একটি ইন্টারনেট মিম, কয়েক সেকেন্ডের রসিকতা—অথচ তার রেশ ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপের ফুটবল ও বাণিজ্যজগতে। কিলিয়ান এমবাপ্পের একটি মন্তব্যে ক্ষুব্ধ চীন। এর জেরে দেশটির তিনটি প্রতিষ্ঠান ফরাসি তারকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বন্ধ করেছে লা লিগার ম্যাচ দেখানো। পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্ষমা চেয়েছেন এমবাপ্পে, লা লিগা ও রিয়াল মাদ্রিদ। কিন্তু তাতেও সন্তুষ্ট নয় চীন।
প্রশ্ন উঠেছে, ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী ফুটবল লিগ এবং বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্লাবগুলোর একটি রিয়াল মাদ্রিদ কেন চীনের কাছে এতটা নমনীয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ফুটবলের বাইরের বিশাল বাণিজ্যিক জগতে।
বিতর্কের সূত্রপাত ফরাসি অনুষ্ঠান ‘দ্য ব্রিজ’-এ এমবাপ্পের একটি সাক্ষাৎকার থেকে। সেখানে চীনের সাবেক নেতা মাও সে তুংয়ের অবয়ব ব্যবহার করে তৈরি একটি ভিডিও ভালো লাগার কথা বলেন তিনি। মাওকে নিয়ে এমন রসিকতা চীনে অত্যন্ত সংবেদনশীল। মন্তব্যটি ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভ তৈরি হয়। ২৭ অক্টোবর ডংপেং, মেংনিউ ও মিল্কগ্রাউন্ড নামের তিনটি চীনা প্রতিষ্ঠান এমবাপ্পের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে। একই সময়ে চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) লা লিগার সম্প্রচার স্থগিত করে।
এমবাপ্পে দুঃখ প্রকাশের পর লা লিগা ও রিয়াল মাদ্রিদও ক্ষমা চেয়েছে। কিন্তু সিএমজির দাবি, রিয়াল মাদ্রিদকে যথাযথভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। সংকট মেটাতে লা লিগা সভাপতি হাভিয়ের তেবাস চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর চীন সফরেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
লা লিগার জন্য চীনের গুরুত্বের বড় জায়গা সম্প্রচারস্বত্ব। এএফপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ মৌসুমে লিগটির আন্তর্জাতিক সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য ছিল ৭৪৮ মিলিয়ন ইউরো। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র মিলেই এই আয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ জোগায়। দুই দেশের মধ্যে চীনের একক অবদান প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশটির দর্শকবাজার যে সম্প্রচারস্বত্বের মূল্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে, তা স্পষ্ট।
এশিয়ার দর্শকদের কাছে পৌঁছাতে ২০১৬ সাল থেকেই ম্যাচের সূচি এ অঞ্চলের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নেয় লা লিগা। চীনে দুটি কার্যালয়সহ আটটি দেশে নয়টি অফিসও খুলেছে তারা। ২০১৫ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তি হয়েছিল, যার মূল্য ছিল ৩৭৫ মিলিয়ন ইউরোর বেশি।
সম্প্রতি চায়না মোবাইলের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মিগুর সঙ্গে ২০২৬–২৭ থেকে ২০২৯–৩০ মৌসুম পর্যন্ত চুক্তি করেছে লা লিগা। এর ফলে চীনের দর্শকেরা প্রতি মৌসুমে লিগের ৩৮০টি ম্যাচই দেখতে পারবেন। চুক্তির আর্থিক অঙ্ক প্রকাশ করা হয়নি। এর আগে ২০২৪ সালে সিএমজির সঙ্গেও ফ্রি-টু-এয়ার সম্প্রচারের চুক্তি করেছিল লিগটি।
রিয়াল মাদ্রিদের কাছে চীনের গুরুত্ব আরও বিস্তৃত। শুধু সম্প্রচার নয়, জার্সি ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি, স্পনসরশিপ এবং ব্র্যান্ডের বাজার—সবখানেই দেশটির প্রভাব রয়েছে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কার তথ্য অনুযায়ী, রিয়ালের জার্সি ও মার্চেন্ডাইজ বিক্রির ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আসে চীন থেকে।
ডেলয়েটের ফুটবল মানি লিগ অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ মৌসুমে রিয়ালের রাজস্ব ছিল ১ হাজার ১৬১ মিলিয়ন ইউরো। ক্লাবটির বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যেও রয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠান হাইসেন্স ও লিংলং টায়ার। ফলে চীনের বাজারে সুনাম নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়তে পারে ক্লাবটির ব্যবসায়।
চীনের ক্রীড়াবাজার আরও বড় হওয়ার পথে। দেশটির সরকারি সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ক্রীড়াশিল্পের আকার ৭ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের বেশি করার লক্ষ্য রয়েছে। ২০২৪ সালে এই শিল্পের উৎপাদনমূল্য ছিল ৩.৮৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান।
অর্থাৎ, চীন শুধু বর্তমানের বড় বাজার নয়, ভবিষ্যতেরও বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। সেই বাজারে প্রবেশাধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক ধরে রাখাই এখন লা লিগা ও রিয়ালের বড় চিন্তা।
মাঠের ফুটবলে রিয়াল মাদ্রিদ যতই শক্তিশালী হোক, বৈশ্বিক বাণিজ্যের খেলায় চীনের বাজারকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এমবাপ্পের একটি মন্তব্যে তৈরি সংকট তাই ফুটবলের চেয়ে অনেক বড় এক অর্থনৈতিক বাস্তবতাই সামনে এনেছে।