হোম > খেলা

সংকট-শঙ্কা পেরিয়ে স্বপ্ন-সম্ভাবনার আসর

এশিয়ান গেমসের উদ্বোধন আজ

এম. এম. কায়সার, জাপান থেকে

এক সপ্তাহ ধরে নাগোয়ার মাঠ, হোটেল, কনটেইনার আবাসন, বন্দরে নোঙর করে থাকা ক্রুজ শিপ, অনুশীলন কেন্দ্র এবং পরিবহনকেন্দ্র ঘুরতে ঘুরতে মনে হয়েছে, এ যেন শুধু একটি ক্রীড়া আসরের গল্প নয়। কোথাও অ্যাথলেটের হাতে ঘরের চাবি নেই, কোথাও ছোট্ট কেবিনে লম্বা শরীর নিয়ে রাত কাটানোর চেষ্টা, কোথাও অনুশীলন শেষে গাড়ির অপেক্ষা, কোথাও বৃষ্টির আতঙ্ক। এর মধ্যেই কেউ ছুটছেন মাঠে, কেউ ঘাম ঝরাচ্ছেন অনুশীলনে, কেউ বুকের কাছে দেশের পতাকা চেপে ধরে অপেক্ষা করছেন নিজের মুহূর্তটির জন্য।

আইচি-নাগোয়া যেন গত এক সপ্তাহে এক অদ্ভুত আয়নায় নিজের মুখ দেখেছে। এক পাশে সংকট, অন্য পাশে স্বপ্ন। একদিকে আয়োজনের ফাঁকফোকর, অন্যদিকে এশিয়ার সেরা হওয়ার লড়াই। কখনো মনে হয়েছে সবকিছু থমকে আছে। পরক্ষণেই দেখা গেছে, মাঠে বাঁশি বাজছে। খেলা শুরু হয়ে গেছে। অ্যাথলেট দৌড়াচ্ছেন। দর্শক হাততালি দিচ্ছেন। অর্থাৎ, আয়োজন যতই হোঁচট খাক, ক্রীড়ার চাকা থামেনি।

আজ আনুষ্ঠানিকভাবে সেই চাকারই গতি বাড়বে। আজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হচ্ছে ২০তম এশিয়ান গেমসের।

জাপানের মাটিতে এশিয়ান গেমস ফিরেছে ৩২ বছর পর। ১৯৯৪ সালে হিরোশিমার পর এবার আয়োজক আইচি-নাগোয়া। কিন্তু উদ্বোধনের আগেই এই আসর নিজের জন্য তৈরি করেছে অন্যরকম এক পরিচয়।

প্রথম প্রশ্নটাই অ্যাথলেটদের থাকার জায়গা নিয়ে। প্রচলিত অ্যাথলেটস ভিলেজ নেই। খরচ কমানো এবং পরিবেশবান্ধব আয়োজনের যুক্তিতে বেছে নেওয়া হয়েছে কনটেইনার আর ক্রুজ শিপ, সেই সঙ্গে হোটেল তো আছেই। প্রায় ২,০০০ অ্যাথলেট থাকছেন অস্থায়ীভাবে নির্মিত কনটেইনার কেবিনে। আরো প্রায় ৪,০০০-এর রাত কাটছে ইতালিয়ান প্রমোদতরী কোস্টা সেরেনায়।

দিনের আলোয় কনটেইনারগুলো খুব সাধারণ। রাত নামলে দৃশ্যটা অন্যরকম। সারি সারি একই রঙের ছোট ঘর। ভেতরে একেকটি দেশের অ্যাথলেট। কেউ বিশ্রাম নিচ্ছেন, কেউ পরদিনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অথচ এই ঘরগুলোর আকার নিয়েই শুরু হয়েছে অভিযোগ। দুজনের জন্য এই কনটেইনার মন্দ নয়। কিন্তু ছোট্ট এই পরিসরে যখন এক কক্ষে চারজনের থাকার ব্যবস্থা করতে হয়, তখন রুমে দাঁড়াতে গেলেই যে নাক ঠোকাঠুকি লাগবে!

