এক মুহূর্ত আগেও পায়ে ছিল বল। লক্ষ্য গোলপোস্ট। চিতার গতিতে ছুটে চলা। গ্যালারির উল্লাস, উন্মাদনা আর চিৎকার। পরমুহূর্তেই হোঁচট খাওয়া। সবুজ গালিচায় গড়াগড়ি। সতীর্থদের ছোটাছুটি, চিকিৎসকদের ব্যস্ততা, গ্যালারিতে পিনপতন নীরবতা, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং বেদনার্ত খবর। দৃশ্যটা ফুটবল মাঠের। ফুটবলের ১৬৩ বছরের ইতিহাসে এমন ঘটনা অহরহ ঘটেছে। কেউ ফিরে এসেছে, কেউ ফিরলেও মাঠ তাকে স্বাগত জানিয়েছে দর্শক হিসেবে, কেউবা মাঠকেই বিদায় জানিয়েছে চিরতরে। যে তালিকায় সবশেষ নাম স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের দল টেনেরিফের হেসুস দে মিগেল। যার মৃত্যু মনে করিয়ে দিল, সবুজ গালিচা অসমাপ্ত জীবনের গল্পেরও জমিন।
গত ২ নভেম্বর এফসি আন্দোরার বিপক্ষে টেনেরিফের হয়ে খেলছিলেন ৩০ বছর বয়সি স্ট্রাইকার দে মিগেল। ম্যাচের যোগ করা সময়ে লম্বা বলের পেছনে ছুটতে গিয়ে আন্দোরার গোলরক্ষক হেসুস ওনোর সঙ্গে সংঘর্ষ হয় তার। বল ক্লিয়ার করতে এগিয়ে আসা গোলরক্ষকের হাঁটু আঘাত করে দে মিগেলের বুকে। মাঠেই লুটিয়ে পড়েন স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড। চিকিৎসকরা পাঁচ মিনিটের বেশি সময় ধরে মাঠে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরদিন মৃত্যু হয় তার। সংঘর্ষের পর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ২-২ গোলে থাকা ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত পরিত্যক্ত হয়।
সবুজ গালিচায় অসমাপ্ত জীবনের এই তালিকাটা বেশ ভারী। নামগুলোয় আলোকপাত করলে কেবলই ফিরে আসে বেদনার্ত স্মৃতি আর বিষাদের হাওয়া। সে হাওয়ায় আরেকবার ভেসে ফেরা যাক।
ফোয়ে : যে মৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছিল ফুটবলবিশ্ব
ফুটবল মাঠে আকস্মিক মৃত্যুর কথা উঠলে সবার আগে মনে পড়ে ক্যামেরুনের মার্ক-ভিভিয়েন ফোয়ের নাম। ২০০৩ সালের ২৬ জুন ফ্রান্সে কনফেডারেশনস কাপের সেমিফাইনালে কলম্বিয়ার মুখোমুখি হয়েছিল ক্যামেরুন। ম্যাচের ৭১ মিনিটে মাঝমাঠে সতীর্থদের কাছাকাছি থাকা অবস্থায় হঠাৎ মাটিতে পড়ে যান ২৮ বছর বয়সি এই মিডফিল্ডার। আশপাশে কোনো খেলোয়াড়ের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়নি, বলও ছিল না তার কাছে। চিকিৎসকরা মাঠেই তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। পরে স্টেডিয়ামের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হলেও আর ফেরানো যায়নি। দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে ধরা পড়ে, হৃদপেশির অস্বাভাবিক পুরু হয়ে যাওয়ার রোগ হাইপারট্রফিক কার্ডিওমায়োপ্যাথিতে ভুগছিলেন ফোয়ে। তার মৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো ফুটবলবিশ্বকে। ক্যামেরুনের খেলোয়াড়রা পরের ম্যাচে ফোয়ের ছবি হাতে নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন।
ফেহের : হলুদ কার্ডের পরই নিথর দেহ
ফোয়ের ঘটনার সাত মাস না পেরোতেই আরেকটি মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে যায় ফুটবল। ২০০৪ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্তুগিজ ক্লাব বেনফিকার হয়ে ভিটোরিয়া গিমারায়েসের বিপক্ষে খেলছিলেন হাঙ্গেরিয়ান স্ট্রাইকার মিকলোস ফেহের। বদলি হিসেবে মাঠে নামা ২৪ বছর বয়সি এই ফুটবলার ম্যাচের শেষ দিকে সতীর্থকে গোল করতে সহায়তা করেন। এরপর সময় নষ্টের অভিযোগে রেফারি তাকে হলুদ কার্ড দেখান। কার্ড দেখে মৃদু হাসি দিয়ে পেছনে ঘুরতেই হঠাৎ মাটিতে পড়ে যান ফেহের। সতীর্থরা ছুটে আসেন, দুই দলের চিকিৎসাকর্মীরাও তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয় তার। হাসপাতালে নেওয়ার পর রাত ১২টা ১০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। টেলিভিশনে সম্প্রচারিত সেই দৃশ্য আজও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এক বেদনাবিধুর স্মৃতি।
পুয়ের্তা : ফিরে এসেও আর ফেরা হলো না
২০০৭ সালের ২৫ আগস্ট সেভিয়ার হয়ে গেতাফের বিপক্ষে ম্যাচ খেলছিলেন স্প্যানিশ ডিফেন্ডার আন্তোনিও পুয়ের্তা। ম্যাচের ৩৫ মিনিটে হঠাৎ মাঠে পড়ে যান ২২ বছর বয়সি এই তরুণ। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে পেয়ে সতীর্থদের সহায়তায় নিজেই মাঠ ছেড়ে ড্রেসিংরুমে যান। তখন হয়তো কেউ ভাবেননি, বিপদ আরো গভীরে। ড্রেসিংরুমে আবারও হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় তার। চিকিৎসকরা পুনরুজ্জীবিত করে হাসপাতালে নিলেও টানা তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২৮ আগস্ট মারা যান পুয়ের্তা। সেভিয়ার হয়ে ইউরোপীয় সাফল্যের অংশ ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে শুধু স্পেন নয়, কেঁদেছিল পুরো ফুটবলবিশ্ব।
