বিশ্বকাপ মানেই আলোচনার কেন্দ্রে তারকা-মহাতারকারা। বল পায়ে জাদুর পসরা সাজিয়ে আলোর সবটা তারাই কেড়ে নেন। ধ্রুপদী ছন্দ আর তাল-লয়ের সুরে সবুজ গালিচায় দেখা মেলে অপরূপ সুরের। চলতি বিশ্বকাপে সেই সুরটা ভেসে আসছে মাঠের শেষপ্রান্তের তিন কাঠির নিচ থেকে। গ্লাভস হাতে পোস্টের নিচে ‘শেষ প্রহরী’ হয়ে দলের রক্ষাকর্তা ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন কেপ ভার্দের ভোজিনহা, কুরাসাওয়ের এলয় রুম এবং ইরানের আলিরেজা বেইরানভান্দ। দুর্দান্ত গোলকিপিংয়ে মোহগ্রস্ত করেছেন 'গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ'।
স্পেন, ইকুয়েডর ও বেলজিয়ামের মতো শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে 'চীনের মহাপ্রাচীর' হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ভোজিনহা, রুম ও আলিরেজা। শুধু ক্লিন শিটই রাখেননি, নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় গল্পও লিখেছেন।
স্পেনকে থামানো সেই রাতটা ভোজিনহার জীবনে অমর রাত হিসেবেই লিখে রাখা। ৪০ বছর বয়সী কেপ ভার্দিয়ান গোলরক্ষক থামিয়ে দিয়েছিলেন ইউরোপের সেরা দলটাকে। অথচ ভোজিনহার ক্যারিয়ারটাই যেন রূপকথার মতো। স্থানীয় ক্লাব ফুটবল থেকে দীর্ঘ অধ্যবসায় ও সংগ্রামের মাধ্যমে উঠে এসেছেন তিনি। ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি শৌখিন ফুটবল খেলতেন, খাটো হওয়ার কারণে অনেক ক্লাব তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। সব বাধা পেরিয়ে এ্যাঙ্গোলা, মলদোভা, সাইপ্রাস ও পর্তুগালের বিভিন্ন ক্লাবে খেলে নিজেকে বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করেছেন। ভোজিনহা বর্তমানে পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ফুটবল ক্লাব শাভেসের হয়ে খেলছেন।
স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচে তিনি করেন ৭টি সেভ। ইউরো চ্যাম্পিয়নদের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে ম্যাচসেরা হন। স্পেনের পর উরুগুয়ের বিপক্ষেও কেপ ভার্দে পয়েন্ট আদায় করে, যার পেছনেও ছিল তার নেতৃত্ব ও আত্মবিশ্বাস। ম্যাচ শেষে ভোজিনহা বলেন, ‘আমরা জানতাম সবাই স্পেনের জয় ধরেই নিয়েছে। কিন্তু আমরা নিজেদের বিশ্বাস হারাইনি। এই ফলাফল আমাদের দেশের জন্য।’ স্পেন ম্যাচের পর কেপ ভার্দের কোচও অবলীলায় মেনে নিলেন ভোজিনহার অমরত্ব, ’ভোজিনহা আমাদের জন্য এক দেয়ালে পরিণত হয়েছিল।’
কুরাসাওয়ের এলয় রুম দীর্ঘদিন খেলেছেন ডাচ ফুটবলে, পরে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে কলম্বাস ক্রুর হয়ে। এখন খেলছেন মিয়ামি এফসির হয়ে। সেখানকার ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই তাকে কুরাসাওয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষকে পরিণত করেছে। ইকুয়েডরের বিপক্ষে তিনি যা করেছেন, তা বিশ্বকাপ ইতিহাসেই বিরল। ৯০ মিনিটে ১৫টি সেভ করে তিনি নতুন বিশ্বকাপ রেকর্ড গড়েন। ৯০ মিনিটে সর্বোচ্চ সেভ করা বিশ্বের একমাত্র গোলকিপারে পরিণত হন রুম। ম্যাচটি শেষ হয় গোলশূন্য ড্রতে। ইকুয়েডর ম্যাচে তার প্রতিটি সেভ যেন ছিল একেকটি গোলের সমান। প্রথম ম্যাচে জার্মানির কাছে ৭ গোল খাওয়া কুরাসাওকে নতুন করে আত্মবিশ্বাস এনে দেয় এই ড্র।
অমানবিক এই পারফর্ম্যান্সের পর রুমের ভাষ্য ছিল, ‘আমি শুধু বলের সামনে নিজেকে ছুঁড়ে দিয়েছি। কখনো কখনো গোলরক্ষকের কাজ হলো দলকে বিশ্বাস করানো যে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।’
ইরানের আলিরেজা দেখিয়েছেন আরেক বীরত্ব। ‘চীনের প্রাচীর’ হয়ে ইউরোপের অন্যতম সেরা দল বেলজিয়ামের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। দারিদ্র্য, ভবঘুরে জীবন এবং কঠোর অধ্যবসায়ের এক রূপকথাই বটে তার জীবন। পরিবারের চরম আর্থিক অনটনের কারণে ঘর ছেড়ে তেহরানে পালানো, পার্কের বেঞ্চে ঘুমানো, ফুটপাতে দিন কাটানো এবং বেঁচে থাকার জন্য গাড়ি পরিষ্কার বা ইটভাটায় কাজ করার মতো কঠোর শ্রমের মধ্য দিয়ে স্বপ্নের পথে পা বাড়ানো আলিরেজাই এখন ইরানের বীর।
আলিরেজা বর্তমানে ফার্সি গালফ প্রো লিগের ক্লাব ট্রাক্টরে খেলছেন। ক্লাব পর্যায়ে পার্সেপোলিসের হয়ে একাধিক শিরোপা জিতেছেন। বেলজিয়ামের বিপক্ষে তিনি করেন ৭টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ। কেভিন ডি ব্রুইনে ও রোমেলু লুকাকুদের আক্রমণ বারবার ব্যর্থ করে ম্যাচটি গোলশূন্য ড্রয়ের দিকে নিয়ে যান। ইরান পায় এক পয়েন্ট।
আলিরেজার জন্য অবশ্য বড় ম্যাচ ডাল-ভাত। তিনি বড় ম্যাচের জন্যই অপেক্ষা করেন বলেই জানিয়েছেন। বেলজিয়ামকে রুখে আলিরেজার কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাস, ‘বিশ্বকাপে কোনো দলকে ভয় পাওয়া যায় না। আমরা জানতাম বেলজিয়ামের তারকা আছে, কিন্তু আমাদেরও হৃদয় আছে। গোলরক্ষক হিসেবে এমন ম্যাচের জন্যই অপেক্ষা করি। যখন সবাই মনে করে আপনি হারবেন, তখন নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ আসে।’
বিশ্বকাপের চলতি আসরে এখন পর্যন্ত পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে মহাকাব্য লিখতে পেরেছেন কেবল এ তিনজনই। ভোজিনহা ও আলিরেজার ৭ সেভ আর রুমের অবিশ্বাস্য ১৫ সেভ—এই তিনটি পারফরম্যান্স মনে করিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপ শুধু গোলদাতাদের মঞ্চ নয়। কখনও কখনও একজন গোলরক্ষকই পুরো জাতির স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখেন।
এই বিশ্বকাপে তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে—এটা কি শুধু ফরোয়ার্ডদের বিশ্বকাপ? নাকি পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সেই নীরব নায়কদেরও বিশ্বকাপ? এখন পর্যন্ত উত্তরটা স্পষ্ট। গোলরক্ষকদের গ্লাভসে ভর করেই কয়েকটি দেশের বিশ্বকাপ স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে। আর সেই কারণেই ২০২৬ বিশ্বকাপের এই অধ্যায়টাকে অনায়াসেই বলা যায় গোলকিপারদের মহাকাব্যের বিশ্বকাপ।