ঝরনার প্রবাহ চোখে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। স্বচ্ছ জলধারার সেই শীতল সৌন্দর্য কতটা প্রশান্তির, শুধু সান্নিধ্যে আসা মানুষই অনুভব করতে পারে। এ ধারা যেমন নীরবে পাথরের বুক ছুঁয়ে নেমে আসে, এর স্নিগ্ধতায় চারপাশের ক্লান্তি ধুয়ে যায়; কন্যাসন্তানও তেমন গাঢ় এক প্রশান্তি হয়ে ঘরে আসে। যার হাসি সকালের শিশির, কখনো যার মায়াভরা ডাক পাখির মায়াবী কিচিরমিচিরের মতো। কন্যাসন্তানের উপস্থিতির প্রভাব পরিবারের বিষণ্ণতা দূর করে।
কন্যা বাবার ক্লান্ত মুখে এনে দেয় হাসি, মায়ের হৃদয়ে জাগায় অদৃশ্য এক পরিতৃপ্তি। আর যখন কন্যাকে ঈমান, হায়া, আদব ও তাকওয়ার ছায়ায় গড়ে তোলা হয়, তখন তার কোমল অস্তিত্ব শুধু দুনিয়ার প্রশান্তিতেই থেমে থাকে না; আল্লাহর ইচ্ছায় সে হয়ে ওঠে বাবার জন্য আখিরাতেরও এক সম্ভাব্য রহমতের দরজা।
অসুস্থতায় কন্যার খেদমত, জায়নামাজে অঝোর ধারায় মোনাজাতে অশ্রুপাত—মা-বাবার জন্য অমিয় রহমতের সুধা। কন্যা শুধু একটি সন্তান নয়; সে আল্লাহর দেওয়া এক আমানত, অনন্য রহমত, উচ্চতর রিজিক। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) যখন শুনতেন কারো কন্যাসন্তান হয়েছে, তিনি বলতেন, তাকে গিয়ে বলো, ‘নবীরা হলেন কন্যাসন্তানের বাবা।’ কন্যাকে যদি ঈমান, তাকওয়া, আদব ও সুন্দর চরিত্রের আলোকে গড়ে তোলা যায়, তবে তার অস্তিত্ব বাবার জন্য দুনিয়ার প্রশান্তি আর আখিরাতে নাজাতের অসিলা।
জাহেলিয়াতের অন্ধকারে কন্যাসন্তানের জন্মকে কেউ কেউ লজ্জা ও বোঝা মনে করত। কোরআন সেই মানসিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে—‘যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়।’ (সুরা আন-নাহল : ৫৮)
নবীজি (সা.) কন্যাকে বোঝা হিসেবে দেখেননি; বরং তাদের প্রতি উত্তম আচরণকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষার কারণ বলেছেন। আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কন্যাদের দায়িত্ব গ্রহণ করে তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করবে, তারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে ঢাল হবে।’ (বুখারি : ৫৯৯৫)
হাদিসের সত্যতা কখনো কখনো জীবন্ত হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়ায় সত্য ঘটনার হৃদয়বিদারক দৃশ্য হয়ে। সম্প্রতি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল এলাকায় চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তুবা তার বাবার জন্য এমনই এক মায়াভরা দৃশ্যের জন্ম দিয়েছে। তার বাবা অনিক সরদারকে চুরির অভিযোগে বেঁধে মারধরের অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে ছোট্ট তুবা ছুটে যায় বাবার কাছে। অসহায় বাবাকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। কাঁদতে কাঁদতে অনুরোধ করে—‘আমার বাবাকে আর মাইরো না, আমার বাবাকে ছেড়ে দাও। আমার বাবা ভালো বাবা।’ পরে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। উজিরপুরের ইউএনও মো. আলী সুজা পরিবারটির পাশে দাঁড়ান। শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অনিক সরদারকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য তিন মাসের জন্য রিহ্যাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
ছোট্ট তুবার এই কান্নাভেজা মুখ হয়ে ওঠে মানুষের হৃদয়ে আবেগের ঢেউ। তুবার বয়স অল্প; কিন্তু বাবার জন্য তার ভালোবাসা বয়সের সীমানা মানেনি। এখানেই কন্যাসন্তানের সৌন্দর্য। তাকে শুধু পৃথিবীর জন্য বড় করলে সে হয়তো পৃথিবীর পথ চিনবে; কিন্তু তাকে দ্বীনের জন্য গড়ে তুললে সে রবের পথ চিনবে, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য শিখবে, মায়া ও মমতার অর্থ বুঝবে, মা-বাবার প্রয়োজনে শক্ত হয়ে পাশে থাকবে, মমতার হাত বাড়িয়ে।
তাই কন্যা জন্মালে আফসোস নয়, আলহামদুলিল্লাহ বলতে হয় বারবার। যাদের কন্যা নেই, এই পৃথিবীর জরাজীর্ণ ভূমি তাদের জন্য আরো শুষ্ক এবং আরো দুর্গম হয়ে ওঠে। কারণ আজ যে কন্যা বাবার মুখে এক টুকরো রুটি তুলে দেয়, কাল সেই কন্যাই হয়তো বাবার জন্য দুনিয়ার সবচেয়ে কোমল আশ্রয় আর আখিরাতের অবারিত রহমতের একটি দরজা হয়ে উঠবে।
যে ঘরে একটি কন্যা জন্ম নেয়, তাকে দ্বীনি পরিবেশ এবং ইলম দিয়ে মা-বাবা গড়ে তোলেন; সে ঘরে রহমতের দরজা খুলে যায়। আর যে বাবা সেই কন্যাকে ঈমান, হায়া, আদব ও তাকওয়ার ছায়ায় বড় করেন, তিনি শুধু একটি সন্তান মানুষ করেন না; তিনি নিজের জন্য আখিরাতের একটি সম্ভাব্য সওয়াবের বাগান গড়ে তোলেন আর উম্মাহর জন্য গড়ে তোলেন ঈমানদার প্রজন্মের এক মুসলিম জননীকে।