হোম > ইসলাম ও জীবন

সম্প্রীতির সীমানা ও ঈমানের স্বকীয়তা

আমানুর রহমান

ধর্ম ও বিশ্বাসের বৈচিত্র্য মানবসমাজের অন্যতম পরিচিত রূপ হলেও প্রতিটি ধর্মের নিজস্ব আদর্শ, নীতি এবং স্বাতন্ত্র্যের এক সুনির্দিষ্ট গণ্ডি রয়েছে। আমাদের সমাজে নানা ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি রক্ষা করে চলি। তবে সম্প্রীতির অজুহাতে নিজের ধর্মীয় চেতনা ও আকিদার মৌলিক সীমানা অতিক্রম করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিনোদন, কৌতূহল বা কেবল আনন্দ উপভোগের অংশ হিসেবে অমুসলিমদের পূজামণ্ডপে মুসলমানদের গমন এবং মূর্তিপূজা প্রত্যক্ষ করা, এমনকি সেখানে তাদের সঙ্গে নাচানাচি ও রঙ মাখামাখির প্রবণতা লক্ষ করা যায়। বাহ্যিকভাবে এটিকে সাধারণ সামাজিক মেলবন্ধন মনে হলেও ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ একটি বিষয়। ইসলাম এমন একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা তার অনুসারীদের ঈমান ও তাওহিদের ওপর দৃঢ় থাকতে শেখায় এবং যেকোনো ধরনের শিরক বা অনৈসলামিক বিশ্বাসের অনুকরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়।

ইসলাম ধর্মের পুরো ভিত্তিটাই দাঁড়িয়ে আছে মহান আল্লাহর একত্ব এবং তার ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ওপর। এই তাওহিদের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে রয়েছে ‘শিরক’, যা ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ও ক্ষমাহীন অপরাধ। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-বাকারার ২২ নম্বর আয়াতে এবং সুরা আন-নিসার ৪৮ নম্বর আয়াতে শিরকের ভয়াবহতা সম্পর্কে স্পষ্ট সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। পূজামণ্ডপ বা উপাসনালয়গুলো মূলত এমন স্থান, যেখানে মূর্তিকে মহান আল্লাহর সমকক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে উপাসনা করা হয়। একজন মুসলিম যখন কৌতূহলবশত সেখানে গিয়ে হাজির হয়, তখন তার এই শারীরিক উপস্থিতি পরোক্ষভাবে সেই শিরকের কাজের প্রতি এক ধরনের মৌন সমর্থন বা স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা সুরা আল-মায়েদার ২ নম্বর আয়াতে বিশ্ববাসীকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সাহায্য করো না।’ যেখানে প্রকাশ্যভাবে আল্লাহর বিধানের চরম অবাধ্যতা চলছে, সেখানে আনন্দ বা কৌতূহলের অংশীদার হওয়া প্রকারান্তরে সেই গুনাহের আয়োজনে নিজের উপস্থিতি দিয়ে সমর্থন জানানোরই শামিল, যা ঈমানি চেতনার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

ইসলামি সংস্কৃতি ও জীবনবোধের অন্যতম সৌন্দর্য হলো তার নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য। ইসলাম তার অনুসারীদের অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি মানবিক আচরণ ও সামাজিক সদাচরণের নির্দেশ দিলেও নিজের ধর্মীয় পরিচয়কে গুলিয়ে ফেলতে কঠোরভাবে নিষেধ করে। সুরা আল-আনআমের ৬৮ নম্বর আয়াতে এবং সুরা আন-নিসার ১৪০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নির্দেশ দিয়েছেন, যেখানে আল্লাহর আয়াত ও নিদর্শনকে অস্বীকার বা উপহাস করা হয়, সেখানে যেন মুমিনরা উপবেশন না করে। এর সপক্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু দাউদ শরিফের এক বিখ্যাত হাদিসে সতর্ক করে বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো জাতির সঙ্গে সাদৃশ্য রাখবে, সে তাদেরই একজন হিসেবে গণ্য হবে। ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইকতিদাউ সিরাতিল মুস্তাকিম’-এ উল্লেখ করেছেন, অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ মুসলমানের ঈমানি স্বকীয়তা ধ্বংসের দরজা খুলে দেয়। ফলে সামাজিক উদারতা দেখানোর অজুহাতে ধর্মীয় উৎসবের চত্বরে শামিল হওয়া ইসলামের মূল চেতনার পরিপন্থী এবং নিজের আকিদাকে এক মহাঝুঁকিতে ফেলার শামিল।

অবশ্য ইসলামি শরিয়ত অত্যন্ত বাস্তবমুখী এবং সমাজ-রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় পূর্ণাঙ্গ পথপ্রদর্শক। তাই সাধারণ বিনোদন বা উৎসব উদ্‌যাপনের বাইরে কিছু ব্যতিক্রমী ও বিশেষ পরিস্থিতিকে ফকিহরা এই নিষেধাজ্ঞা থেকে আলাদা করেছেন। যদি কোনো মুসলিম সরকারি কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হন এবং তার ওপর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা কিংবা সংখ্যালঘুদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যতামূলক অফিসিয়াল দায়িত্ব অর্পিত হয়, তবে তিনি পূজামণ্ডপে যেতে পারবেন। ফাতাওয়া লাজনা দায়েমাহর দ্বিতীয় খণ্ডের ১১৫ নম্বর পৃষ্ঠায় এই প্রশাসনিক বা সুরক্ষামূলক দায়িত্ব পালনের বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তবে এই যাওয়ার উদ্দেশ্য কেবলই অর্পিত পেশাগত দায়িত্ব পালন, কোনোভাবেই উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া বা ধর্মীয় আচারকে উপভোগ করা নয়। এমনকি ঐতিহাসিক নজির থেকে জানা যায়, খলিফা ওমর (রা.) অমুসলিমদের গির্জা বা উপাসনালয় (কানিসা) সুরক্ষার সুযোগ দিলেও মুসলিমদের সেখানে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে সম্পৃক্ত হওয়াকে নিরুৎসাহিত করেছেন।

অন্য ধর্মের উপাসনাকে সমর্থন না করার অর্থ এই নয় যে, তাদের অনুসারীদের অসম্মান করতে হবে; বরং ইসলাম ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও মানবিক মর্যাদার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সুরা আল-মুমতাহিনার ৮ নম্বর আয়াতে যারা ধর্মের কারণে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না, কিংবা তাদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত করে না, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ নিষেধ করেননি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও চুক্তি রক্ষা, প্রতিবেশীর অধিকার এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণের শিক্ষা রয়েছে। অতএব হিন্দু প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়, বিপদে সহযোগিতা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা নাগরিক দায়িত্ব পালনকে ধর্মীয় উপাসনায় অংশগ্রহণের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। ধর্মীয় বিশ্বাসে পার্থক্য থাকলেও মানবিক দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ নেই।

সব ধর্মের মানুষের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সহনশীলতা বজায় রাখা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। তবে এই সম্প্রীতি প্রদর্শনের অর্থ কোনোভাবেই ধর্মীয় বিধান ও তাওহিদের মূলনীতিকে জলাঞ্জলি দেওয়া নয়। নিজেদের ঈমান, আকিদা ও স্বতন্ত্র ইসলামি সংস্কৃতি বজায় রেখেই আমরা অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রতি উদারতা প্রকাশ করতে পারি। মণ্ডপে গিয়ে উৎসব প্রত্যক্ষ না করেও দূর থেকে পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসা বজায় রাখা সম্ভব। অতএব সাময়িক বিনোদন বা আনন্দের মোহ ত্যাগ করে আমাদের উচিত শরিয়তের বিধান মেনে চলা এবং তাওহিদের আলোয় নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করা।

লেখক: স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা

বাথরুমে অজু-গোসলের দোয়া পড়া যাবে কি

অ্যালগরিদমের ফাঁদে সময়, আত্মসমালোচনা কোথায়

নিত্যজীবনের ১০টি অবহেলিত সুন্নত

আকিদার নামে ঐক্যে ফাটল ধরানো ভারতীয় ষড়যন্ত্র: কাজী ইব্রাহীম

পেনশন ও মুক্তিযোদ্ধার ভাতা ওয়ারিশদের মধ্যে কীভাবে বণ্টন হবে

গোপনে বিবাহ করা স্ত্রীকে পারিবারিকভাবে আয়োজন করে পুনরায় বিবাহ করা যাবে কি

মুসলিম জাতির উদ্দেশে যে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন মুফতি কাজী ইব্রাহিম

আজ বিসর্জনে শেষ হবে দুর্গাপূজা

পূজায় নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তবে এতে অংশ নিলে ঈমান থাকবে না

শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিংয়ে নবীজির ১০ গুণ