গোলাপি বুটের জোয়ারে ভাসছে বিশ্বমঞ্চ
জমজমাট লড়াই চলছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে। হচ্ছে গোল উৎসবও। তবে মাঠের ফুটবলীয় লড়াইয়ের পাশাপাশি এবার দর্শকদের নজর কেড়েছে এক অদ্ভুত ও চোখ ধাঁধানো দৃশ্য—মাঠজুড়ে ফুটবলারদের পায়ে গোলাপি রঙের বুটের আধিপত্য। নাইকি, অ্যাডিডাস, পুমা, নিউ ব্যালেন্স কিংবা স্কেচার্স—ব্র্যান্ড যা-ই হোক না কেন, উত্তর আমেরিকার সবুজ মাঠগুলো যেন এখন এক গোলাপি সমুদ্র! ফুটবলারদের জুতোয় এমন অভূতপূর্ব রঙের অভিন্নতা এর আগে কোনো বিশ্বকাপে দেখা যায়নি।
ক্রীড়াসামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, এটি মোটেও কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা। নাইকির বৈশ্বিক ফুটবল ফুটওয়্যার দলের অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা ওডিঙ্গা নিমাকো জানিয়েছেন, খেলোয়াড় ও ভোক্তাদের মনস্তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বড় মঞ্চে মাঠে নামার আগে উজ্জ্বল রঙ খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। কারণ, এত উজ্জ্বল রঙের বুট পরে মাঠে নামার জন্য বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়, যা ফুটবলারদের অবচেতনে এক ধরনের ইতিবাচক জেদ তৈরি করে।
এছাড়া বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবুজ ঘাসের মাঠে গোলাপি রঙ সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমানতা তৈরি করে। গ্যালারিতে থাকা দর্শক কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় হাই-ডেফিনিশন সম্প্রচারে এই বুটগুলো সহজেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। ট্রেন্ড বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালেই বৈশ্বিক ফ্যাশন পূর্বাভাসে ‘ইলেকট্রিক ফুসিয়া’ বা উজ্জ্বল গোলাপি রঙকে ২০২৬-এর গ্রীষ্মের প্রধান রঙ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল, যা ব্র্যান্ডগুলোকে এই থিম বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
তবে এই গোলাপি বুটের একটি নেতিবাচক দিকও দেখছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা। অতীতে বুটের রঙ দেখে দূর থেকে প্রিয় খেলোয়াড়কে চেনা যেত; কিন্তু এখন প্রায় সবার পায়ে একই রঙের বুট থাকায় দর্শকদের কিছুটা বিভ্রান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
অবশ্য এই গোলাপি জোয়ারের মধ্যেও কিছু ব্যতিক্রম লক্ষ করা গেছে। ফিফার কঠোর নির্দেশনার কারণে রেফারি ও ম্যাচ অফিসিয়ালরা ঐতিহ্যবাহী কালো রঙের অ্যাডিডাস বুট পরেই ম্যাচ পরিচালনা করছেন। অপরদিকে বিশ্বের শীর্ষ কয়েকজন মহাতারকার জন্য স্পন্সররা তৈরি করেছে বিশেষায়িত বুট। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি মাঠে নামছেন আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা পতাকার আদলে তৈরি অ্যাডিডাসের ‘এল আলতিমো ট্যাঙ্গো’ বুট পরে, যাতে রয়েছে সোনালি আভা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিক পরছেন নীল তারকায় খচিত পুমার সাদা বুট। অন্যদিকে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ স্মরণীয় করে রাখতে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জন্য নাইকি তৈরি করেছে সম্পূর্ণ সোনালি রঙের একটি বিশেষ বুট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গোলাপি উন্মাদনা কেবল বিশ্বকাপকেন্দ্রিক এবং এটি সাময়িক। আগামী জুলাইয়ের শেষে যখন নতুন ঘরোয়া মৌসুম শুরু হবে, তখন চুক্তি অনুযায়ী ব্র্যান্ডগুলো খেলোয়াড়দের পায়ে নতুন রঙের বুট তুলে দেবে। তবে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপটি যে ফুটবলের ইতিহাসে ‘গোলাপি বিশ্বকাপ’ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, তা বলাই বাহুল্য।