হোম > খেলা > ফুটবল বিশ্বকাপ

জাপানের হৃদয় ভেঙে শেষ ষোলোয় ব্রাজিল

ব্রাজিল ২-১ জাপান

এম. এম. কায়সার

প্রথম ৪৫ মিনিটে মনে হচ্ছিল, ব্রাজিল শুধু পিছিয়েই নেই, পিছিয়ে পড়েছে আধুনিক ফুটবলের চিন্তায়ও। বল ছিল তাদের, দখল ছিল তাদের, কিন্তু ম্যাচ ছিল পুরোপুরি জাপানের। হিউস্টনের মাঠে জাপানি কোচ হাজিমে মরিয়াসুর শিষ্যরা এমন শৃঙ্খলাবদ্ধ, এমন সংগঠিত ফুটবল খেলল যে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আক্রমণ একের পর এক নিষ্ফল হয়ে ফিরে এলো। মনে হচ্ছিল সেলেসাও যেন প্রতিপক্ষের পাতানো এক নিখুঁত কৌশলগত জালে আটকা পড়েছে।

কিন্তু ফুটবল শুধু প্রথমার্ধের খেলা নয়। ড্রেসিংরুমে ১৫ মিনিটের বিরতিও অনেক সময় পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়। ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি সেটিই করলেন।

একটি কৌশলগত পরিবর্তন, একটি ভিন্ন আক্রমণ পরিকল্পনা আর তার ফল—দ্বিতীয়ার্ধে সম্পূর্ণ অন্য এক ব্রাজিল। কাসেমিরোর হেডে সমতা, তারপর ইনজুরি টাইমে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির দারুণ দলীয় আক্রমণ থেকে জয়সূচক গোল। ২-১ গোলে জিতে রাউন্ড অব থার্টি টু পার করে শেষ ষোল-এ উঠে গেল ব্রাজিল। প্রথমার্ধ ছিল জাপানের মাস্টারক্লাস আর পরের অর্ধ ছিল ব্রাজিলের ব্লকবাস্টার মেজাজে ফিরে আসা!

শুরু থেকেই ব্রাজিল বলের দখল নিয়েছিল। প্রথম ২০ মিনিটে তাদের বল দখল ছিল ৭০ শতাংশেরও বেশি। কিন্তু সেই দখলের কোনো ধার ছিল না। ব্রুনো গিমারায়েসের একের পর এক দূরপাল্লার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে, মাথেউস কুনিহার প্রচেষ্টা সহজেই সামলেছেন জাপান গোলরক্ষক জিওন সুজুকি। ভিনিসিউস জুনিয়রকে এমনভাবে আটকে রাখা হয়েছিল যে তার গতি কিংবা এক-একজনকে কাটিয়ে ওঠার সামর্থ্য কোনোটিই কাজে লাগেনি।

জাপান ঠিক এটাই চেয়েছিল এবং প্রথমার্ধের গোলে ম্যাচে এগিয়ে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করার পথ প্রায় তৈরি করেই ফেলেছিল, কিন্তু ব্রাজিল তো ব্রাজিলই। পিছিয়ে থেকে ফিরে এসেও যে ম্যাচে জেতা যায় সেটাই করে দেখাল ব্রাজিল। তা-ও আবার দুর্দান্ত মেজাজে।

প্রথমার্ধে পাঁচ ডিফেন্ডার ও চার মিডফিল্ডারের ঘন ব্লক তৈরি করে জাপানিরা ব্রাজিলের মাঝমাঠের পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। বাধ্য হয়ে ব্রাজিলকে পরিকল্পনা বদলে উইং ধরে খেলতে হয়। কিন্তু সেখানে ছিল না ওভারল্যাপ, ছিল না ডিপ রান, ছিল না বক্সে পর্যাপ্ত উপস্থিতি। ফলে শত শত পাসের পরও ব্রাজিলের আক্রমণ হয়ে উঠছিল নিষ্প্রাণ। ২৯ মিনিটে সে কৌশলেরই পুরস্কার পায় জাপান।

দ্রুত পাল্টা আক্রমণে মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে উঠে আসেন কাইশু সানো। কাসেমিরোকে সামনে পেয়েও তিনি থামেননি। ডি-বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া দুর্দান্ত শট গ্যাব্রিয়েলের পাস দিয়ে আলিসঁর নাগালের বাইরে জালে জড়িয়ে যায়। পুরো স্টেডিয়াম যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। স্কোরলাইন বলছিল ১-০। কিন্তু খেলার ভাষা বলছিল, জাপান আরো অনেক বেশি এগিয়ে।

বিরতির বাঁশি বাজতেই ব্রাজিলের ড্রেসিংরুমে নিশ্চয়ই কঠিন কথাই বলেছেন আনচেলত্তি। কারণ দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে যে দল নেমেছিল, তারা প্রথমার্ধের ব্রাজিল ছিল না। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল আক্রমণের ধরনে।

প্রথমার্ধে ব্রাজিল বক্সের বাইরে বল ঘুরিয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধে লক্ষ্য একটাই—বল যেভাবেই হোক জাপানের বক্সে রাখতে হবে। উইং থেকে একের পর এক ক্রস, দ্বিতীয় বল সংগ্রহ, বক্সে অতিরিক্ত খেলোয়াড় ঢোকানো এবং আগ্রাসী প্রেসিং—এ চারটি বিষয় পুরো ম্যাচের চেহারা বদলে দেয়। জাপান, যারা প্রথমার্ধে আরাম করে নিজেদের রক্ষণ সামলাচ্ছিল, হঠাৎ করেই প্রবল চাপে পড়ে যায়।

৫৬ মিনিটে আসে সে কাঙ্ক্ষিত ফল। গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসের ভাসিয়ে দেওয়া বল ফার পোস্টে গিয়ে পড়ে। সেখানে সবচেয়ে উঁচুতে উঠে অসাধারণ হেড করেন কাসেমিরো। বল জালে। ১-১।

ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই। প্রথমার্ধে যিনি ছিলেন ব্রাজিলের সবচেয়ে সমালোচিত খেলোয়াড়, দ্বিতীয়ার্ধে তিনিই হয়ে গেলেন প্রত্যাবর্তনের নায়ক। প্রথমার্ধে সানোর গোলের সময় তাকেই দায়ী করা হচ্ছিল, মাঝমাঠেও তার প্রভাব ছিল না বললেই চলে। অথচ একটি হেডেই বদলে গেল তার ম্যাচের গল্প।

সমতায় ফেরার পরও সহজ ছিল না পথ। জিওন সুজুকি একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে জাপানকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন। বিশেষ করে ভিনিসিউস জুনিয়রের নিশ্চিত গোল তিনি আঙুলের ডগায় লাগিয়ে গোল বাঁচিয়ে দেন। নিশ্চিত জালে যেত যে বল সেটা পোস্টে লেগে ফিরে এলে। তখন মনে হচ্ছিল, হয়তো ম্যাচ গড়াবে অতিরিক্ত সময়ে। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন দলগুলোর একটি বিশেষ গুণ থাকে। তারা সুযোগের অপেক্ষা করে আর সুযোগ এলেই নির্মমভাবে আঘাত হানে।

ইনজুরি টাইমে ব্রাজিল সেটিই করেছে। ধৈর্য ধরে গড়া এক দৃষ্টিনন্দন দলীয় আক্রমণে একের পর এক ছোট পাসে জাপানের রক্ষণ ভেঙে ফেলা হয়। শেষ মুহূর্তে বল পৌঁছে যায় গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির কাছে। কোনো তাড়াহুড়ো নয়, কোনো আতঙ্ক নয়। মাথা ঠান্ডা রেখে নিখুঁত ফিনিশিং।

গোল।

এই গোলেই হিউস্টনের গ্যালারি যেন বিস্ফোরিত হয় উল্লাসে। ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা ছুটে যান কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে। আর অন্য প্রান্তে জাপানের ফুটবলাররা বসে পড়েন সবুজ ঘাসে। ৯০ মিনিট ধরে নিখুঁত পরিকল্পনা করে খেলেও শেষ মুহূর্তে স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা বড় নির্মম।

তবু জাপানের জন্য এটি গর্বের ম্যাচ। তারা দেখিয়ে দিয়েছে, সংগঠিত ফুটবল, শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ এবং স্পষ্ট কৌশল দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে সফল দলকেও দীর্ঘ সময় অসহায় করে রাখা যায়।

আর ব্রাজিল?

এই ম্যাচ তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। প্রথমার্ধে তারা হেরেছিল কৌশলে। দ্বিতীয়ার্ধে জিতেছে কৌশলেই। আনচেলত্তির 'বল ইন বক্স' দর্শন জাপানের দুর্ভেদ্য রক্ষণ ভেঙে দিয়েছে। আর সেখানেই বোঝা গেছে, বড় দলের আসল পরিচয় শুধু প্রতিভায় নয়, প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজেদের বদলে নেওয়ার ক্ষমতায়।

অন্ধকারে হারিয়ে যেতে বসা ব্রাজিল শেষ পর্যন্ত আলো খুঁজে নিয়েছে। আর সেই আলোয় ভর করেই ব্রাজিল উঠে গেল রাউন্ড অব সিক্সটিনে। লক্ষ্য একটাই—হেক্সা মিশন!

জার্মানিকে হারানোর আনন্দে প্যারাগুয়েতে জাতীয় ছুটি

নেদারল্যান্ডসের টাইব্রেকার ট্র্যাজেডি, শেষ ষোলোতে মরক্কো

আফ্রিকান ‘হাতি’র সামনে ইউরোপের ভাইকিং

বিশ্বকাপ থেকে ভিনিসিয়ুসের চাওয়া ‘আরও বেশি’

‘ধৈর্য আর চাপই জয়ের চাবিকাঠি’, মার্টিনেল্লির গোলের পর কাসেমিরোর বার্তা

হাভার্টজের ট্র্যাজেডিতে জার্মানির বিদায়ে শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়ে

আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার সহজ রোডম্যাপ, আসল পরীক্ষা সেমিতে

ইতিহাসের পাতায় স্টিফেন ইউস্তাকিও

বিশ্বাস ছিল সঠিক সময় আসবেই: ক্যাসেমিরো

দক্ষিণ কোরিয়ান কোচের পদত্যাগ