হোম > খেলা > ক্রিকেট

এই বাংলাদেশ নুয়ে নয়, বুক চিতিয়ে বাঁচে

সৈয়দ আশরাফুল হক আপনি শুনছেন?

এম. এম. কায়সার

একটা সাক্ষাৎকার পড়লাম আর বিস্মিত হলাম। ক্ষমতাকে চাটতে গিয়ে মানুষ কীভাবে নুয়ে পড়ে সেই রূপান্তরের নজির পেলাম!
বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গনে সৈয়দ আশরাফুল হকের নামটা সুপরিচিত। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (এসিসি) থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের সংগঠকদের মধ্যে তার নাম উচ্চারিত হতো সমীহের সঙ্গে। নামের আগে যোগ হতো ‘তুখোড় সংগঠক’। কিন্তু সময়ের স্রোতে অনেক কিছুই বদলে যায়, অনেক মিথ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভেন্যু নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় তার মন্তব্য শোনার পর মনে হচ্ছে, আমরা বোধহয় আরো এক কিংবদন্তির পতন দেখছি, যিনি বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে নিজের চিন্তার সংযোগ ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
ভারতভিত্তিক একটি ক্রিকেট ওয়েবসাইটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি যা বলেছেন, তা শুধু বিস্ময়করই নয়, রীতিমতো আপত্তিকর। তিনি বলেছেন, ‘যেকোনো আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ক্রিকেট বোর্ডের উচিত ছিল আইসিসির নিরাপত্তা পরিকল্পনা খেলোয়াড়দের সামনে তুলে ধরা এবং তাদের সিদ্ধান্ত নিতে বলা। সরকার বা বোর্ড নয়, সিদ্ধান্তটা খেলোয়াড়দের হওয়া উচিত ছিল।’ তিনি আরো যোগ করেছেন, একটি ‘প্রশ্নবিদ্ধ এজেন্ডা’ বাস্তবায়নের জন্য খেলোয়াড়দের বিশ্বকাপ খেলার আজন্ম স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
জনাব সৈয়দ হক, আপনি কি সিরিয়াস? আপনি কি আমাদের সঙ্গে কৌতুক করছেন? আপনি কেন মনে করছেন একটা বিশ্বকাপ খেলতে না পারলে বাংলাদেশের ক্রিকেট ধ্বংস হয়ে যাবে? মানছি আমাদের আর্থিক ক্ষতি হবে। র‌্যাংকিংয়ে ঘাটতি বাড়বে। আইসিসির সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হবে। নিকট ভবিষ্যতে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে, কিন্তু একবার গলায় শিকল পরলে মাথা নুয়ে পড়বে। মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে যাবে। এই বাংলাদেশ ক্রীতদাস না, সমান মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে শিখেছে। সামনের সময়ে সেভাবেই বাঁচতে চায়।
খুব কাছের একজন একটা উদাহরণ দিলেন। সেটা জানাই। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দুবারের ওয়ানডে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন। দুবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন। সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ তো ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগই পায়নি। তাতে কি তাদের ক্রিকেট শেষ হয়ে গেছে? ইতালি চারবার বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপা জিতেছে। কিন্তু শেষ দুই বিশ্বকাপে খেলার সুযোগই হয়নি তাদের। এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলও মিস করার শঙ্কায় তারা। তাই বলে কি তাদের ফুটবল ধ্বংস হয়ে গেছে?
এবার আপনার ‘খেলোয়াড়দের সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার তত্ত্বটি খতিয়ে দেখা যাক। একটি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার দায়ভার কি তাদের নিজেদের? একজন ক্রিকেটার মাঠের ২২ গজে বিশেষজ্ঞ, তিনি বর্ডার সিকিউরিটি, ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট বা ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক নন। পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে কি এমন নজির আছে যে, যুদ্ধাবস্থা বা চরম বৈরী ভাবাপন্ন কোনো দেশে খেলতে যাবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র বা বোর্ডের বদলে খেলোয়াড়রা নেয়?
