মাজার আরবি শব্দ। অর্থ জিয়ারত করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের মাজার শরিফ রয়েছে। এই দেশে অসংখ্য পীর, সুফি, দরবেশ, ফকির যাদের দুনিয়ার প্রতি কোনো লোভ-লালসা ছিল না, তাদের মাজার রয়েছে। মাজারে ভক্তি, শ্রদ্ধা, সম্মান ও আদবের সঙ্গে জিয়ারত করে তৃপ্তির ডেকুর তুলে ওলি-প্রেমিকরা। যারা জিয়ারত করে, তারা কখনোই মাজারে ঘুমন্ত ব্যক্তিকে দেখেনি। তবু শ্রদ্ধা সম্মানের কমতি নেই। ছুটে যায় জিয়ারতে। এর বাস্তব প্রমাণ হজরত শাহজালাল ও শাহপরানসহ বাংলার অসংখ্য ওলির মাজার। মাজার তথা কবর জিয়ারতে মৃত্যুর কথা স্মরণ হয়। এ বিষয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন থেকে জিয়ারত করো। কারণ তা আখিরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়।’ (ইবনে মাজাহ)
মাজারে ঘুমন্ত ব্যক্তিরা এই দেশে ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে দিয়েছিলেন। তারা খানকা, মসজিদ, রাস্তা নির্মাণসহ পানির জন্য বড় বড় দিঘি পর্যন্ত খনন করেছিলেন। নোঙরখানা, মুসাফিরখানা, খানকায়Ñসবসময় থাকত জ্ঞানপিপাসুদের আস্তানা । তারা আল্লাহ ও নবীকে পাওয়ার সহজ উপায়, আত্মার খোরাক, আত্মশুদ্ধি, সুফিতত্ত্ব, ইলমে তাসাউফ শিক্ষা দিতেন। নিজেকে অন্যের তরে বিলিয়ে দিতেন।
তবে আজ অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, মাজারকে পুঁজি করে একদল অসাধু ব্যক্তি রমরমা ব্যবসা করে চলছে। মাজারে মানত, দান-সদকার টাকার কোনো হিসাব না দিয়েই নিজের আখের গোছাচ্ছে। সন্তানদের লেখাপড়া, সম্পত্তি ক্রয়, ভোগ-বিলাসিতায় নিজের জীবনকে অতিবাহিত করছে। অথচ মাজারওয়ালা নিজের জন্য কিছুই করেননি। নিজের যা ছিল তা সবই অন্যের জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন। অল্পসংখ্যক মাজারে মসজিদ, খানকা, এতিমখানা থাকলেও অসংখ্য মাজারে দশের উপকারিতার কিছুই খুঁজে পাওয়া মুশকিল। মাজার কমিটি হওয়ার জন্যও চলে দৌড়ঝাঁপ।
মাজার কর্তৃপক্ষের উচিত মাজারওয়ালার জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিচালনা করা। শিরক, বিদাত, মাদক, অনৈতিক ও ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণাগার, এতিম ও মুসাফিরখানা, হাসপাতালসহ দেশ ও দেশের মানুষের উপকারে এগিয়ে আসতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় করো। তিনি নিশ্চয় কঠোর শাস্তিদাতা।’ (সুরা মায়েদা : ২)
মাজারে ধর্ম, সমাজ ও দেশবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড সংঘটিত হলে দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাই বলে মাজারে হামলা, অগ্নি, ভাঙচুর করার দায়িত্ব কোনো গোষ্ঠী বা দলের নয়। স্বাধীন মানুষের ওপর রাষ্ট্রের প্রধান বা তার নিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ আইন প্রয়োগ করতে পারবে না বলে জানিয়েছেন ইমাম শাফেয়ি (রহ.)। এ জন্য নিজ অবস্থান থেকে শরিয়া মোতাবেক সব ধরনের ধর্মের নামে ব্যবসাসহ জুলুম-নির্যাতন, সুদ, ঘুস ও অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান তৈরি করা জরুরি । শুধু মাজারে হামলা করে শান্ত দেশকে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা মোটেই উচিত নয় ।
আজ মাজারে অন্যায় দেখে অগ্নিসংযোগ, হামলা, লুটপাট, আগামীকাল অন্য কোনো মাদরাসা, খানকা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অন্যায় হলে মব তৈরি, ভাঙচুর, আগুনে জ্বালানো ঠিক হবে না। এভাবে শত্রুতা বৃদ্ধি পাবে। অন্যরা স্বার্থ হাসিল করবে।
আসুন হিংসা নয়, ভালোবাসা দিয়ে জয় করে মিলেমিশে বসবাস করি। স্বাধীন এই দেশে সবাইকেই স্বাধীনভাবে বাঁচতে দিই। আল্লাহ প্রত্যেকের মনের খবর জানেন। আমরা বিচারক নই। একমাত্র মহান আল্লাহ শ্রেষ্ঠ বিচারক। অন্যের দোষ দেখার আগে নিজের দোষ খুঁজে সংশোধন হয়ে ওলি হওয়ার চেষ্টা করি। রহমতের দোয়া করি, অন্যের জন্য ও নিজের জন্য এবং নিজ মাতৃভূমির জন্য।