ও’ডনেল : মাঠ ছাড়ার আগেই থেমে গেল জীবন
একই বছরের ২৯ ডিসেম্বর স্কটিশ ক্লাব মাদারওয়েলের অধিনায়ক ফিল ও’ডনেলের মৃত্যু হয়। ডান্ডি ইউনাইটেডের বিপক্ষে ম্যাচে তাকে বদলি করার প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু মাঠ ছাড়ার আগেই হঠাৎ পড়ে যান ৩৫ বছর বয়সি এই মিডফিল্ডার। চিকিৎসকরা দ্রুত ছুটে এলেও তাকে বাঁচানো যায়নি। পরে জানা যায়, হৃদযন্ত্রের সমস্যায় তার মৃত্যু হয়েছে। স্ত্রী ও চার সন্তান রেখে যাওয়া ও’ডনেলের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নামে স্কটিশ ফুটবলে। মাদারওয়েলের সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন শুধু অধিনায়ক নন, ক্লাবের প্রাণের মানুষ।
একেং : মাঠে পড়ে যাওয়ার দুই ঘণ্টা পর মৃত্যু
২০১৬ সালের ৬ মে রোমানিয়ার ক্লাব দিনামো বুখারেস্টের হয়ে ভিয়িতোরুলের বিপক্ষে খেলছিলেন ক্যামেরুনের মিডফিল্ডার প্যাট্রিক একেং। ম্যাচের ৭০ মিনিটে হঠাৎ মাঠে পড়ে যান ২৬ বছর বয়সি এই ফুটবলার। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু দুই ঘণ্টা পর আসে মৃত্যুর খবর। প্রাথমিকভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানানো হয়। একেংয়ের মৃত্যুতে রোমানিয়ার ফুটবল স্থবির হয়ে পড়ে; ওই সপ্তাহের সব ম্যাচ স্থগিত করে দেশটির ফুটবল ফেডারেশন। ক্যামেরুনের জাতীয় দলেও নেমে আসে শোক।
প্রাণ বাঁচাতে ফিফার নির্দেশনা
একের পর এক এমন মৃত্যু ফুটবলকে শিখিয়েছে, মাঠে জরুরি চিকিৎসার প্রস্তুতি কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জীবন বাঁচানোর শর্ত। ফিফা এখন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার আগে খেলোয়াড়দের হৃদস্বাস্থ্য যাচাই বাধ্যতামূলক করেছে। চিকিৎসা-ইতিহাস, পারিবারিক রোগের ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা ও ইসিজির মাধ্যমে ঝুঁকি শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। তবে কোনো পরীক্ষাই আকস্মিক হৃদরোগের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে পারে না।
জরুরি পরিস্থিতিতে ফিফার নির্দেশনা হলো—খেলোয়াড় অচেতন হয়ে পড়লে দ্রুত সাড়া ও শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করতে হবে, জরুরি চিকিৎসাসেবা ডাকতে হবে এবং প্রশিক্ষিত কেউ থাকলে অবিলম্বে সিপিআর শুরু করতে হবে। প্রতিটি ম্যাচ ও অনুশীলনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার যন্ত্র (এইডি) সহজে পাওয়া যায়, এমন ব্যবস্থা রাখতে হবে। যন্ত্রটি এনে তার নির্দেশনা মেনে ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি খেলোয়াড়, রেফারি, কর্মকর্তা ও চিকিৎসাকর্মীদের সিপিআর এবং এইডি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নিয়মিত দিতে হবে। প্রতিটি ম্যাচের জন্য আগাম জরুরি চিকিৎসা পরিকল্পনা, দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া, অ্যাম্বুলেন্সের অবস্থান নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত মহড়ার কথাও বলেছে ফিফা।
তবে দে মিগেলের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, সব মৃত্যু হৃদরোগের কারণে ঘটে না। সংঘর্ষজনিত গুরুতর আঘাত মোকাবিলায়ও মাঠে প্রশিক্ষিত চিকিৎসাকর্মী, দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স এবং উপযুক্ত জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিটি দুর্ঘটনা ঠেকানো হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু প্রস্তুতির ঘাটতিতে যেন কোনো জীবন ঝরে না যায়, সেটুকু নিশ্চিত করা সম্ভব।
ফুটবল মাঠে গোল হয়, রেকর্ড গড়ে, শিরোপা ওঠে হাতে। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে একজন খেলোয়াড়ের জীবন। যে মানুষটি মাঠে নামেন হাজারো স্বপ্ন নিয়ে। তার ঘরে ফেরার অপেক্ষায় থাকেন পরিবার, প্রিয়জন। খেলার সৌন্দর্য রক্ষার পাশাপাশি জীবনের নিরাপত্তাও তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে দিনকে দিন। কারণ, শেষ বাঁশির পর গ্যালারি খালি হয়, স্কোরবোর্ডের আলো নিভে আসে, কিন্তু অকালে হারিয়ে যাওয়া তারকারা আর সূর্যোদয়ের সঙ্গে ফিরে আসে না।