হোম > ইসলাম ও জীবন

বিয়ে ও তালাকের সীমারেখা

উম্মেহানি বিনতে আবদুর রহমান

ভালোবাসার নরম চাদরে প্রতিটি হৃদয়েই এক অনির্বচনীয় আকুলতা ধরা দেয়; শরতের সতেজ পুষ্পের মতো প্রেমময় সুবাস মনকে মাতোয়ারা করে। এই গভীর অনুভূতির জন্যই আল্লাহ মানুষকে হালালের অকৃত্রিম স্বাদ উপভোগের অপার সুযোগ দিয়েছেন। সেই রহমতপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হয় বিয়ের পবিত্র বন্ধনের মাধ্যমে। প্রতিটি দাম্পত্যের শুরু হয় অসংখ্য স্বপ্ন, ভালোবাসা এবং একসঙ্গে বার্ধক্যে পৌঁছানোর অঙ্গীকার নিয়ে। প্রতারণা ছাড়া কোনো সম্পর্কই তালাকের সিদ্ধান্ত দিয়ে শুরু হয় না; বরং প্রত্যেকেই একটি শান্ত, নিরাপদ ও বরকতময় পরিবার গড়ে তুলতে চায়। কিন্তু জীবন সবসময় একই ছন্দে চলে না। কখনো তৃতীয় পক্ষের মিথ্যাচার, কখনো স্বামী-স্ত্রীর ভুল বোঝাবুঝি, কখনো ব্যক্তিত্বের সংঘাত, কখনো অপূর্ণ প্রত্যাশা, আবার কখনো দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অব্যক্ত কষ্টÑসম্পর্কের সুন্দর বুননকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়, ভেতর থেকে পচনশীল করে তোলে।

তবে প্রতিটি সংকটই বিচ্ছেদের দিকে গিয়ে শেষ হয় না। অনেক ভাঙনই ধৈর্য, ক্ষমা, আন্তরিক সংলাপ, আত্মসমালোচনা এবং সংশোধনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আবার জোড়া লেগে যায়। আবার এমন বাস্তবতাও রয়েছে, যখন একটি সম্পর্ক আর নিরাপদ থাকে না; বরং প্রতিদিনের ভয়, অপমান, নির্যাতন, প্রতারণা ও নিরাপত্তাহীনতার বিষাক্ত নাম হয়ে ওঠে সংসার। ইসলাম মানুষকে অন্তহীন যন্ত্রণার কারাগারে আবদ্ধ করে রাখেনি; বরং আবেগের পরিবর্তে হিকমাহ, ন্যায় ও কল্যাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে শিখিয়েছে।

দাম্পত্য জীবন শুধু দুটি মানুষের একসঙ্গে বসবাসের নাম নয়; বিয়ে মূলত কোরআনের ভাষায় ‘মাওয়াদ্দাহ’, ‘রাহমাহ’ এবং ‘সাকিনাহ’-এর ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি পবিত্র অঙ্গীকার। আল্লাহতায়ালা স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের লেবাস, তথা পোশাক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যারা একে অন্যের ত্রুটি আড়াল করবে, সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে, নিরাপত্তা দেবে এবং সম্মান রক্ষা করবে। দাম্পত্য জীবনে মতভেদ, রাগ, অভিমান কিংবা ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। একটি ভুল মানেই একজন মানুষকে হারিয়ে ফেলা নয়; একটি কঠিন সময় মানেই সম্পর্কের সমাপ্তি নয়। কখনো কখনো আন্তরিক ক্ষমা, অনুতপ্ত হৃদয় এবং সত্যিকারের ভালোবাসাÑগাঢ় দূরত্বও মুছে দিতে পারে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আত্মসমালোচনা ও অনুতপ্ত হৃদয়। এই মানসিকতা জাগ্রত হলে একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়।

ইসলাম কখনো তালাককে প্রথম সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করেনি; বরং প্রতিটি সম্পর্ক রক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টা করার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন—‘যদি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা করো, তবে একজন সালিশ পুরুষের পরিবার থেকে এবং একজন সালিশ নারীর পরিবার থেকে নিয়োগ করো। তারা উভয়ে মীমাংসা চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিলন ঘটিয়ে দেবেন।’ (সুরা আন-নিসা : ৩৫)

এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয়—নিজের ভুলও নিরপেক্ষভাবে খুঁজে দেখুন। পরস্পরের সঙ্গে সম্মানজনক ও খোলামেলা আলোচনা করুন। উভয় পরিবারের জ্ঞানী ও ন্যায়পরায়ণ মানুষদের সম্পৃক্ত করুন। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আলেম বা বৈবাহিক কাউন্সেলরের সহযোগিতা নিন। ইস্তিখারা, ইস্তিশারা এবং গভীর চিন্তার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিন।

সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরই ইসলাম তালাকের বৈধ পথ উন্মুক্ত রেখেছে। সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা অপরিহার্য; তবে যেখানে সব চেষ্টা বারবার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, সেখানে ইসলাম কাউকে জোর করে বোঝা বহন করতে বাধ্য করেনি।

ইসলাম যেমন বিধবা সতী নারীদের সম্মান করতে শেখায়, তেমনি তালাকপ্রাপ্তা আল্লাহভীরু নারীদের প্রতিও সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দেয়। তারা কখনোই অসম্মানের পাত্র নন; বরং কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন গড়ার প্রচেষ্টায় নিবেদিত একজন মুমিনাহ হিসেবে সম্মানের দাবিদার। সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে—যত নির্যাতনই হোক, সংসার টিকিয়ে রাখাই নাকি সবচেয়ে বড় নেকি। অথচ ইসলাম কখনো জুলুমকে ইবাদত বানায়নি। যে ঘরে প্রতিদিন অপমান, গালি, মারধর, মানসিক নির্যাতন, অবিশ্বাস, চরিত্রহনন, ভয়, ব্ল্যাকমেইল কিংবা সন্তানদের মানসিক ধ্বংস চলতে থাকেÑসেই সম্পর্ক প্রকৃত অর্থে একটি বৈবাহিক বন্ধন নয়; বরং একটি Toxic Relationship. এমন সম্পর্কে বছরের পর বছর নিজেকে ধ্বংস করে ফেলা কিংবা আত্মহত্যার কথা ভাবা ইসলামের শিক্ষা নয়।

অনেকে মনে করেন, তালাক মানেই ঈমানের ব্যর্থতা। কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। সাহাবায়ে কিরামের যুগেও তালাক ও খোলার ঘটনা ঘটেছে। জায়েদ ইবন হারিসা (রা.) ও জয়নব বিনতে জাহশ (রা.)-এর দাম্পত্য বিচ্ছেদ ঘটে। পরে আল্লাহর নির্দেশে রাসুলুল্লাহ (সা.) জয়নব (রা.)-কে বিয়ে করেন। (দ্রষ্টব্য, সুরা আল-আহজাব : ৩৭)

আবার সাবিত ইবন কায়স (রা.)-এর স্ত্রী জামিলা বিনতে সালুল (কিছু বর্ণনায় হাবিবা নামেও উল্লেখ রয়েছে) স্বামীর দ্বীন বা চরিত্র নিয়ে কোনো অভিযোগ করেননি; কিন্তু তার সঙ্গে বৈবাহিক জীবন চালিয়ে যেতে পারছিলেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে খোলার অনুমতি দেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে—তালাক বা খুলা ইসলামে কোনো নিষিদ্ধ বিষয় নয়; তবে তা কখনো আবেগের সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং প্রয়োজনের শেষ সমাধান ছিল। যদি—ভুলের জন্য আন্তরিক অনুতাপ থাকে; পরিবর্তনের বাস্তব লক্ষণ দেখা যায়; পারস্পরিক সম্মান জীবিত থাকে; সন্তানদের কল্যাণে উভয়েই আন্তরিক হন; সম্পর্কের ভিত্তি পুরোপুরি ধ্বংস না হয়ে থাকে—তাহলে নতুন করে শুরু করার চেষ্টা করাই উত্তম। অনেক সম্পর্কই দ্বিতীয় সুযোগের মাধ্যমে আগের চেয়েও সুন্দর হয়েছে। কারণ তারা অহংকার (Ego) নয়, ক্ষমা ও সংশোধনকে বেছে নিয়েছে। আবার কখনো কখনো বিচ্ছেদেই কল্যাণ নিহিত থাকে—দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন চলতে থাকে; নিরাপত্তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত হয়ে যায়; বারবার বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা ঘটে; আসক্তি, সহিংসতা বা জুলুম সংশোধনের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়; মিথ্যা, কুফরি এবং আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করা বাস্তবিকভাবেই অসম্ভব হয়ে পড়ে—তখন শরিয়ত বিচ্ছেদের বৈধ পথ রেখেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন—‘যদি তারা পৃথক হয়ে যায়, তবে আল্লাহ নিজ প্রাচুর্য দ্বারা প্রত্যেককে অমুখাপেক্ষী করে দেবেন।’ (সুরা আন-নিসা : ১৩০)

