ইয়াসেফ ইমরোজ ইফাজের বিশ্লেষণ
‘ভদ্রলোকের খেলার মৃত্যু’!
গত কয়েক সপ্তাহে আমরা সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটারদের কাছ থেকে একের পর এক লজ্জাজনক মন্তব্য শুনেছি। এর মধ্যে কিছু মন্তব্য ছিল একেবারেই আপত্তিকর—যেমন ইরফান পাঠানের সেই বক্তব্য, ‘বাংলাদেশ যদি একমাত্র দল হিসেবেও অংশ নিত, তবুও তারা রানার্সআপই হতো।’ ভারতীয় গণমাধ্যমে বর্তমানে অসংখ্য বিভ্রান্তিকর প্রচার চলছে। এখানে ক্রিকেটের চেয়ে রাজনীতি ও আঞ্চলিক ক্ষমতা প্রদর্শনই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। আর এভাবেই হয়তো আমরা যা দেখছি, সেটাই তথাকথিত ‘ভদ্রলোকের খেলার মৃত্যু’।
সত্যি বলতে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে ঘিরে যা ঘটছে, তা আবারও মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতি ও খেলাধুলা কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে এবং শুরু থেকেই বাংলাদেশ কতটা অন্যায়ের শিকার হয়েছে। এটা মূলত ভারতের শুরু করা একটি ক্ষমতার লড়াই ও দম্ভ প্রদর্শন, আর এই বিশৃঙ্খলার দায়ভার তাদেরই বহন করতে হবে।
আইসিসি যখন বাংলাদেশের ম্যাচগুলো সরাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আমাদের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে বসাল, তখন সেটা শুধু ক্রিকেটের সিদ্ধান্ত ছিল না—এটা আমাদের উদ্বেগ ও নিরাপত্তার বিষয়কে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করার শামিল ছিল। অথচ তখন অনেকেই লিখেছেন, তর্ক করেছেন, এমনকি বিসিবি ও সরকারকে অনুরোধ করেছেন—হাঁটু গেড়ে অপমান সহ্য করে ভারত সফরে যাওয়ার জন্য।
এর মধ্যেই পাকিস্তান চূড়ান্ত অবস্থান নিয়েছে। তারা নিশ্চিত করেছে যে, টুর্নামেন্টে খেললেও বাংলাদেশের প্রতি সংহতির বার্তা হিসেবে ১৫ ফেব্রুয়ারির ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচটি খেলবে না। এটা ছোট কোনো বিষয় নয়। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ পুরো টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বেশি দেখা ও আর্থিকভাবে সবচেয়ে লাভজনক ম্যাচ। পাকিস্তান সেই ম্যাচ ত্যাগ করতে রাজি! সেটা নিজেদের লাভের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশকে সমর্থন করার জন্য। অথচ প্রায় সবাই আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।
এটা একটু ভেবে দেখুন; পাকিস্তান অর্থের ঝনঝনানি, মূল্যবান পয়েন্ট ও দর্শক সমর্থন—সবকিছু ত্যাগ করছে, শুধু একটি বার্তা দেওয়ার জন্য। এখানে আবেগও জড়িত; এটা কেবল হিসাব-নিকাশ বা র্যাংকিংয়ের বিষয় নয়। বাংলাদেশ যখন প্রায় সম্পূর্ণ একা হয়ে গিয়েছিল, তখন অন্তত একজন পাশে দাঁড়িয়েছে। আরো একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই প্রায়শই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দেখা ক্রিকেট ম্যাচ। আইসিসি বিশ্বকাপগুলোতে এই ম্যাচে শত শত মিলিয়ন দর্শক চোখ রাখে, যা অনেক সময় অন্য সব ম্যাচকে ছাপিয়ে যায়। এমন ম্যাচ ত্যাগ করাটা শুধু সাহসী নয়, দুর্দান্ত সিদ্ধান্ত।
এই একটিমাত্র ম্যাচের উত্তেজনা, অনুভবতা ও সম্পৃক্ততা ক্রিকেটকে বৈশ্বিক খেলাধুলা হিসেবে পরিচিতি ও টিকিয়ে রাখার জায়গার দাবিদার। কিন্তু সেই সৌন্দর্যটাও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ম্যাচ-পরবর্তী করমর্দন এড়িয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে, রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে। যে কারণে এশিয়া কাপেও ট্রফি গ্রহণ করেনি ভারত। পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তের পেছনে তাদের নিজস্ব স্বার্থ থাকুক বা না থাকুক, ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্ত—এই ঘটনাটি আমাদের মনে রাখতে হবে। ভবিষ্যতে এই অন্যায় ও ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা বন্ধ করতে বিশ্বজুড়ে অন্যান্য ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে কীভাবে কাজ করা যায়, সে বিষয়ে ভাবতে হবে।
ভারতকে ঘিরে সাধারণ ধারণা হলো—আইসিসি ও বিসিসিআই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তাদের ১০০ কোটিরও বেশি জনগণ সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে। কিন্তু আমরা, প্রায় ১৮ কোটির একটি দেশ হয়েও আজ বিভক্ত। আর এটাই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা। যখন একটি জাতির ঐক্য ভেঙে পড়ে, তখন পরিচয় সংকট অনিবার্য হয়ে ওঠে। এটা ক্রিকেট বাঁচানোর লড়াই। ভারত-পাকিস্তান ফাইনাল হলে কী করবে—সেটা পাকিস্তানের ওপরই ছেড়ে দেওয়া যাক। আর একেবারে সৎ ও ন্যায্যভাবে বলতে গেলে—আমি মনে করি না, বাংলাদেশ এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের পাশে দাঁড়াত। এই একবার অন্তত আবেগী চেতনাকে একটু পাশে রেখে বাস্তবতা ও ন্যায়বোধ দিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
লেখক : অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ক্রিকেট বিশ্লেষক