লম্বা অ্যাথলেটদের জন্য ছোট বিছানা। কোথাও জায়গার সংকট। কোথাও পানি চুইয়ে মেঝে ভেজার অভিযোগ। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিনিধিরা প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশটির এক বাস্কেটবল খেলোয়াড় কক্ষের পানি পড়ার ভিডিও দিয়েছেন।

আয়োজকদের ব্যাখ্যা অবশ্য ভিন্ন। কমিটির সভাপতি হিদেআকি ওমুরার দাবি, সাবেক অলিম্পিয়ানদের একটি কমিটি কনটেইনারগুলো ঘুরে দেখে ব্যবহারের উপযোগী বলেই অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু অ্যাথলেটের রাত তো আর কমিটির রিপোর্টে কাটে না।

আর সমুদ্র জলে নোঙর করা বিশাল জাহাজ কোস্টা সেরেনার বাইরে থেকে ঝলমলে। ভেতরে এশিয়ার নানা দেশের ক্রীড়াবিদ। এক অর্থে ভাসমান অ্যাথলেটস ভিলেজ। কিন্তু এখানেও বরাদ্দ, কক্ষ আর ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষের খবর এসেছে।

শুধু থাকার জায়গা নয়, ভোগান্তি আছে পথেও।

গত কয়েক দিনে বাংলাদেশ শিবিরে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগ শুনতে হয়েছে, সেটি পরিবহন নিয়ে। আগের রাতে গাড়ির অনুরোধ জানানো হয়েছে। সকালে নির্দিষ্ট পার্কিংয়ে গিয়ে অপেক্ষা। গাড়ি নেই। ফোন করা হচ্ছে। আবার ফোন। কখনো চালকের ডিউটি শেষ। কখনো তথ্য মেলেনি, এমন অজুহাত। কখনো অনুশীলন শেষ হয়ে গেছে, অথচ ফেরার গাড়ির দেখা নেই। সমস্যা আরো তীব্র হয়েছে ভাষাগত জটিলতায়। টিম লিয়াঁজে হিসেবে যারা রয়েছেন তাদের বেশিরভাগের ইংরেজি বলার ও বোঝার ক্ষমতা প্রাথমিক শ্রেণি পর্যায়ের!

শেফ দ্য মিশনের বৈঠকে ট্রান্সপোর্টের এই সমস্যার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি তুলেছে বাংলাদেশ। জবাবে সমাধানের প্রতিশ্রুতিও এসেছে। কোনো কোনো দিন সমস্যার সমাধান হয়েছে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে যে সময় নষ্ট হয়েছে, তাতেই আরো জটিলতা বেড়েছে। পরদিন আবার নতুন কোনো সমস্যা সামনে এসেছে।

এই সমস্যা বাংলাদেশের একা নয়। চীনের জিমন্যাস্টিকস দল বিমানবন্দরে কম্পিউটার-সংক্রান্ত জটিলতায় দীর্ঘ সময় আটকে ছিল। দক্ষিণ কোরিয়া ও কাতারের ফুটবল দলকে ভুল করে বেসবল স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

একটি মহাদেশীয় ক্রীড়া আসর। অথচ আয়োজকদের কোথাও কোথাও লড়াই করতে হচ্ছে নিজেদের ব্যবস্থাপনার সঙ্গেই। আবাসন কমিটি, ট্রান্সপোর্ট কমিটি, নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য বিপুল আয়োজন, ডাইনিং কমিটি, এমনতর প্রায় অর্ধশতাধিক কমিটি রয়েছে কিন্তু কারো সঙ্গে কারো যেন সম্প্রীতি বা যোগাযোগ নেই। ফলে একটা কাজ আটকে যাচ্ছে আরেক কমিটির কাছে।

এর সঙ্গে প্রকৃতির চোখরাঙানি। গত সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিতে কিছু অ্যাথলেটকে সরিয়ে নিতে হয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে ঝড়ের শঙ্কাও নজরে রেখেছে আয়োজকরা। প্রয়োজনে ক্রুজ শিপে থাকা অ্যাথলেটদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।

তারপরও নাগোয়া থামেনি। বরং শহরটা বদলেছে চোখের সামনে। কয়েক দিন আগেও নাগোয়া স্টেশনে এশিয়ান গেমসের বড় কোনো উৎসবের আবহ খুব একটা চোখে পড়েনি। এখন ভেন্যু, আবাসন, অনুশীলনের মাঠের সামনের রাস্তার পাশে গেমসের পতাকা। স্বেচ্ছাসেবকদের ছুটে চলা। স্টেডিয়াম ঘিরে নিরাপত্তা। বিভিন্ন দেশের পতাকা। শহরটি ধীরে ধীরে বুঝিয়ে দিচ্ছে, অতিথি এসেছে ৪৫ দেশ থেকে।