এই আয়াত আমাদের আশ্বস্ত করে—কখনো কখনো বিচ্ছেদও আল্লাহর পক্ষ থেকে নতুন রহমত, নতুন সম্ভাবনা এবং নতুন জীবনের সূচনা হতে পারে। দাম্পত্য জীবনের সংকটকে কেবল একটি আইনি সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি মূলত একটি গভীর সামাজিক সংকট। দীর্ঘদিনের অভিমান, যোগাযোগের অভাব, অহংকার, আত্মকেন্দ্রিকতা, পারস্পরিক বোঝাপড়ার ঘাটতি এবং পরিবারের অন্য সদস্যের অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ—অনেক সম্পর্ককে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়, যেখানে তালাকই যেন একমাত্র পথ বলে মনে হয়। অথচ অধিকাংশ ভাঙনই শুরুতেই সচেতনতা, আন্তরিক সংলাপ, ধৈর্য, পারিবারিক সহযোগিতা এবং সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। একজন অভিজ্ঞ শরিয়াহ গবেষকের ভাষায়— ‘আজকের ক্রাইসিসের বড় চরিত্রটা আইনি নয়; এর মূল বাস্তবতা সামাজিক।’

তাই কেবল তালাকের মাসআলা জানাই যথেষ্ট নয়; তালাক প্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে এমন পরিস্থিতিও আসতে পারে, যেখানে সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর বিচ্ছেদই একমাত্র বাস্তবসম্মত, নিরাপদ এবং শরিয়তসম্মত সমাধান হয়ে দাঁড়ায়। তখন ইসলাম কোরআনের ভাষায়, ‘তাসরিহুন বি ইহসান’—অর্থাৎ উত্তম রূপে বিদায়—এর শিক্ষা দিয়েছে; যেখানে ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও সৌজন্য প্রাধান্য পায়।

একটি সুন্দর দাম্পত্য জীবন মানে দুজন নির্ভুল মানুষের একসঙ্গে বসবাস নয়; বরং যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একে অন্যের ভুল বুঝতে শেখে, ক্ষমা করতে শেখে এবং প্রয়োজনে নিজেকেও বদলে নিতে শেখে—তাদেরই সুকুনের গল্প।

যদি চেষ্টার সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, যদি সম্পর্কটি কেবল জুলুম, ভয়, অপমান এবং Toxicity-এর আরেকটি নাম হয়ে দাঁড়ায়, তবে মনে রাখবেন—ইসলাম আপনাকে অনন্তকাল সেই আগুনে পুড়তে বলেনি। একটি মর্যাদাপূর্ণ তালাক অনেক সময় একটি অপমানজনক সম্পর্কের চেয়ে উত্তম। আর আল্লাহর হারামকৃত আত্মহত্যা বা হত্যার চেয়ে শরিয়তসম্মত বিচ্ছেদ নিঃসন্দেহে অসীম কল্যাণকর পথ। কখনো ধৈর্য ও ক্ষমাই একটি সংসারকে জান্নাতের পথে এগিয়ে দেয়। আবার কখনো মর্যাদাপূর্ণ বিদায় একজন মুমিনের ঈমান, জীবন ও সম্মান রক্ষা করে। ইসলাম মানুষকে জুলুমের নিচে পিষ্ট হয়েও বেঁচে থাকতে বাধ্য করে না; বরং ন্যায়, প্রজ্ঞা, মর্যাদা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির আলোকে জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার পথ দেখায়।

আল্লাহ আমাদের হেদায়েতের পথে অবিচল রাখুন, আমাদের সত্যনিষ্ঠ ন্যায়পরায়ণদের সঙ্গে রাখুন, আমাদের সন্তানদের হৃদয় তাকওয়ায় পূর্ণ করে দিন, জুলুমের কঠোরতা থেকে আমাদের হেফাজত করুন, নিশ্চয়ই দুনিয়ার সমস্ত জালিমের হিসাবরক্ষক হিসেবে আল্লাহ আজ্জা ওয়াজাল যথেষ্ট।

শরীয়াহর দৃষ্টিতে সম্পত্তি হস্তান্তর বিলে যেসব সমস্যা

হেবা কী, কখন করা যাবে, কে করতে পারেন, কার জন্য করা যাবে

অ্যাপ দিয়ে ইসলাম চর্চায় আত্মিক চাহিদা কতটা মেটে

‘রাসুলের জীবনী শুধু পড়লে হবে না, তার আদর্শকে জীবনের অংশ করে তুলুন’

সৌদি আরব গেছেন সিরাত অলিম্পিয়াডের ওমরাহ বিজয়ী নাজিফা খান

আবেগের পরিণতি অশুভ না হোক

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মুমিনের পরিচয়

একনজরে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর (রা.)

সুরা কাহফ: ঢাল ও আলোকবর্তিকা

বিশ্ব ইজতেমার প্রাথমিক তারিখ ঘোষণা