কারোগি অ্যাথলেটিক স্পোর্টস পার্কের আকাশে সকাল থেকেই ঝলমলে রোদ। তবে আউটফিল্ডের কিছু অংশ তখনো ভেজা। বালু ঢেলে সেই সংকট সমাধানের পর ম্যাচ শুরু হলো সোয়া এক ঘণ্টা দেরিতে, ওভার কমে দাঁড়াল ১৩। প্রেস বক্সে বসে মনে হচ্ছিল, ছোট ম্যাচ মানে বড় সুযোগ। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সেটাই যে শেষ পর্যন্ত বড় আক্ষেপ হয়ে দাঁড়াল। সূর্যের তেজে চারধার ঝলমল করছিল। কিন্তু মাঠের ক্রিকেটে বাংলাদেশ যেন নুয়ে পড়া কালো ছায়া। যে ছায়ায়, যে অন্ধকারে স্বপ্ন হারিয়ে ধূসর হয়ে যায়।
পাকিস্তানের কাছে ৬ উইকেটে হেরে এশিয়ান গেমস ক্রিকেটের স্বর্ণের লড়াই থেকে ছিটকে গেল লিটন দাসের দল। রুপাও গেল। কেবল বাকি রইল ব্রোঞ্জ। শেষবারের এশিয়ান গেমস থেকে এই ব্রোঞ্জ নিয়েই ফিরেছিল বাংলাদেশ। এবার কি সেটাও জুটবে? আগামীকাল শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ম্যাচে মিলবে সেই প্রশ্নের উত্তর।
দুদলের ব্যাটিংয়ের সময় উইকেট প্রায় একই রকম ছিল। কিন্তু সমস্যা ও পার্থক্যের ফারাক তো ব্যাটিংয়ে। মনে-মেজাজে-মননে এবং অনেকখানি সামর্থ্যেও বটে! এই ব্যবধান ঘোচাতে না পারায় এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের স্বর্ণ জয়ের স্বপ্ন তামাটে হয়ে গেল! ফাইনালে উঠতে না পারায় রৌপ্যও হাতছাড়া। লড়াই এখন কেবল একটা পদক পাওয়ার এবং সেটা ব্রোঞ্জের। পাকিস্তানের কাছে সেমিতে ৬ উইকেটে হেরে গেছে বাংলাদেশ। বৃষ্টির কারণে কার্টেল ওভারে গড়ানো ম্যাচে বাংলাদেশের ব্যাটিংই যে গড়িয়ে পড়ল!
এই ম্যাচে বাংলাদেশ একটা নয়, একসঙ্গে অনেকগুলো ভুল করল। ব্যাটিংয়ে ভুল, বোলিংয়েও তো আরো বড় ভুল। শুরুর মানসিকতায় ভুল এবং ম্যাচ শেষে অধিনায়ক যেভাবে পুরো বিষয়ের ব্যাখ্যা দিলেন সেখানেও কেবল একরাশ অজুহাত! চার-পাঁচ দিন ক্রিকেট খেলতে না পেরে হোটেলবন্দি থাকায় ক্রিকেটাররা যেন ক্রিকেটই ভুলে গেছে! এমন ব্যাখ্যায় হারকে জাস্টিফাই করার কসরত দেখালেন অধিনায়ক!
টানা বৃষ্টিতে উইকেট ঢাকা ছিল। তাই টসে জিতে পাকিস্তান সঠিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বোলিংই বেছে নিল এবং সফল হলো। ৪ ওভারের পাওয়ার প্লেতে ২৩ রানে বাংলাদেশের ৩ উইকেট নেই! ওপেনার সাঈফ হাসান শুধু করলেন ১৭ বলে ১৯ রান। তানজিদ, লিটন ও ইমনের সম্মিলিত সংগ্রহ কেবল ১০ রান! ব্যাটিংয়ের শুরুর ধাক্কা সেখানেই। মাঝে কেবলমাত্র তাওহীদ হৃদয় ২৫ বলে ৪২ রান করায় বাংলাদেশের স্কোর তিন অঙ্ক পারের পথ পায়। মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত সঙ্গী হিসেবে তাওহীদ হৃদয়কে সমর্থন দেন কিন্তু ১৪ বলে ১১ রানের তার ইনিংস দলের ব্যাটিংয়ের শক্তি শুষে নেয়।
উইকেটে ফাটল ছিল বেশ। বল টার্নও করছিল অনেকখানি। তবে একেবারে যে আনপ্লেয়েবল উইকেট—এমনও কিছু না। এমন স্পিনের উইকেটে তো খেলার অভ্যাস আছে বাংলাদেশের। কিন্তু যে অভ্যাসটা হারিয়ে গেছে তার নাম—লড়াই! তার নাম ভালো কিছু করে দেখানোর জেদ। আর তাতেই বাংলাদেশের স্বপ্ন স্বর্ণ থেকে এখন তামায় এসে আটকে গেল!
