বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ ক্রিকেট বহু বছর ধরেই ছিল সম্ভাবনার এক অসমাপ্ত উপাখ্যান। মাঝে মধ্যে উজ্জ্বল কিছু জয় এসেছে, কিছু স্মরণীয় মুহূর্তও তৈরি হয়েছে, কিন্তু ধারাবাহিকতা ছিল না। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশকে ঘিরে একটা ধারণা দীর্ঘদিন ধরে গেঁথে ছিল—ঘরের মাঠে স্পিননির্ভর দল, বিদেশে সংগ্রামী এক বাস্তবতা। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। আর সেই বদলের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন নাজমুল হোসেন শান্ত।
পাকিস্তানের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জয় শুধু একটি ক্রিকেটীয় সাফল্য নয়; এটি বাংলাদেশের টেস্ট মানসিকতার পরিবর্তনের ঘোষণা। আরো বড় কথা, এই সিরিজে বাংলাদেশ যেভাবে খেলেছে, তাতে স্পষ্ট—এই দল আর ড্র বাঁচানোর ক্রিকেট খেলতে চায় না, জিততে চায়। শান্তর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই—তিনি ভয় পান না।
ঢাকা ও সিলেট টেস্টে বাংলাদেশ যে ধরনের উইকেট তৈরি করেছে, সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় বার্তা। অতীতে পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী পেস আক্রমণের বিপক্ষে বাংলাদেশ হয়তো নির্জীব, ধীর স্পিন উইকেট বানানোর পথ বেছে নিত। কিন্তু এবার হয়নি। শান্ত, ফিল সিমন্স ও মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন মিলে বুঝেছিলেন, নিজেদের শক্তির জায়গাটা বদলেছে। নাহিদ রানা, তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদদের নিয়ে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ এখন আর কেবল সহায়ক নয়, ম্যাচ জেতানোর শক্তি। সেই বিশ্বাস থেকেই তৈরি হয়েছিল স্পোর্টিং উইকেট। আর সেখানেই শুরু নতুন বাংলাদেশের গল্প।
ঢাকা টেস্টের প্রথম দিনেই শান্ত বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি কেবল অধিনায়ক নন, দলের ছন্দ নির্ধারণকারীও। আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে তুলে নিয়েছিলেন টেস্ট ক্যারিয়ারের নবম সেঞ্চুরি। তার ইনিংস যেন পুরো দলের মানসিকতাকেই বদলে দেয়। বাংলাদেশ ছোট ছোট লক্ষ্য নয়, বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। আর সেই স্বপ্নের সবচেয়ে সাহসী প্রতীক ছিল ঢাকায় ইনিংস ঘোষণা।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা গেছে। ম্যাচ ড্রয়ের নিরাপদ রাস্তা ছেড়ে শান্ত পাকিস্তানকে দেন ২৬৮ রানের লক্ষ্য। প্রায় ৭০ ওভার হাতে রেখে প্রতিপক্ষকে ব্যাট করতে পাঠানো ছিল নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। অতীতে বাংলাদেশের অধিনায়করা হয়তো এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ পথ বেছে নিতেন। কিন্তু শান্ত নিজের বোলারদের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। সেই আস্থার প্রতিদানও পেয়েছেন—পাকিস্তান অলআউট হয়েছে, বাংলাদেশ জিতেছে। এই এক সিদ্ধান্তই হয়তো বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট সংস্কৃতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
শান্তর নেতৃত্বের আরেকটি বড় দিক হলো তার সক্রিয়তা। মাঠে তিনি কখনো নিষ্ক্রিয় নন। স্পিন ও পেসের মিশ্রণ, বোলারদের ছোট ছোট স্পেল, ব্যাটসম্যানকে সেট হতে না দেওয়া—সবকিছুতেই ছিল পরিকল্পনার ছাপ। সিলেটে নতুন বল তাইজুল ইসলামের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তটা যেন তার ক্রিকেটীয় বুদ্ধিমত্তার প্রতীক হয়ে রইল। পুরোনো বলে ভালো করছিলেন তাইজুল, কিন্তু শান্ত বুঝেছিলেন নতুন বল হাতে পেলেই তিনি আরো ভয়ংকর হবেন। ফলাফল—সালমান আগার উইকেট, ম্যাচে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ।
এই বাংলাদেশ আর এক বা দুই তারকার ওপর নির্ভরশীল দল নয়। এখানে তাসকিন আছেন, নাহিদ আছেন, মিরাজ আছেন, তাইজুল আছেন। ব্যাট হাতে শান্ত, লিটন, মুশফিক, মুমিনুলরা দায়িত্ব নিচ্ছেন। টেলএন্ডাররাও রান করছেন। সবচেয়ে বড় কথা, সবাই নিজেদের ভূমিকা বুঝে খেলছেন।
শান্তর নেতৃত্বে আরেকটি পরিবর্তন চোখে পড়ে—দলের ভেতরের যোগাযোগ। সিলেট টেস্টে লিটন দাস যখন টেইল নিয়ে ব্যাট করছিলেন, তখন ড্রেসিংরুম থেকে বার্তা যায় আক্রমণাত্মক খেলতে। সেই বার্তাই লিটনকে আরো আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। এই ছোট ছোট বিষয় একটি দলের সংস্কৃতি তৈরি করে।
অথচ খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, শান্ত নিজেই ছিলেন অনিশ্চয়তার মধ্যে। ২০২৩ সালে অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে তাকে অধিনায়ক করা হয়েছিল। পরে দায়িত্ব কেড়ে নেওয়া, আবার ফিরিয়ে দেওয়া—সব মিলিয়ে তার পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং নেতৃত্বকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। মুশফিকুর রহিম যেমন বলেছেন, ‘শান্ত উদাহরণ তৈরি করে নেতৃত্ব দেয়।’
সংখ্যাও শান্তর পক্ষে কথা বলছে। বাংলাদেশ অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি টেস্ট জয়ের রেকর্ড এখন তার। অধিনায়ক হওয়ার পর ব্যাট হাতেও তিনি আরো ধারাবাহিক। নেতৃত্ব যেন তাকে বাড়তি দায়িত্ববোধ দিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, শান্তর বাংলাদেশ কেবল ঘরের মাঠে জিতেই সন্তুষ্ট থাকতে চায় না। অস্ট্রেলিয়া সফরের কথাও তিনি বলছেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। কারণ, এই দল এখন বিশ্বাস করতে শিখেছে। হয়তো এটাই বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অর্জন—নিজেদের ওপর বিশ্বাস।
একসময় বাংলাদেশের ক্রিকেট ছিল ব্যক্তিনির্ভর। এখন সেটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে সমষ্টির গল্প। আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছেন শান্ত—নিঃশব্দ, সংযত, কিন্তু সাহসী এক নেতা; যিনি বাংলাদেশ ক্রিকেটকে নতুন এক যুগের দরজায় এনে দাঁড় করিয়েছেন।
*মোহাম্মদ ইসাম, ক্রিকইনফোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি