হোম > ধর্ম ও ইসলাম

নিকাবে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা

মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান

সম্প্রতি বিএনপি নেতা মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর একটি বক্তব্যে বলেছেন, ‘নিকাব মুসলমানদের ড্রেসই নয়...। ইহুদি নারীরা যখন বেশ্যাবৃত্তি করত অথবা অন্য কোনো নিষিদ্ধ কার্যক্রম করত, তখন নিকাব পরত।’ এই বক্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই বহু মানুষ বিস্মিত ও আহত হয়েছেন। কারণ বিষয়টি কেবল একটি পোশাকের আলোচনা নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মীয় পরিচয়, নারীর মর্যাদা এবং সমাজের সাধারণ সৌজন্যবোধ। একজন নারী কী পরবেন, কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবেন, এটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তকে ‘অনৈতিকতা’ বা ‘অপরাধ’-এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া একটি সভ্য সমাজের ভাষা হতে পারে না।

প্রথমেই একটি ন্যায্য কথা বলা দরকার—অপরাধের দায় অপরাধীর, পোশাকের নয়। কোনো নারী নিকাব পরলেই তিনি সন্দেহজনক, এমন ধারণা তৈরি করা মানে লক্ষ কোটি পর্দানশীন নারীকে অবমূল্যায়ন করা। পোশাককে কেন্দ্র করে নারীকে চরিত্রগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা নারীর সম্মানবোধকে দুর্বল করে, সমাজকে অশালীন করে।

নিকাব কি মুসলিম সমাজে অচেনা কিছু?

নিকাবকে ‘মুসলমানদের ড্রেস নয়’ বলে এভাবে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার আগে ইসলামের প্রাথমিক উৎসগুলো দেখা জরুরি। সহিহ বুখারিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত আছে— ‘ইহরামরত অবস্থায় নারীরা মুখে নিকাব এবং হাতে হাতমোজা পরিধান করবে না।’ (বুখারি : ১৮৩৮)। এই হাদিস খুব স্পষ্ট একটি ইঙ্গিত দেয়। ইহরাম হলো বিশেষ ইবাদতের অবস্থা; সেখানে কিছু পোশাক বা আচরণে আলাদা বিধান থাকে। কিন্তু যেটি লক্ষণীয়—নিকাব ও হাতমোজা ইহরামের সময়ে নিষিদ্ধ বলা হয়েছে। আর একটি জিনিস সমাজে পরিচিত না হলে, সাধারণভাবে ব্যবহৃত না হলে, তার ব্যাপারে আলাদা নিষেধাজ্ঞা আসার কথাও নয়। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, রাসুল (সা.)-এর যুগে বহু নারী নিকাব পরতেন, হাতমোজাও ব্যবহার করতেন। অর্থাৎ, নিকাব মুসলিম সমাজে সম্পূর্ণ অচেনা বা বহিরাগত কোনো বিষয় নয়; বরং ইসলামের প্রথম যুগের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে এটি পরিচিতভাবে যুক্ত ছিল।

এছাড়া উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-এর পর্দা ও সংযমের বিষয়েও হাদিসে নানা বর্ণনা আছে। ইসলামি জীবনবোধে পর্দা ছিল শালীনতার স্বাভাবিক সংস্কৃতি। তাই নিকাবকে অসম্মান করার মধ্যে ইতিহাস-বিচ্ছিন্নতা যেমন আছে, তেমনি আছে ধর্মীয় অনুভূতিতে অপ্রয়োজনীয় আঘাত।

নিকাব নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু মর্যাদা নষ্ট করা কাম্য নয়

নিকাব ফরজ কি না, ফিকহি আলোচনায় মতভেদ রয়েছে। কেউ একে বাধ্যতামূলক বলেন, কেউ উত্তম বলেন, কেউ সমাজভেদে ব্যাখ্যা করেন। তবে যা-ই হোক, একটি বিষয় পরিষ্কার—পর্দানশীন নারীকে অপমান করার সুযোগ এতে তৈরি হয় না। ইসলামি জ্ঞানধারায় বহু প্রসিদ্ধ আলেম নিকাবকে অন্তত অধিক সংযমপূর্ণ ও নিরাপদ পথ হিসেবে দেখেছেন। কেউ নিকাব বেছে নিলে তা হতে পারে তার তাকওয়া, সততা, নিরাপত্তাচেতনা কিংবা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সিদ্ধান্ত। তাকে বিদ্রুপ করা নয়, বরং তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করা সুশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আবশ্যক।

‘ইহুদি নারী’ প্রসঙ্গ এনে নিকাবকে কলুষিত করা অশোভন সাধারণীকরণ

মোশাররফ আহমেদ ঠাকুরের বক্তব্যে সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো তিনি নিকাবকে ‘বেশ্যাবৃত্তি’ বা ‘নিষিদ্ধ কার্যক্রম’-এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এটি নিছক ভুল তথ্য নয়; এটি সামাজিকভাবে বিপজ্জনক। কারণ এতে নিকাবধারী নারীর প্রতি একটি অপমানজনক মানসিক কাঠামো গড়ে ওঠে, যেন নিকাব মানেই সন্দেহজনক, গুপ্ত অপরাধ; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ঠাকুরের এ বক্তব্য সম্পূর্ণ স্বকপোলকল্পিত। ইতিহাসের কোথাও ইহুদি নারীদের অন্যায় করে নিকাব করার কথা বর্ণিত হয়নি। বর্তমান সময়ে কোনো কোনো অসতী নারীর চিত্রকে তিনি অতীত ইতিহাসে প্রক্ষিপ্ত করেছেন।