উইকেট ট্রিকি ছিল সন্দেহ নেই। এমন উইকেটে শট তৈরি করতে হয়। বোলারের লেন্থ নষ্ট করতে হয়। বাংলাদেশের শুরুর চার ব্যাটারের কেউ সেটা করতে পারলেন না। তানজিদ হাসান প্রথম ওভারে ছক্কা হাঁকালেও ফিরে আসতে বেশি সময় নিলেন না। মিসহিটে ক্যাচ তুলে ফিরলেন। ওয়ানডাউনে লিটন দাস বিশ্রী কায়দায় আউট হলেন। রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে বোল্ড। পারভেজ ইমন অনেক জোরে হাঁকান কিন্তু বল যে বাউন্ডারি পার হলো না, সীমানার কাছে ক্যাচ। সাঈফ হাসান ২ ছক্কায় উইকেটে সেট হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানি স্পিনার সুফিয়ান মুকিমের বলে ১৭ বলে ১৯ রানের ইনিংস শেষ হয় তার।
উইকেটে টার্ন ছিল, বাউন্সও অসম। কিন্তু আনপ্লেয়েবল ছিল না। দরকার ছিল সময় নেওয়া, বল বুঝে খেলা। শট তৈরি করা। তানজিদ, লিটন ও ইমন সেই পরীক্ষায় ফেল।
সাত ওভারে ৪৫ রানে ৪ উইকেট হারানো দলকে টেনে তুলে তাওহীদ হৃদয় ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের জুটি। পঞ্চম এই জুটিতে যোগ হয় ৫৩ রান। তাওহীদ হৃদয় প্রায় একাই লড়লেন। ২৫ বলে ৪২, চার ছক্কা আর দুই চার। সুফিয়ান মুকিমকে টানা দুই বলে চার ও ছক্কা মারলেন। পাকিস্তানের বোলাররা ১৫টি ওয়াইড দিয়ে অতিরিক্ত রান দিল ১৯। এত উপহারের পরও বাংলাদেশ থামল ১১১ রানে। কারণ হৃদয়ের পাশে কেউ দাঁড়াতে পারলেন না। মোসাদ্দেক হোসেন নেমে প্রথম পাঁচ বলে রান করতে পারেননি। তার ১১ রানের ইনিংসে ম্যাচের গতি আটকে গেল। মকিমের একই ওভারে হৃদয় আর মোসাদ্দেক দুজনই ফিরলেন। ১১০ পার হলো শেষ দিকে শেখ মেহেদীর দুটি বাউন্ডারিতে।
এই উইকেটে তারপরও ১৩ ওভারে ১১১ রান নেহাত মামুলি স্কোর নয়।
বোলিংয়ের শুরুতে বাংলাদেশ কিন্তু বেশ ভালোভাবেই ম্যাচে ছিল। মেহেদী হাসান প্রথম ওভারেই ফিরিয়ে দেন সাহিবজাদা ফারহানকে। নাসুম ফেরান মাজ সাদাকাতকে। পাওয়ার প্লে শেষে পাকিস্তান ৩ উইকেটে ৩৮। সাইম আইয়ুব আর উসমান খান ফিরলেন দলকে ভালো অবস্থানে রেখে এসে। ৯ ওভার শেষে পাকিস্তান ৪ উইকেটে ৭৬। শেষ চার ওভারে দরকার ৩৬। এই ট্রিকি উইকেটে কাজটা খুব সহজ নয়। কিন্তু মুস্তাফিজের দুই ওভার ম্যাচের সব অঙ্ক বদলে দিল। পাকিস্তান ইনিংসের চতুর্থ ওভারে দুই ছক্কা ও এক বাউন্ডারিতে ১৮ রান খরচ করা মুস্তাফিজকেই আবার শেষের দিকে লিটন আক্রমণে আনলেন। ঝুঁকিটা নিলেন। সেই ঝুঁকিতেই ঝাঁকানি খেয়ে ম্যাচ হেরে এলো বাংলাদেশ। মুস্তাফিজ তার দ্বিতীয় ওভারে খরচা গুনলেন ২৩ রান। এক ছক্কার ওপর টানা তিন বাউন্ডারি। লিটন দাস যে মুস্তাফিজের ওপর বাজি ধরেছিলেন ম্যাচে তার খরচ ২ ওভারে ৪১ রান। বাঁহাতি স্পিনার নাসুম আহমেদ তার প্রথম ওভারে উইকেট পেলেও ৩ ওভারে খরচা গুনেন ৩৩ রান। ৩৩ এবং ৪১ খরচার যোগফল দাঁড়ায় ৭৪ রান। তাও আবার মাত্র ৫ ওভারে!
ম্যাচ তো ওখানেই ফিনিশ!
সামাদ ১৫ বলে ৩০ আর হাসান নাওয়াজ ২২ বলে ২৭ রানে অপরাজিত থেকে ৩২ বলে ৫৯ রানের জুটিতে ম্যাচ শেষ করলেন ৯ বল হাতে রেখে।
স্বর্ণের স্বপ্ন চুরমার। এখন শুধু ব্রোঞ্জের আশা। কিন্তু সেই পদকও পেতে হলে আগে ঠিক করতে হবে এই ম্যাচের তিনটি ভুল। ব্যাটিংয়ে ধৈর্য, মাঝের ওভারে জুটি, আর চাপের মুহূর্তে বোলিং পরিকল্পনা। কারোগি অ্যাথলেটিক স্পোর্টস পার্কের ভেজা মাঠ শুকিয়ে গেছে। কিন্তু সেমিতে বাংলাদেশের এই হারের দাগ শুকাবে কি না সেই সমাধান মিলবে আগামীকাল সকালে। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ম্যাচ সেদিন।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ : ১৩ ওভারে ১১১/৭ (হৃদয় ৪২, সাইফ ১৯, মোসাদ্দেক ১১, মেহেদী ৮*; মুকিম ৩/২৬, আরাফাত ২/২৩, সাইম ১/৩) পাকিস্তান : ১১.৩ ওভারে ১১২/৪ (সামাদ ৩০*, হাসান ২৭*, সাদাকাত ১৫; মেহেদী ১/১৭, নাসুম ১/৩৩, মুস্তাফিজ ১/৪১, রিশাদ ১/১২)
ফল : পাকিস্তান ৬ উইকেটে জয়ী।