হোম > ইসলাম ও জীবন

আশুরার তাৎপর্য ও ইবাদত

আসআদ শাহীন

মহররম ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম। এ মাসের দশম দিন—অর্থাৎ আশুরা, ইসলামের ইতিহাসে এক বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ও বরকতময় দিন হিসেবে পরিগণিত। যুগে যুগে এ দিনটি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। তবে দুঃখজনকভাবে আশুরাকে কেন্দ্র করে সমাজে বহু বানোয়াট কাহিনি, দুর্বল বর্ণনা এবং ভিত্তিহীন বিশ্বাসও প্রচলিত রয়েছে। তাই এ দিনের প্রকৃত গুরুত্ব ও ফজিলত সহিহ হাদিসের আলোকে জানা জরুরি।

আশুরার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য

সহিহ হাদিস থেকে আশুরা সম্পর্কে যে বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, সেগুলো হলো—

১. এটি একটি বরকতময় ও সম্মানিত দিন

আশুরা ইসলামের দৃষ্টিতে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন। এ দিনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আল্লাহতায়ালার অসংখ্য অনুগ্রহ ও রহমতের স্মৃতি।

২. এ দিনে মুসা (আ.) ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি লাভ করেন

আল্লাহতায়ালা এ দিনে বনী ইসরাইলকে তাদের চিরশত্রু ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দান করেন এবং ফেরাউনকে তার বাহিনীসহ সাগরে ডুবিয়ে ধ্বংস করেন।

৩. মুসা (আ.) শুকরিয়াস্বরূপ রোজা পালন করতেন

এই মহান নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য মুসা (আ.) আশুরার দিনে রোজা পালন করতেন। (বুখারি : ২০০৪; মুসলিম : ২৬২৫)

৪. রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজা রাখতেন এবং অন্যদেরও উৎসাহিত করতেন

প্রিয়নবী (সা.) আশুরার রোজা পালন করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও এ রোজার প্রতি উৎসাহিত করতেন। (মুসলিম : ২৬২৫)

৫. এ দিনে কাবা শরিফে গিলাফ পরানো হতো

জাহিলি যুগে এবং ইসলামের প্রারম্ভিক সময়ে আশুরার দিনে কাবা শরিফে নতুন গিলাফ পরানোর প্রচলন ছিল। (বুখারি : ১৫৯২) বর্তমানে এই ঐতিহ্য সৌদি সরকার ১ মহররমে সাড়ম্বরে পালন করে আসছে। এ বছরও মহররমের প্রথম দিন কাবার গিলাফ পরিবর্তন করা হয়েছে।

৬. খায়বারের ইহুদিরা এ দিনকে উৎসবের দিন হিসেবে পালন করতেন

খায়বারের অধিবাসীরা আশুরার দিনে রোজা রাখতেন এবং এটিকে আনন্দ-উৎসবের দিন হিসেবে গণ্য করতেন। (মুসলিম : ২৬২১)

৭. কুরাইশরাও জাহিলি যুগে আশুরার রোজা পালন করতেন

মক্কার কুরাইশ গোত্র ইসলাম-পূর্ব যুগেও এ দিনে রোজা রাখতেন। (মুসলিম : ২৬৩৭)

আশুরার রোজার ফজিলত

১. বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা

আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—‘আমি আল্লাহতায়ালার কাছে আশা রাখি যে, আশুরার দিনের রোজা বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে।’ (মুসলিম : ১১৬২)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আশুরার রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন—‘এটি বিগত এক বছরের গুনাহ মুছে দেয়।’ (মুসলিম : ২৮০৪)

২. রমজানের পর সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ নফল রোজা

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আশুরার দিনের মতো অন্য কোনো দিনের রোজাকে এত গুরুত্ব দিতে দেখিনি। অনুরূপভাবে রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসের রোজাকেও তিনি এত গুরুত্ব দেননি। (মুসলিম : ১১৩২)

বিভিন্ন সময়ে আশুরার রোজার বিধান

হাদিসগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আশুরার রোজার বিধান ধাপে ধাপে বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করেছে।

প্রথম পর্যায় : মক্কা জীবন

রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কায় অবস্থানকালে নিজে আশুরার রোজা পালন করতেন; তবে সাধারণ মুসলমানদের জন্য বিশেষভাবে এর নির্দেশ দিতেন না। আয়েশা (রা.) বলেন, জাহিলি যুগে কুরাইশরা আশুরার রোজা পালন করত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও এ রোজা রাখতেন। (বুখারি : ২০০২; মুসলিম : ১১২৫)