এবারের আসরে লড়াই হবে ৪৩টি খেলায়। পদকের সংখ্যা ৪৬৯। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ১৭ হাজার ছাড়িয়েছে। নতুন প্রজন্মকে টানতে এসেছে টেকবল, প্যাডেল, মিক্সড মার্শাল আর্ট, ভার্চুয়াল তায়কোয়ান্দোর মতো নতুন ইভেন্ট। সঙ্গে আছে ই-স্পোর্টসও।

পুরোনো এশিয়ার সঙ্গে নতুন এশিয়ার দেখা হওয়ার আয়োজনও যেন এটি।

বাংলাদেশের গল্পও শুরু হয়ে গেছে। তবে আপাতত যা আনন্দ তা শুধু ক্রিকেটের গল্পে। নারী ক্রিকেট দল সেমিফাইনালে উঠে গেছে। মেয়েদের ফুটবল দল দুই ম্যাচে বড় ব্যবধানে হেরেছে। পুরুষ হকির শুরুটাও স্বস্তির নয়। কিন্তু এসব ফলাফলের বাইরেও একজন অ্যাথলেটের কাছে এশিয়ান গেমসের অর্থ অনেক বড়।

দেশের জার্সিতে বুকের পাশে থাকা পতাকা। স্টেডিয়ামের মাইকে দেশের নাম ঘোষণা। এর মূল্য স্কোরবোর্ডে লেখা যায় না।

তাই কনটেইনারের ছোট ঘরেও রাত নামে। জাহাজের কেবিনেও আলো নিভে যায়। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি নিয়েও সকালে অনুশীলনে বের হন অ্যাথলেটরা। গাড়ির জন্য অপেক্ষা করেন। বৃষ্টির দিকে তাকান। তারপর মাঠে নামেন। স্বপ্ন বুনেন। গলায় পদক ঝুলছে আর পোডিয়ামের মঞ্চের পাশে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উপরে উঠছে। জাতীয় সংগীত বাজছে।

এশিয়ান গেমসে অ্যাথলেটদের সেই স্বপ্ন পূরণের মঞ্চ।

নাগোয়া এখন পুরো এশিয়ার। আয়োজকদের সামনে প্রশ্ন আছে, সংকট আছে, অসম্পূর্ণতা আছে। সবকিছু কতটা সামলানো যাবে, তার উত্তর মিলবে সময়ের সঙ্গে। সমস্যা থাকবে কিন্তু মাঠে নিজের খেলায় সেই সংকটকে পিছু ফেলে সেরাটার জন্য দৌড়াতে হবে অ্যাথলেটদের।

শেষ পর্যন্ত গেমসের হিসাব বাসস্থান, পরিবহন জটিলতা বা ব্যবস্থাপনার সংকটে আটকে থাকে না। সব হিসাব হয় মাঠে। ঘামের বিন্দুতে। শেষ সেকেন্ডে। এক ভগ্নাংশ সেকেন্ডে। আইচি-নাগোয়ার এশিয়ান গেমস সেই হিসাবটাই মনে রাখবে শেষমেশ।

কনটেইনারে কাটানো রাত একদিন শেষ হবে। কোস্টা সেরেনাও একদিন বন্দরে ফিরে যাবে। আজকের উদ্বোধনের আলোও একদিন নিভে যাবে। কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে অ্যাথলেটরা এখানে এসেছেন, তার শেষ বাঁশি বাজতে এখনো অনেক দেরি। সেই গল্পটাই শুরু হবে এবার। যার নাম জয়ের লড়াই।

সংখ্যায় সংখ্যায় এশিয়ান গেমস

ছোট পর্দায় ইংল্যান্ড-শ্রীলঙ্কার টি-টোয়েন্টির সঙ্গে থাকছে বার্সেলোনার ম্যাচ

এশিয়ান গেমসের উদ্বোধনীতে যা যা থাকছে

জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে এক ম্যাচ বাকি থাকতেই সিরিজ অজিদের

আইসিসির দ্বারস্থ হলেন রিজওয়ান

দক্ষিণ কোরিয়ার ম্যাচে বাজল উত্তর কোরিয়ার জাতীয় সংগীত

হামজাদের সঙ্গে নতুন তিন প্রবাসী ফারহান, জিদান ও শুকি

বড় জয়ে শুরু ফর্টিসের, আবাহনীর ড্র

শোচনীয় পরাজয় মিরাজদের, তবুও সুযোগ থাকছে ফাইনালে ওঠার

রোনালদোতেই আস্থা পর্তুগালের নতুন কোচের