চারপাশে সবুজের মায়া। কোথাও উঁচু গাছের সারি, কোথাও খোলা ঘাসের মাঠ। নাগোয়ার খারোগি অ্যাথলেটিক পার্ক নামের সঙ্গে যেন সত্যিই পার্কের চেহারাটা মিশে আছে। সেই সুন্দর পার্কেই এদিন বাংলাদেশের ক্রিকেটের ছবিটা ছিল একেবারেই বিপরীত। সবুজের সৌন্দর্যের মধ্যে লাল-সবুজের দলটাকে মনে হলো বড় অসহায়। ভারত খেলল দাপুটে শক্তিমান ক্রিকেট আর বাংলাদেশ যেন খেলল হারের ভয় নিয়ে।
মাঠের এক প্রান্তে তখন ব্যাট হাতে ঝড় তুলছেন শেফালি ভার্মা। বাংলাদেশের বোলারদের শরীরী ভাষায় ক্রমেই ফুটে উঠছিল অসহায়ত্ব। বল যাচ্ছে সীমানার বাইরে, আর শেফালি ছুটছেন নিজের সেঞ্চুরির দিকে। একসময় ৪৯ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করলেন ভারতীয় ওপেনার। আর বাংলাদেশ তখনো খুঁজে ফিরছে ম্যাচে ফেরার কোনো রাস্তা।
সেই রাস্তা শেষ অবধি আর খুঁজে পায়নি নিগার সুলতানা জ্যোতির দল।
১৯৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৫.৪ ওভারে মাত্র ৮১ রানে অলআউট বাংলাদেশ। ভারতের কাছে হার ১১৪ রানের। সঙ্গে শেষ হয়ে গেল এশিয়ান গেমসে নারী ক্রিকেটের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন। সোনার পদকের লড়াই থেকে ছিটকে গিয়ে এখন বাংলাদেশের সামনে কেবল ব্রোঞ্জের সুযোগ।
২২ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই লড়াই।
কিন্তু তার আগে এই হারের হিসাবটা করা জরুরি। কারণ নাগোয়ার এই ম্যাচে বাংলাদেশ শুধু ভারতের কাছে হারেনি, হেরেছে নিজেদের সামর্থ্যের কাছেও।
ভারতের শুরুটাই ছিল ভয়ংকর। স্মৃতি মান্ধানা ও শেফালি ভার্মা মিলে পাওয়ার প্লের ছয় ওভারে তুলে নিলেন ৭২ রান। নাহিদা আক্তারের বলে ৩৭ রানে স্মৃতি ফিরলেন। খানিকবাদে ভারতীয় উইকেটকিপার গুনালান কামালিনির উইকেটও পেল বাংলাদেশ। তখনো মনে হচ্ছিল, ম্যাচে ফেরার একটা সুযোগ হয়তো তৈরি হয়েছে।
সেই সুযোগটুকুও আর থাকল না। শেফালি ভার্মা তখন একাই ম্যাচটা বাংলাদেশের নাগালের বাইরে নিয়ে গেলেন। হারমানপ্রীত কৌরকে সঙ্গে নিয়ে গড়লেন ৯৪ রানের জুটি। বাংলাদেশের বোলাররা লাইন-লেংথ ধরে রাখতে পারলেন না। ফিল্ডাররা চাপ তৈরি করতে পারলেন না। অধিনায়ক জ্যোতির দলও খুঁজে পেল না ভারতের ব্যাটারদের থামানোর কোনো কার্যকর পরিকল্পনা।
হারমানপ্রীত ৪০ রানে রাবেয়া খানের বলে ফিরলেন। রিচা ঘোষও ফিরলেন ২ রানে। কিন্তু ততক্ষণে শেফালি দাঁড়িয়ে গেছেন সেঞ্চুরির সামনে। ইনিংসের শেষ ওভারে তার সেঞ্চুরির জন্য দরকার ছিল মাত্র দুই রান। প্রথম তিন বলে স্ট্রাইক পেলেন না। চতুর্থ বলে এক রান নিয়ে পৌঁছালেন ৯৯-এ। শেষ বল। শেফালির ব্যাট ঘুরল। বল সোজা সীমানার ওপারে। ৯ নম্বর ছক্কায় ৪৯ বলে শতক। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এটাই তার প্রথম সেঞ্চুরি।
ভারত যেখানে প্রতিটি রানকে উদযাপনে পরিণত করেছে, বাংলাদেশ সেখানে ব্যাট হাতে আত্মসমর্পণের গল্প লিখেছে। ১৯৬ রানের পাহাড় সামনে নিয়ে ইনিংস শুরু করেই পাওয়ার প্লের মধ্যে ৩৮ রানে তিন উইকেট হারানো সেই গল্পের প্রথম অধ্যায়। প্রথম পাঁচ ব্যাটারের চারজনই ফিরেছেন সিঙ্গেল ডিজিটে। অধিনায়ক জ্যোতির ব্যাট এই ম্যাচেও জ্যোতিহীন!
দিলারা আক্তার ২৭ রান করে একটু লড়াইয়ের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার বিদায়ের সময় বাংলাদেশের স্কোর ৪৯, উইকেট পাঁচটি। এরপরও ধস থামেনি। বাকি পাঁচ উইকেট মিলে যোগ করেছে মাত্র ২৬ রান। সুলতানা খাতুন ১২ রানে অপরাজিত থেকেছেন। কিন্তু ততক্ষণে ম্যাচ শেষ।
স্কোরকার্ডের দিকে তাকালে এই হারকে কোনো একজনের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি কোনো এক ব্যাটারের ব্যর্থতা নয়। কোনো এক বোলারের ব্যর্থতাও নয়। পুরো দল, পুরো ইউনিট হিসেবেই হেরেছে বাংলাদেশ।
সবচেয়ে হতাশার জায়গা হয়তো এখানেই। ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামার আগেই যেন একটা অদৃশ্য আতঙ্ক ঘিরে রেখেছিল বাংলাদেশকে। প্রতিপক্ষের নাম ভারত হলেই কি ম্যাচটা এত কঠিন হয়ে যায়? নাকি কঠিন মুহূর্তে লড়াই করার মানসিক শক্তিটাই হারিয়ে ফেলে দল?
প্রশ্নটা আরো বড়, কারণ এই একই ভারতের কাছে কিছুদিন আগেই এশিয়া কাপের সেমিফাইনালে হেরেছিল বাংলাদেশ। এবার এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালেও একই গল্প। পার্থক্য শুধু মঞ্চের।
স্বর্ণের স্বপ্ন শেষ হয়েছে, কিন্তু পদকের দরজা এখনো খোলা। ২২ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের বিপক্ষে ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে নামবে বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে অন্তত লড়াইটা দেখতে চাইবে বাংলাদেশের সমর্থকরা। ফল যা-ই হোক, মাঠে যেন এবার হারের ভয় নয়, জয়ের জেদে লড়া বাংলাদেশের দেখা মিলুক।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
ভারত : ১৯৫/৪, ২০ ওভার (মান্ধানা ৩৭, শেফালি ১০০*, হারমানপ্রিত ৪০; মারুফা ১/৪৩, মেঘলা ১/২৫, রাবেয়া ১/৩৫ ও নাহিদা ১/৪৮)।
বাংলাদেশ : ৮১/১০, ১৫.৪ ওভার (দিলারা ২৭, শারমিন ১০, সুলতানা ১২*; নান্দিনি ৩/২৫, শ্রী চারানি ২/৭, শ্রেয়াঙ্কা ১/২২ ও দীপ্তি ৩/৭)।
ফল : ভারত ১১৪ রানে জয়ী।