দ্বিতীয় পর্যায় : মদিনায় আগমনের পর

মদিনায় হিজরতের পর নবী (সা.) লক্ষ্য করলেন, ইহুদিরা এ দিনে রোজা পালন করছে। কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা জানায়, এ দিনে আল্লাহতায়ালা মুসা (আ.) ও তার সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন—‘মুসা (আ.)-এর সঙ্গে সম্পর্কের দিক থেকে আমরা তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার।’ অতঃপর তিনি নিজে রোজা রাখলেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (বুখারি : ২০০৪; মুসলিম : ২৫২৬)

এ পর্যায়ে আশুরার রোজার প্রতি এত গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল যে, সাহাবায়ে কেরাম তাদের শিশুসন্তানদেরও রোজা রাখতে উৎসাহিত করতেন। (বুখারি : ১৯৬০; মুসলিম : ১১৩৬)

তৃতীয় পর্যায় : রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর

যখন রমজানের রোজা ফরজ করা হলো, তখন আশুরার রোজা আর বাধ্যতামূলক রইল না। বরং এটি নফল আমলে পরিণত হলো। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেনÑ‘যে ইচ্ছা করবে আশুরার রোজা রাখবে আর যে ইচ্ছা করবে রোজা রাখবে না।’ (বুখারি : ২০০১)

চতুর্থ পর্যায় : জীবনের শেষ দিকে

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য পরিহারের জন্য ভবিষ্যতে নবম মহররমও রোজা রাখার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, সাহাবায়ে কেরাম যখন জানালেন যে ইহুদি ও খ্রিষ্টানরাও এ দিনের সম্মান করে, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন—‘ইনশাআল্লাহ, আগামী বছর আমরা নবম তারিখেও রোজা রাখব।’ কিন্তু পরবর্তী বছর আসার আগেই তিনি ইন্তেকাল করেন। (মুসলিম : ১১৩৪)

আশুরার রোজা পালনের উত্তম পদ্ধতি

ফুকাহায়ে কেরামের মতে, আশুরার রোজার সঙ্গে আরেকটি রোজা মিলিয়ে রাখা মুস্তাহাব। অর্থাৎ—৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম, দুই দিন রোজা রাখা উত্তম। এর মাধ্যমে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের অনুকরণ থেকে বিরত থাকা যায়। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৩৭৫; বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ২, পৃ. ৭৯)

শুধু ১০ মহররমে রোজা রাখা কি গুনাহ

অনেকের ধারণা, শুধু আশুরার দিন রোজা রাখা গুনাহ বা নিষিদ্ধ। বাস্তবে এ ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। কারণ ৯ বা ১১ তারিখের রোজা মিলিয়ে রাখা ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব ও অধিক ফজিলতপূর্ণ আমল। আশুরার দিনের যে ফজিলত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তা শুধু ১০ মহররমের রোজা রাখার মাধ্যমেই অর্জিত হয়। অবশ্য ইহুদিদের সঙ্গে বাহ্যিক সাদৃশ্য পরিহারের জন্য আরেকটি রোজা সংযুক্ত করা অধিক উত্তম।

আশুরার রোজার তিন স্তর

আল্লামা ইউসুফ বানুরি (রহ.) আশুরার রোজাকে তিন স্তরে ভাগ করেছেন—প্রথম স্তর : ৯, ১০ ও ১১—তিন দিনই রোজা রাখা। দ্বিতীয় স্তর : ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১—দুদিন রোজা রাখা। তৃতীয় স্তর : শুধু ১০ মহররমে রোজা রাখা। তার মতে প্রথম স্তর সর্বোত্তম, দ্বিতীয় স্তর তার চেয়ে নিম্ন এবং তৃতীয় স্তর সর্বনিম্ন মর্যাদাসম্পন্ন। মোটকথা, আশুরা ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয়, মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময় একটি দিন। এ দিনের রোজা এক বছরের গুনাহের কাফফারা হওয়ার সুসংবাদ বহন করে। তাই একজন মুমিনের উচিত আশুরার গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং সুন্নাহর আলোকে এ দিনের আমলগুলো যথাযথভাবে পালন করা।

লেখক : শিক্ষক, জামিয়া মাদানিয়া শুলকবহর, চট্টগ্রাম 

ভূমিকম্প ও অপমৃত্যু থেকে বাঁচার দোয়া

আশুরায় বর্জনীয় বিষয়

হোসেনি দালান থেকে তাজিয়া মিছিল শুরু

যা ঘটেছিল কারবালায়

কারবালার শোকাবহ পবিত্র আশুরা আজ

৩০ জুন ঐতিহ্যবাহী উৎসব কাবা শরিফ ধোয়া

মহররমের ফজিলত ও আমল

কাবার হাতেমে নামাজ আদায়ে নতুন সময়সূচি ঘোষণা

আশুরা নিয়ে প্রচলিত ১১ ভুল ধারণা

যেসব খেলাধুলায় উৎসাহ দেয় ইসলাম