বিশ্বমঞ্চে জিদান-পুত্রের অগ্নিপরীক্ষা
ফুটবলপ্রেমীদের নজর কাড়তে যাচ্ছে এক রোমাঞ্চকর ও আবেগঘন লড়াই। বিশেষ করে গ্রুপ ‘জে’-এর উদ্বোধনী ম্যাচটি ঘিরেই এখন বিশ্বজুড়ে তুমুল হাইপ তৈরি হয়েছে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে এই ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং উত্তর আফ্রিকার পরাশক্তি আলজেরিয়া। তবে মাঠের ফুটবলীয় কৌশলের বাইরে এই ম্যাচের স্পটলাইট এখন অনেকটাই কেড়ে নিয়েছেন আলজেরিয়ার গোলপোস্টের নিচে দাঁড়াতে যাওয়া নতুন অতন্দ্র প্রহরী—লুকা জিদান। বিশ্বজয়ী ফ্রান্সের কিংবদন্তি ফুটবলার জিনেদিন জিদানের ছেলে লুকার জন্য এই ম্যাচটি একই সঙ্গে যেমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, তেমনি তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা।
ফরাসি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল নায়ক জিনেদিন জিদানের চার ছেলের সবাই ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় ছেলে লুকা জিদান বেছে নিয়েছেন গোলরক্ষকের ভূমিকা। ফরাসি বংশোদ্ভূত লুকা তার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২০ সহ বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলগুলোয় নিয়মিত খেলেছেন। এমনকি ২০১৫ সালে ফ্রান্সের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৭ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার স্বাদও পেয়েছেন। তবে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে এক বড় সিদ্ধান্ত নেন। ফরাসি জাতীয় দলের বিকল্প পথ এড়িয়ে বেছে নেন তার দাদা-দাদির দেশ আলজেরিয়াকে।
স্প্যানিশ ক্লাব গ্রানাডার হয়ে ঘরোয়া ফুটবলে নিয়মিত পারফর্ম করা এই গোলরক্ষকের জন্য এটিই আলজেরিয়ার ‘মরুভূমির-যোদ্ধা’দের জার্সিতে প্রথম বিশ্বকাপ। স্বাভাবিকভাবেই, কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের ছেলে হিসেবে আলজেরিয়ার ফুটবল ভক্তদের পাশাপাশি পুরো ফুটবল বিশ্বের প্রত্যাশার চাপ তার ওপর আকাশচুম্বী।
লুকা জিদানের এই বিশ্বকাপ যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে, গত এপ্রিল মাসে স্প্যানিশ লিগে গ্রানাডার হয়ে খেলার সময় এক মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হন। ম্যাচের একপর্যায়ে প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারের সঙ্গে সংঘর্ষে তার চোয়াল ও চিবুকে গুরুতর ইনজুরি ধরা পড়ে। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা এবং চোটের ভয়াবহতা দেখে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন তার বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন এখানেই শেষ।
তবে সব বাধা, মানসিক ধকল ও চিকিৎসকদের আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে মাঠে ফেরেন। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সুস্থ হয়ে আলজেরিয়ার ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত বিশ্বকাপ দলে নিজের জায়গা নিশ্চিত করেন এই তারকা গোলরক্ষক। তবে চোট কাটিয়ে মাঠে ফিরলেও, বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে কতটা ছন্দে ও পূর্ণ ফিটনেসে আছেন, তা এই প্রথম ম্যাচেই প্রমাণিত হবে।
আলজেরিয়ার প্রথম ম্যাচটিই হতে যাচ্ছে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ, বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে। লিওনেল মেসি এবং হুলিয়ান আলভারেজদের মতো বিশ্বমানের ও বিধ্বংসী তারকাদের নিয়ে গড়া আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ যেকোনো রক্ষাব্যুহকে মুহূর্তের মধ্যে গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম। আলবিসেলেস্তেদের এই অতি-আক্রমণাত্মক ও গতিময় ফুটবল সামলাতে হলে গোলপোস্টের নিচে লুকা জিদানকে তার জীবনের সেরা পারফরম্যান্স প্রদর্শন করতে হবে।
স্কোয়াডে লুকার অন্তর্ভুক্তি নিঃসন্দেহে আলজেরিয়া দলের আত্মবিশ্বাস বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে আর্জেন্টিনার মতো হাই-প্রেসিং ফুটবল খেলা দলের বিপক্ষে তিনি গোলপোস্টের সামনে কতটা শক্ত দেয়াল বা ‘চীনের প্রাচীর’ হয়ে দাঁড়াতে পারেন—এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় বুঁদ হয়ে আছে পুরো ফুটবল বিশ্ব। বাবার নামের গৌরব নাকি নিজের যোগ্যতার প্রমাণ—লুকা জিদানের জন্য এই ম্যাচটি নিজেকে চেনানোর এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম।