ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ মানেই বিশ্বজোড়া উন্মাদনা, ট্রফি জয়ের লড়াই আর মাঠের বুকে ইতিহাস লেখা। তবে এবার মাঠের সেই ইতিহাস সরাসরি ফুটবল ভক্তদের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দেওয়ার এক অভিনব ও অবিশ্বাস্য উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। আগামী ১৯ জুলাই নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে হতে যাওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপের মেগা ফাইনালের মাঠের আসল ঘাসই এবার অনলাইনে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। স্মারক হিসেবে ফুটবল ইতিহাসের এই টুকরোটি নিজের সংগ্রহে রাখতে অবশ্য ভক্তদের গুনতে হবে মোটা অঙ্কের ডলার।
মাঠের আসল ঘাস যেন নষ্ট না হয়ে বছরের পর বছর সতেজ থাকে, সেজন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বিশেষ প্রযুক্তি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘কিপ স্টাব’ এই অনন্য স্মারকগুলো তৈরির দায়িত্ব পেয়েছে। অ্যাক্রিলিকের তৈরি একধরনের স্বচ্ছ রেজিন বা আঠার আবরণে সুরক্ষিতভাবে আটকে দেওয়া হবে ঘাসের টুকরোগুলো। এই আবরণের ওপর খোদাই করা থাকবে ২০২৬ বিশ্বকাপের লোগো, ভেন্যুর নাম, তারিখ এবং ফাইনাল ম্যাচের চূড়ান্ত ফলাফল। এছাড়া ঘাসটি যে সম্পূর্ণ আসল, তার প্রমাণপত্র হিসেবে প্রতিটি স্মারকের সঙ্গে থাকবে একটি বিশেষ ইউএসবি ড্রাইভ।
২০২৬ বিশ্বকাপের সালের সঙ্গে মিল রেখে প্রতিটি সংস্করণের জন্য মাত্র ২০২৬টি করে ঘাসের টুকরো বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ক্রেতাদের সুবিধার্থে এটি ৪টি ভিন্ন সংস্করণে বাজারে আনা হয়েছে। ২.৫ ইঞ্চি বাই ২.৫ ইঞ্চি আকারের এই সংস্করণের দাম ৪৫০ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫৫ হাজার টাকার বেশি। মিডিয়াম এডিশন—এই ক্যাটাগরিতে রয়েছে দুটি সংস্করণ, যেগুলোর দাম যথাক্রমে ৯০০ ডলার এবং ১২০০ ডলার।
হিরো এডিশন (প্রিমিয়াম)—এটি সবচেয়ে দামি ও আকর্ষণীয় সংস্করণ, যার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকার বেশি। এতে মিলবে তুলনামূলক বড় (৩ ইঞ্চি বাই ৩ ইঞ্চি) ঘাসের টুকরো। এছাড়া এই প্রিমিয়াম সংস্করণের ক্রেতারা উপহার হিসেবে পাবেন স্বর্ণ দিয়ে খোদাই করা একটি মেটাল টিকিট, ফাইনাল ম্যাচের বলের মিনি রেপ্লিকা এবং ক্রিস্টাল কাটের কাচ দিয়ে তৈরি একটি আকর্ষণীয় বিশ্বকাপ ট্রফি।
যদি এই সীমিত সংস্করণের সবগুলো স্মারক সম্পূর্ণ বিক্রি হয়ে যায়, তবে শুধু মাঠের এই ঘাস বিক্রি করেই ফিফার পকেটে ঢুকবে ১ কোটি ১২ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩৫ কোটি টাকা!
ইচ্ছা করলেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের ফুটবল অনুরাগী এই ঘাস কিনতে পারবেন না। ফিফা জানিয়েছে, লজিস্টিক ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে এই ঐতিহাসিক স্মারকটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের ক্রেতাদের ঠিকানায় পাঠানো যাবে। তাছাড়া ক্রেতারা এটি হাতে পাবেন ফাইনাল ম্যাচটি সফলভাবে শেষ হওয়ার পর, যখন মাঠ থেকে আসল ঘাস সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পন্ন হবে।
যে মাঠের ঘাস নিয়ে বিশ্বজুড়ে এত বিপুল অর্থের বাণিজ্য চলছে, সেই নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের মাঠের মান নিয়ে কিন্তু সমালোচনাও কম হচ্ছে না। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘাসটি গত মে মাসের শুরুতে উত্তর ক্যারোলাইনার একটি ফার্ম থেকে এনে স্টেডিয়ামে বসানো হয়েছিল। তবে চলতি টুর্নামেন্টের আগের রাউন্ডের ম্যাচগুলো খেলার পর ব্রাজিল ও ফ্রান্সের মতো পরাশক্তি দলের ফুটবলাররা এই মাঠের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, মাঠটি অত্যন্ত শুষ্ক এবং এখানে স্বাভাবিক গতিতে বল পাস বা খেলা চালানো বেশ কঠিন।
চলতি বিশ্বকাপে এটিই ফিফার একমাত্র দামি স্মারক নয়। এর আগে গত মে মাসে প্রতিটি আয়োজক শহরের জন্য সীমিত সংস্করণের (প্রতি শহরের জন্য ৯৯৯টি) বিশেষ জার্সি বাজারে এনেছিল তারা, যার একেকটির দাম ছিল ৩৭৫ মার্কিন ডলার।
খেলোয়াড়দের চোখে মাঠের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, ফিফার এই চতুর ও আকর্ষণীয় বাণিজ্যিক আইডিয়া যে বিশ্বের ধনী ফুটবল সংগ্রাহকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলবে, তা বলাই বাহুল্য।