাবা কোন কাপড়ে কেন ঢেকে রাখা হয়

সূর্য ডোবার পর আরাফাত থেকে মুজদালিফায় যাবেন হাজিরা

একই পশু দিয়ে আকিকা ও কোরবানি, যা বলছে ইসলাম

ঋণ করে কোরবানি, যা বলছে ইসলাম

আগে মক্কায় যেতে যেসব পথ ব্যবহার করতেন হাজিরা

লাব্বাইক লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখর হবে আরাফাত ময়দান

পবিত্র কাবা শরীফের ভেতরে কী আছে, ঢাকা হয় কী দিয়ে

গরুসহ যেসব পশু কোরবানি করা জায়েজ

লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখর মিনার প্রান্তর, হাজীদের খোঁজ নিচ্ছেন ধর্মমন্ত্রী