বিশ্বকাপের প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোকে হারিয়ে শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছে ফ্রান্স। তবে এই ম্যাচটি কেবল সেমিফাইনালে ওঠার লড়াই ছিল না, এর পেছনে জড়িয়ে ছিল আবেগ, বন্ধুত্ব এবং নিজের জন্মভূমির বিপক্ষে খেলার এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক গল্প।
পিএসজিতে একসঙ্গে খেলার সুবাদে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আশরাফ হাকিমির বন্ধুত্ব ফুটবল বিশ্বে বেশ পরিচিত। ক্লাব ফুটবলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়লেও, বৃহস্পতিবার দেশের জার্সিতে দুই বন্ধু একে অপরের বিপক্ষে খেলেছেন। মাঠের ৯০ মিনিটে বন্ধুত্ব একপাশে সরিয়ে রেখে এমবাপ্পে জিতিয়েছেন ফ্রান্সকে, আর হাকিমি লড়াই করেও মরক্কোর রক্ষণ সামলাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এই ম্যাচের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিক হলো মরক্কো দলের ছয়জন ফুটবলারের জন্মই হয়েছে ফ্রান্সে। আগের প্রজন্মের অভিবাসী পরিবারের সন্তান হওয়ায় জন্মসূত্রে ফ্রান্স ও বংশসূত্রে মরক্কো—দুই দেশের হয়েই খেলার সুযোগ ছিল তাদের সামনে। তবে হৃদয়ের টানে তারা বেছে নিয়েছেন মরক্কোকে।
ফ্রান্সের বিপক্ষে মাঠে নামা এই ছয় ফুটবলার হলেন- রেদুয়ান হালহাল, গেসিম ইয়াসিন, সামির এল মুরাবেত, নিল এল আয়নাউয়ি, ইসা দিওপ এবং আইয়ুব বুয়াদ্দি। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে ১৮ বছর বয়সী মিডফিল্ডার আইয়ুব বুয়াদ্দিকে নিয়ে। এই বছরের শুরুতেও তিনি ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-২১ দলের অধিনায়ক ছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে নিজের আদি শিকড় মরক্কোর জাতীয় দলকে বেছে নেন এই তরুণ প্রতিভা।
যে দেশের বিপক্ষে খেলা, সেই দেশে জন্ম নেওয়া ফুটবলারদের নিয়ে মরক্কোর মাঠে নামার অভিজ্ঞতা এবারই প্রথম নয়। এর আগে শেষ বত্রিশের ম্যাচে তারা নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হয়েছিল দেশটিতে জন্ম নেওয়া ৩ জন খেলোয়াড়কে নিয়ে। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই সংখ্যাটা এবার দ্বিগুণ।
দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা প্রতিভাবান ফুটবলারদের স্কাউট করে জাতীয় দলে টানার এই কৌশল মরক্কো বেশ কয়েক বছর ধরেই সফলভাবে করে আসছে। অতীতেও সোফিয়ান বৌফাল, রোমাঁ সাইস, মারুয়ান শামাখ, মেহদি বেনাতিয়া ও মুস্তাফা হাজ্জির মতো ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া তারকারা মরক্কোর জার্সিতে মাঠ কাঁপিয়েছেন।
ম্যাচটি তাই কেবল দুদলের ফুটবল কৌশলের লড়াই ছিল না; বরং এটি ছিল চেনা পরিবেশ বনাম আদি শিকড়ের এক আবেগঘন প্রদর্শনী। ফুটবলবিশ্ব অধীর আগ্রহে উপভোগ করেছে—বন্ধুর বিপক্ষে বন্ধু আর জন্মভূমির বিপক্ষে শিকড়ের এই লড়াই। শেষে এক বন্ধু হেসেছেন, অন্য বন্ধু বিদায় নিয়েছেন চোখের জলে। জন্মভূমি জিতলেও হারের তেতো স্বাদ নিয়ে মাঠ ছাড়ে শিকড়ের দেশ।