ভারত যখন নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে পাকিস্তানে এশিয়া কাপ বা চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলতে যায় না, তখন কি বিরাট কোহলি বা রোহিত শর্মাদের ভোট নিয়ে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল? নাকি সেটা ছিল ভারত সরকারের কঠোর সিদ্ধান্ত? তখন তো আপনাদের মতো অভিজ্ঞ সংগঠকদের মুখে ‘খেলোয়াড়দের স্বপ্নভঙ্গ’ বা ‘প্রশ্নবিদ্ধ এজেন্ডা’র বুলি শোনা যায়নি। তখন আপনারা সেটাকে দেখেছেন ‘জাতীয় স্বার্থ’ হিসেবে। আর আজ যখন বাংলাদেশ তার নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত, তখন সেটা হয়ে যায় ‘এজেন্ডা’? এই দ্বিমুখী আচরণ কেন?
‘প্রশ্নবিদ্ধ এজেন্ডা’ বলতে আপনি কি বুঝিয়েছেন? আপনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে বাকি দুনিয়ার সাম্প্রতিক খবর রাখেন না। ভারতের মাটিতে বাংলাদেশি সন্দেহে পিটিয়ে সেই দেশেরই নাগরিককে হত্যার ঘটনা এখন আর কোনো গুজব নয়, এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। খোদ ভারতের পত্রিকা জানাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে জন্ম নেওয়া এক মুসলিমকে বাংলাদেশি সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়েছে। শিবসেনা নেতারা প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছেন মুম্বাইয়ে খেলা হতে দেবেন না। এর চেয়ে বড় আর কী প্রমাণ দরকার যে সেখানে বাংলাদেশিদের জন্য পরিবেশ বিষাক্ত? আপনি কোন বিবেচনায় খেলোয়াড়দের এমন একটি বারুদপূর্ণ পরিস্থিতিতে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা ভাবেন? এমন হিংসাত্মক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সমর্থক এবং সাংবাদিকদের জন্য নিরাপত্তা কোথায়?
সবচেয়ে বড় প্রহসন এবং আইনি ভিত্তি হলো মোস্তাফিজুর রহমানের ঘটনাটি। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) নিজেই যখন আইপিএলের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজিকে (কেকেআর) নির্দেশ দেয় মোস্তাফিজকে স্কোয়াড থেকে বাদ দিতে। কারণ তারা উগ্রবাদিদের হুমকির মুখে মোস্তাফিজুরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। এই যখন নিরাপত্তা পরিস্থিতি তখন আইসিসি বা আপনি কীভাবে আশা করেন যে পুরো বাংলাদেশ দল সেখানে নিরাপদ থাকবে? একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টে একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা দিতে যারা ব্যর্থ, তারা বিশ্বকাপের মতো আসরে পুরো বহরের, সঙ্গে সাংবাদিক ও সমর্থকদের নিরাপত্তা দেবে—এই আশ্বাস কি হাস্যকর নয়? বিসিবি বা বাংলাদেশ সরকার যখন এই জেনুইন রিস্কের কথা বলছে, তখন সেটাকে ‘এজেন্ডা’ বলাটা কি আদতে ভারতের লজিস্টিকস বাঁচানোর এজেন্ডা হয়ে যাচ্ছে না?
অনেকে যুক্তি দেখাচ্ছেন, আইসিসির স্বাধীন নিরাপত্তা দল নাকি ঝুঁকি দেখেনি। এটি একটি শুভঙ্করের ফাঁকি। আইসিসির এই তথাকথিত ‘স্বাধীন’ অ্যাসেসমেন্ট কতটা স্বাধীন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ আছে। যদি ঝুঁকি না-ই থাকবে, তবে মোস্তাফিজকে কেন সরানো হলো? এই প্রশ্নের উত্তর আইসিসি বা বিসিসিআই কেউ দিতে পারেনি। কারণ উত্তর দিতে গেলে তাদের স্বীকার করতে হবে যে, সেখানে বাংলাদেশিদের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব চরমে।
বিশ্বকাপের ভেন্যু বদলের যে যৌক্তিক দাবি বাংলাদেশ তুলেছিল তা পাশ কাটিয়ে লজিস্টিকস এবং টিকিট বিক্রির বিষয়কে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। বলা হচ্ছে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফ্যানরা টিকিট কেটে ফেলেছে, হোটেল বুকিং হয়ে গেছে—তাই এখন ভেন্যু বদলানো যাবে না।
পুরোদস্তুর হাস্যকর যুক্তি!
মানুষের জীবনের ঝুঁকির চেয়ে কি হোটেল বুকিং বা ব্রডকাস্টিং শিডিউল বেশি গুরুত্বপূর্ণ? লজিস্টিকসের দোহাই দিয়ে জেনুইন রিস্ককে পাশ কাটানো কোনো যুক্তিই হতে পারে না। ১৯৪ পৃষ্ঠার নিরাপত্তা পরিকল্পনায় যদি খেলোয়াড়দের গ্যারান্টি না থাকে, তবে সেই পরিকল্পনার মূল্য কাগজের টুকরোর চেয়ে বেশি কিছু নয়।
সৈয়দ আশরাফুল হক এবং তার মতো যারা ভাবছেন যে বয়কট করলে খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে, তাদের জন্য একটি পাল্টা প্রশ্ন—যদি খেলতে গিয়ে কোনো খেলোয়াড় শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন, বা তার চেয়েও খারাপ কিছু ঘটে, তার দায়ভার কি আপনারা নেবেন? ২০০৯ সালে লাহোরে শ্রীলঙ্কা দলের ওপর হামলার পর বিশ্ব ক্রিকেট বুঝেছে যে নিরাপত্তা শঙ্কাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ‘বেটার বি সেফ দেন সরি’—এই প্রবাদটি কি আমরা ভুলে গেছি? খেলোয়াড়দের ‘লাইফটাইম অ্যামবিশন’ বা বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নের চেয়ে তাদের জীবন এবং আত্মসম্মান অনেক বেশি মূল্যবান। ‘মাথা নত করে’ ভয়ের পরিবেশে ক্রিকেট খেলার নাম দেশপ্রেম নয়, সেটা বোকামি।
বাংলাদেশ তো বিশ্বকাপ বয়কটের কথা বলেনি, বাংলাদেশ শুধু বলেছে—ভেন্যু বদলানো হোক। আমাদের দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং মানবিক। শ্রীলঙ্কায় খেলা হলে সমস্যা কোথায়? তারা তো সহ-আয়োজক। লজিস্টিকস বা টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে মানুষের জীবনকে তুচ্ছ করা হচ্ছে। অতীতেও নিরাপত্তার কারণে শেষ মুহূর্তে ভেন্যু বদলানোর বহু নজির ক্রিকেট বিশ্বে আছে। নিউজিল্যান্ড যখন নিরাপত্তার অজুহাতে পাকিস্তান সফর বাতিল করে মাঠ থেকে ফিরে আসে, তখন সেটা হয় ‘প্রফেশনাল সিদ্ধান্ত’। ইংল্যান্ড যখন সফর বাতিল করে, তখন সেটা হয় ‘নিরাপত্তা প্রটোকল’। আর বাংলাদেশ যখন চোখের সামনে নিজ নাগরিকদের পিটিয়ে মারার দৃশ্য দেখে ভারতে যেতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন সেটা হয় ‘আবেগ’ বা ‘রাজনীতি’? এই ভণ্ডামি আর কতদিন চলবে?
আমাদের ক্রিকেট কূটনীতি নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। বলা হচ্ছে আমরা ব্যর্থ। হ্যাঁ, ১৪-২ ভোটে হেরে যাওয়াটা হয়তো আমাদের কূটনৈতিক দুর্বলতা। আমরা হয়তো পাকিস্তানের মতো অন্য কোনো দেশকে পাশে পাইনি। কিন্তু নৈতিকতার ভোটে বাংলাদেশ কি হেরেছে?
-না।
বাংলাদেশ একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমরা জানিয়ে দিয়েছি, আইসিসির টাকার বস্তা বা ভারতের প্রভাব-প্রতিপত্তি আমাদের আত্মসম্মান কিনে নিতে পারে না। আমরা জানিয়ে দিয়েছি, আমাদের খেলোয়াড়দের জীবনের মূল্য অন্য যেকোনো দেশের খেলোয়াড়দের চেয়ে কম নয়।
সৈয়দ আশরাফুল হকের মতো অভিজ্ঞ সংগঠকরা হয়তো ভুলে গেছেন, একটি ক্রিকেট বোর্ড বা সরকারের প্রথম দায়িত্ব তার নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সংকটের সময়েই মানুষের আসল চেহারা বা চিন্তাধারা বেরিয়ে আসে। জনাব হকের এই মন্তব্য প্রমাণ করে, তিনি হয়তো সংগঠক হিসেবে তুখোড় ছিলেন, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে তার চিন্তার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অথবা হয়তো, তিনিও সেই পুরোনো ঔপনিবেশিক হ্যাংওভারে ভুগছেন যেখানে ‘মাস্টার’দের খুশি রাখাটাই মূল এজেন্ডা। তিনি সম্ভবত ভুলে গেছেন, বাংলাদেশ এখন আর সেই দেশ নেই যারা শুধু অংশগ্রহণের জন্য ক্রিকেট খেলে। আমরা এখন সম্মানের জন্য খেলি।
আইসিসিকে বুঝতে হবে, তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের ক্রিকেট কাউন্সিল নয়, তারা ‘ইন্টারন্যাশনাল’ ক্রিকেট কাউন্সিল। তাদের নিরপেক্ষতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। যদি তারা সত্যিই নিরপেক্ষ হতো, তবে ভারত ও পাকিস্তানের জন্য যে ‘হাইব্রিড মডেল’ বা ‘নিউট্রাল ভেন্যু’র ব্যবস্থা করা হয়, বাংলাদেশের জেনুইন নিরাপত্তা ঝুঁকির ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা করা হতো।
এই বিশ্বকাপ ভারতের মাটিতে নয়, শ্রীলঙ্কায় খেলার বাংলাদেশের দাবিটা ছিল ন্যায্য। এটি কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অস্তিত্ব ও আত্মসম্মানের প্রশ্ন। এই প্রশ্নে আপস করা মানে হলো ভবিষ্যতে যেকোনো অপমান মেনে নেওয়ার লাইসেন্স দিয়ে দেওয়া। ক্রিকেট অবশ্যই আবেগের জায়গা, কোটি মানুষের ভালোবাসার জায়গা। কিন্তু তা কখনোই জীবন এবং সম্মানের ঊর্ধ্বে নয়। আজ যদি আমরা নত হই, কাল আমাদের মেরুদণ্ড বলে আর কিছু থাকবে না।
নুয়ে নয়, হাত পেতেও নয়, বুক চিতিয়ে বাঁচুন।

বাংলাদেশের সমর্থনে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি স্থগিত করল পাকিস্তান

সিদ্ধান্তহীন দ্বিতীয় দফার বৈঠক, হয়েছে গ্রুপ বদলের আলোচনাও

রংপুর-রাজশাহীর জয়

উত্তেজনা ছড়ালো সিলেট-রাজশাহী

আরো যে পাঁচ দাবি ক্রিকেটারদের