সমাজে অপরাধ ঘটতে পারে, এটা সত্য। অপরাধ দমন হবে আইন ও বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে। অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হবে, এটিই ন্যায়। কিন্তু একটি পোশাককে অপরাধের প্রতীক বানিয়ে দেওয়া মানে ধর্মীয় নারীদের গণহারে সন্দেহের আসামি বানিয়ে দেওয়া। এটি ন্যায্যতা নয়, এটি অপবাদ ও অন্যায়Ñঅসভ্য মানসিকতা।

যদি কেউ নিকাব পরে অপরাধ করে, সেটি ব্যক্তির অপরাধ। যেমন কেউ শাড়ি পরে অপরাধ করলে শাড়ি অপরাধের পোশাক হয়ে যায় না; কেউ স্যুট পরে দুর্নীতি করলে স্যুটকে দোষী করা যায় না। ঠিক তেমনি নিকাবকে কুৎসিত ইঙ্গিতের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যুক্তিসংগত নয়।

নারীর পোশাক : অধিকার ও স্বাধীনতার অংশ

বাংলাদেশে বহু নারী নিকাব করেন, বহু নারী হিজাব করেন। কেউ শাড়ি-ওড়নায়ও পর্দা রক্ষা করেন। নারী কী পরবেন—এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একান্তভাবে নারীরই। রাষ্ট্র নাগরিককে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিয়েছে; সেই স্বাধীনতার স্বাভাবিক অংশ হলো পোশাক নির্বাচনের স্বাধীনতা। কাজেই কারো নিকাব পরাকে ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘অপরাধমূলক’ বানিয়ে উপস্থাপন করা গণতান্ত্রিক ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। বিশেষত নতুন বাংলাদেশের নতুন পরিবেশে তা অকল্পনীয়।

এছাড়া একটি বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না, অনেক নারী নিকাব পরেন নিজেদের নিরাপত্তা, মানসিক স্বস্তি ও আত্মমর্যাদার কারণে। তারা চান মানুষ তাদের শরীর নয়, তাদের ব্যক্তিত্ব দেখুক। হিজাব-নিকাব তাদের কাছে কোনো লজ্জা নয়; বরং পর্দানশিন নারীর কাছে তা সম্মান ও সংযমের প্রতীক।

কোরআন ও হাদিসের আলোকে একজন মুসলিম নারী যদি পরিপূর্ণ পর্দা পালনে আগ্রহী হন, তাহলে তিনি চেহারা ঢেকে রাখতে বাধ্য। এটি তার ধর্মীয় নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতীক। রাজনীতি থাকবে, বিতর্ক থাকবে; কিন্তু রাজনৈতিক কথাবার্তায় ধর্মীয় পোশাককে টেনে এনে নারীর সম্মানকে আঘাত করা চরম অসুস্থতার লক্ষণ। মোশাররফ আহমেদ ঠাকুরের বক্তব্যে যে কটূক্তি ও অসম্মানজনক ইঙ্গিত আছে, তা সংশোধন করা দায়িত্বশীলতার দাবি। অন্তত এটুকু বোঝা জরুরি—নিকাব কোনো অপরাধের প্রতীক নয়, এটি বহু নারীর বিশ্বাস ও শালীনতার একটি পরিচিত প্রকাশ।

আমরা চাই, সমাজে বহুমত বহু চিন্তা থাকবে, কিন্তু সৌজন্য ও অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে; রাজনীতি থাকবে, কিন্তু অন্যায় আক্রমণ থাকবে না। নারীর পোশাক নিয়ে উপহাস নয়, বরং নারীর মর্যাদা রক্ষার পক্ষে দাঁড়ানো সভ্যতার মানদণ্ড।

লেখক : উত্তর কোরিয়াপ্রবাসী আলেম

শীতকালীন ভ্রমণ, সৃষ্টিতে খুঁজি স্রষ্টাকে

আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যে নবীজি

ইনসাফের সমাজ প্রতিষ্ঠায় তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে

যে বছরে হজ আসবে ২ বার, ঈদ হবে ৩টি

মিথ্যা সাক্ষ্য শিরকের সমতুল্য পাপ

তীব্র শীতে তায়াম্মুম

বন্ধুর মুখে হাসি ফোটানোর অলৌকিক আয়োজন

ফরজ ও নফল ইবাদত : বিভ্রান্তি ও বাস্তবতা

প্রথম শহীদ সুমাইয়া বিনতে খাব্বাত (রা.)

গত বছর মসজিদে কুবায় আড়াই কোটি মুসল্লির আগমন